‘ক্যানসারমুক্ত’ হওয়ার পর আবারও কেন ফিরে আসে, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্যানসারের চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর পরীক্ষার রিপোর্টে ‘ক্যানসারমুক্ত’ শব্দটি পাওয়া একজন রোগীর জন্য বড় স্বস্তির মুহূর্ত। কিন্তু চিকিৎসা সফলভাবে শেষ হওয়ার কয়েক মাস, বছর কিংবা কখনো কয়েক দশক পরও ক্যানসার ফিরে আসতে পারে। বিষয়টি রোগী ও তার পরিবারের জন্য ভীতিকর হলেও, এর পেছনে রয়েছে ক্যানসারের জটিল জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
কেন ক্যানসার আবার ফিরে আসে, শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা ক্যানসার কোষ কীভাবে টিকে থাকে এবং রোগ পুনরায় দেখা দিলে সেটি আগের চিকিৎসার ব্যর্থতা কি না—এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভারতের গুরগাঁওয়ের মেডান্তার মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. অশোক কুমার বৈদ।
শরীরে লুকিয়ে থাকতে পারে সুপ্ত ক্যানসার কোষ
অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন বা টার্গেটেড থেরাপির মাধ্যমে একটি টিউমারের প্রায় সব ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা সম্ভব হলেও অতি ক্ষুদ্রসংখ্যক কোষ শরীরে থেকে যেতে পারে।
ডা. বৈদ জানান, এসব কোষকে ‘মিনিমাল রেসিডুয়াল ডিজিজ’ বা এমআরডি এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘ডরম্যান্ট ক্যানসার সেল’ বলা হয়। এগুলো বছরের পর বছর নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকতে পারে। এ সময় কোনো উপসর্গ দেখা নাও দিতে পারে এবং সাধারণ স্ক্যানেও কোষগুলো ধরা নাও পড়তে পারে।
তবে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার পরিবর্তন, হরমোনের পরিবেশে পরিবর্তন, প্রদাহ কিংবা ক্যানসার কোষের জিনগত পরিবর্তনের কারণে কোনো একসময় এসব সুপ্ত কোষ সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তখনই ক্যানসার পুনরায় দেখা দিতে পারে।
ক্যানসার ফিরে আসা মানেই চিকিৎসা ব্যর্থ নয়
চিকিৎসার পর ক্যানসার আবার শনাক্ত হলে অনেক রোগী মনে করেন, প্রথম চিকিৎসা হয়তো কাজ করেনি। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
তার মতে, ক্যানসারের পুনরাবির্ভাব মানেই প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যর্থ হয়েছিল—এমন নয়। বরং এটি ক্যানসারের জটিল জীববিজ্ঞানের প্রতিফলন।
পুনরায় দেখা দেওয়া ক্যানসার সাধারণত তিনভাবে প্রকাশ পেতে পারে। প্রথমত, আগের টিউমারের জায়গায় বা তার কাছাকাছি ফিরে আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, কাছাকাছি লিম্ফ নোড বা আশপাশের টিস্যুতে দেখা দিতে পারে। তৃতীয়ত, শরীরের অন্য কোনো অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যাকে মেটাস্টেসিস বলা হয়।
নতুন প্রযুক্তিতে আগেই শনাক্তের আশা
ক্যানসারের পুনরাবির্ভাব শনাক্তকরণে আধুনিক প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। চিকিৎসকরা জানান, লিকুইড বায়োপসি, সার্কুলেটিং টিউমার ডিএনএ বা সিটিডিএনএ বিশ্লেষণ এবং এমআরডি পরীক্ষার মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে ইমেজিংয়ে টিউমার দৃশ্যমান হওয়ার অনেক আগেই শরীরে থাকা অতি ক্ষুদ্র ক্যানসার কোষ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
রক্তের নমুনা থেকেই রক্তপ্রবাহে থাকা টিউমারের ক্ষুদ্র ডিএনএ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সুপ্ত অবস্থায় থাকা ক্যানসার কোষকে সরাসরি লক্ষ্য করে এমন ওষুধ তৈরির গবেষণাও চলছে। ভবিষ্যতে এসব চিকিৎসা ক্যানসারের পুনরাবির্ভাব প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পাঁচ বছর ক্যানসারমুক্ত থাকাই শেষ নয়
পাঁচ বছর ক্যানসারমুক্ত থাকা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তবে এটিকেই চিকিৎসার চূড়ান্ত সমাপ্তি হিসেবে দেখা উচিত নয় বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। ক্যানসারের ধরন ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ প্রয়োজন হতে পারে।
নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, ইমেজিং বা অন্যান্য পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। কোনো অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করাও জরুরি।
ক্যানসার ফিরে এলেও আধুনিক চিকিৎসায় আবারও রোগ নিয়ন্ত্রণ বা রেমিশন অর্জনের সুযোগ রয়েছে। টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, বিশেষায়িত রেডিয়েশন ও অস্ত্রোপচারের মতো চিকিৎসা এখন অনেক রোগীর জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞের মতে, ক্যানসার থেকে সুস্থ হওয়ার অর্থ শুধু নির্দিষ্ট কয়েক বছর রোগমুক্ত থাকা নয়; বরং নিয়মিত চিকিৎসা-পর্যবেক্ষণ, অস্বাভাবিক উপসর্গের বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং চিকিৎসক দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাও দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


