প্রতিবন্ধীদের বন্ধু শিক্ষক আলী তানভীর
Advertisement
মনসুর মহসিন, চকরিয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:০৯ এএম
বিভিন্ন সময়ে প্রতিবন্ধীদের সহায়তায় আলী তানভীর। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানবিকতা যে পেশা কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার গণ্ডিতে আটকে থাকে না, তার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত চকরিয়ার তরুণ শিক্ষক আলী তানভীর। শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিশু ও অসহায় পরিবারের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্নপ্রান্তের পাঁচ শতাধিক প্রতিবন্ধী পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তার উদ্যোগে ১১০ প্রতিবন্ধী শিশু পেয়েছে কৃত্রিম পা, হুইলচেয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়ক উপকরণ। মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ ভালোবেসে অনেকেই তাকে ডাকেন ‘প্রতিবন্ধীদের বন্ধু’।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা আলী তানভীর বর্তমানে বান্দরবানের লামা আদর্শ গার্লস হাই স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরির চেষ্টা তার দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
করোনা মহামারিতে শুরু মানবিক পথচলা
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালে নিজ এলাকা চকরিয়ায় মানবিক কার্যক্রম শুরু করেন আলী তানভীর। শুরুতে এলাকার অসহায় ও প্রতিবন্ধী শিশুদের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতার চেষ্টা করতেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার উদ্যোগের পরিধি বেড়েছে, যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও।
এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাঁচ শতাধিক প্রতিবন্ধী পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কোনো পরিবারকে দিয়েছেন আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী, আবার কোনো পরিবারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং চিকিৎসাসেবা পেতে সহযোগিতা করেছেন। তার উদ্যোগে ১১০ প্রতিবন্ধী শিশু কৃত্রিম পা, হুইলচেয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়ক উপকরণ পেয়েছে।
ফেনীর বন্যায় সহায়ক উপকরণ হারিয়ে ফেলা ১০ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্যও নতুন করে প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করেন আলী তানভীর। এ ছাড়া সীতাকুণ্ডের ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের সময় লাশ বহনের কাজে সহযোগিতা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর এই মানসিকতা তার মানবিক উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করেছে।
রূপসী-তামান্নাদের স্বপ্নপূরণের চেষ্টা
আলী তানভীরের সহযোগিতায় নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেয়েছে রূপসী ও তামান্নার মতো শিশুরা। ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ের গোড়ালি হারায় রূপসী। দুর্ঘটনার পর তার চিকিৎসা ও পড়াশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে রূপসীর পাশে দাঁড়ান আলী তানভীর। চিকিৎসার পাশাপাশি তার শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতেও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন তিনি।
রূপসীর মা জানান, মেয়ের চিকিৎসা ও পড়াশোনার ক্ষেত্রে তানভীর সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। বর্তমানে রূপসী ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে।
অন্যদিকে, জন্মগতভাবে দুই হাত ও এক পা নিয়ে জন্ম নেওয়া তামান্নার জন্য ২০২২ সালে কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা করেন আলী তানভীর। তবে বিদ্যালয় দূরে হওয়া এবং যাতায়াত ও ওঠানামার অসুবিধার কারণে তামান্নার পক্ষে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তামান্নার বাস্তবতা তুলে ধরে আলী তানভীরের উদ্যোগের পাশাপাশি উঠে এসেছে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা। শুধু চিকিৎসা কিংবা সহায়ক উপকরণ দিলেই তাদের সব সমস্যা সমাধান হয় না। প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহজ প্রবেশাধিকার, নিরাপদ যাতায়াত এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ। এসব সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন শুরুতেই বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহযোগিতার হাত
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই মানবিক উদ্যোগ? জানতে চাইলে আলী তানভীর বলেন, ‘প্রথমে প্রতিবন্ধী শিশুদের বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নিই। যেসব পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ, তাদের স্থানীয় অর্থোপেডিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ দেওয়ার চেষ্টা করি।’
