কিস্তি আর সুদের জালে বন্দি চারঘাটের মানুষ, আত্মগোপনে ১০ পরিবার
মিজানুর রহমান, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম
এআই দিয়ে বানানো প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিভিন্ন এনজিও থেকে কেউ ঋণ নিয়েছিলেন গরু-ছাগল পালনের আশায়। কেউ ছোট ব্যবসাকে বড় করে দাঁড় করাতে। কেউ আবার পারিবারিক প্রয়োজনে। সময়মতো সেসব এনজিওর ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে ঋণ করেছেন আরও একাধিক সংস্থায়।
একপর্যায়ে এনজিওদের ঋণ দেওয়া বন্ধ হলে অনেকেই কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে এলাকার সুদ কারবারিদের কাছে চড়া সুদে টাকা নিয়ে আরও বেকায়দায় পড়েছেন। এতে ঋণের চক্র থেকে আর বের হতে পারেননি তারা।
এখন ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে কেউ ছেড়েছেন বসতবাড়ি, কেউ গেছেন আত্মগোপনে। এনজিও ও অবৈধ সুদ কারবারিদের অত্যাচারে অনেকেই বাড়িছাড়া হয়েছেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় ঋণগ্রস্ত ১০টি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সবাই আজ আত্মগোপনে। প্রতিটি পরিবার একই সঙ্গে একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিল। তারা সেসব এনজিওর কিস্তির টাকা সঠিক সময়ে দিতে না পারায় চড়া সুদে টাকা নিয়ে দেশান্তরি হয়েছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে এখন তারা কোথায় আছেন, কেমন আছেন— কেউ জানে না।
চারঘাট বাজারের একসময়ের বড় কাপড় ব্যবসায়ী বিশ্বাস বস্ত্রালয়ের মালিক সানাউল্লাহ সুদ কারবারি ও বিভিন্ন এনজিওর চাপে বাড়িঘর ছেড়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাতের আঁধারে চলে গেছেন আত্মগোপনে।
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সানাউল্লাহ এখন কোথায় আছেন, কেউ জানে না। সানাউল্লাহ ছাড়াও মুংলি গ্রামের সেলিম হোসেন, আব্দুস সামাদ ও মাইনুল হক বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিস্তির টাকা সঠিক সময়ে দিতে না পারায় সুদ কারবারির কাছ থেকে টাকা নিয়ে এখন বাড়িছাড়া। তারা সবাই সপরিবারে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
এছাড়া চারঘাটের কালুহাটিতে জুতার কারখানা করে অনেকেই ঋণ নিয়ে পথে বসে গেছেন। সেরকম একজন আলমগীর হোসেন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ছেড়েছেন। বাড়িতে তার মা-বাবা আছেন। তারাও বলতে পারেন না, ছেলে কোথায় আছেন। কালুহাটি বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, তাদের বাজারের অন্তত ১০ ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের আর ঋণ শোধ করার কোনো উপায় নেই।
এদিকে বনকিশোর গ্রামের ঋণে জর্জরিত ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি মিঠন দাস ফেসবুক লাইভে তার দুঃখের কথাগুলো বলে রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি প্রথমে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তখন ঋণ করেছিলেন। ব্যবসা করে ঋণ শোধ করতে পারেননি। পরে ওষুধ কোম্পানিতে ঢুকেছিলেন। কোম্পানির তিন লাখ টাকা পকেটমার নিয়ে নেয়।
জানা যায়, চারঘাট উপজেলা সদর ছাড়াও মুংলি, বনকিশোর, কালুহাটি, ফরিদপুর মোড়, বামনদীঘি, ইউসুফপুর, কাকরামারী, পরানপুর, বাঘার মীরগঞ্জ, বারশত দিয়াড়, মহদীপুর, বিনোদপুর এলাকার কয়েকজন সুদ কারবারির আয়ের উৎসই সুদের কারবার করা। এসব সুদ কারবারি চড়া সুদে টাকা দিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। এসব সুদ কারবারিকে চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি এলাকাবাসীর।
রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, সুদ কারবারিদের ব্যাপারে সঠিক তথ্য পেলে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ভুক্তভোগীরা এসব অবৈধ সুদ কারবারির বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করতে পারেন।