তিনি জানান, অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে শিশুটির ছবি ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে ফেসবুকে পোস্ট করেন তিনি। তার ফেসবুক বন্ধুরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে সেই অর্থ দিয়ে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণের ব্যবস্থা করা হয়।
এভাবেই ব্যক্তিগত উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তা কাজে লাগিয়ে অসহায় পরিবারগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তার এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন সহায়তাবঞ্চিত পরিবারগুলো উপকৃত হচ্ছে, অন্যদিকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও মানবিক কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
আলী তানভীরের মানবিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তা সাথীর মতো অনেকেই। ২০২০ সাল থেকে ফেসবুকের মাধ্যমে তানভীরের সঙ্গে পরিচয় সাথীর। সরাসরি সব সময় অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব না হলেও তানভীরের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি।
সাথী বলেন, ব্যস্ততার কারণে সরাসরি যেতে না পারলেও আমি তানভীরের মাধ্যমে সমাজের এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। প্রতিবন্ধীদের প্রতি তার ভালোবাসা দেখে আমি তাকে ‘প্রতিবন্ধীদের বন্ধু’ বলে ডাকি।
সাথীর দেওয়া এই নাম যেন আলী তানভীরের মানবিক কর্মকাণ্ডের পরিচয় হয়ে উঠেছে। তার উদ্যোগে শুধু একজন ব্যক্তি নন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত অনেক মানুষও অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন। ব্যক্তিগত সামর্থ্যের সঙ্গে অন্যদের সহযোগিতাকে যুক্ত করে তিনি গড়ে তুলেছেন মানবিক সহমর্মিতার একটি পরিসর।
সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন অধিকার নিশ্চিত করা
প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসা, শিক্ষা ও চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করা এখনো সমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর্থিক অসচ্ছলতা, প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণের অভাব, চিকিৎসাসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং যাতায়াতের প্রতিবন্ধকতা অনেক শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আলী তানভীরের মতো মানুষের উদ্যোগ অসহায় পরিবারগুলোকে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।
শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের সামর্থ্য ও মানুষের সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে আলী তানভীর যে পথচলা শুরু করেছেন, তা কেবল আর্থিক সহায়তা কিংবা প্রয়োজনীয় উপকরণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার কর্মকাণ্ড প্রতিবন্ধী শিশুদের বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি তাদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাও তৈরি করছে।
রূপসীর পড়াশোনা এগিয়ে চলা যেমন আশার গল্প, তেমনি তামান্নার বিদ্যালয়ে যেতে না পারার বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়—প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন সমান সুযোগ ও উপযোগী পরিবেশ।
প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কেমন ভবিষ্যৎ দেখতে চান আলী তানভীর?
প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে আলী তানভীর বলেন, আমি এমন একটি সমাজ দেখতে চাই, যেখানে প্রতিবন্ধী শিশুরা নিজেদের অসহায় মনে করবে না। তাদের পরিবারকে সন্তানের চিকিৎসা, পড়াশোনা কিংবা চলাচলের ব্যবস্থা করতে গিয়ে অসহনীয় কষ্টের মুখোমুখি হতে হবে না। প্রতিটি প্রতিবন্ধী শিশু যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, সহায়ক উপকরণ ও শিক্ষার সুযোগ পায় এবং নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী সামনে এগিয়ে যেতে পারে। শুধু সহানুভূতি দেখানো নয়, তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি। সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সম্মিলিতভাবে এগিয়ে এলে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। আমি চাই, আমার এই উদ্যোগের মাধ্যমে আরও মানুষ অনুপ্রাণিত হোক এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসুক।
ব্যক্তিগত উদ্যোগ, মানুষের ভালোবাসা আর সম্মিলিত সহযোগিতাকে পুঁজি করে আলী তানভীরের এই পথচলা প্রমাণ করে, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে সব সময় বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন আন্তরিক ইচ্ছা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং কাজ করে যাওয়ার মানসিকতা।
পাঁচ শতাধিক প্রতিবন্ধী পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আর ১১০ শিশুর চলার পথ সহজ করতে ভূমিকা রাখা এই তরুণ শিক্ষক তাই অনেকের কাছে কেবল একজন সহায়তাকারী নন; তিনি ভরসা, সহমর্মিতা ও নতুন করে স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা। ভালোবেসে যাকে তারা ডাকেন ‘প্রতিবন্ধীদের বন্ধু’।
