Logo
Logo
×

Advertisement

ডাক্তার আছেন

কিশোরীদের শরীরে নীরবে বাড়ছে PCOS

Icon

ডা. সাহেদ ইমরান; সহকারী অধ্যাপক, শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

কিশোরীদের শরীরে নীরবে বাড়ছে PCOS

Advertisement

কয়েক মাস ধরে মাসিক ঠিকমতো হচ্ছে না ১৬ বছরের মেহরিনের। কখনো এক মাস পেরিয়ে যাচ্ছে, কখনো তারও বেশি সময়। মুখে ব্রণ বেড়েছে, থুতনির কাছে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক লোম। এর মধ্যে শরীরের ওজনও বাড়ছে দ্রুত। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিবর্তিত চেহারা দেখে মন খারাপ হয় তার। স্কুলে সহপাঠীদের কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে মন্তব্যও করে।

মেহরিন প্রথমে ভেবেছিল, বয়সন্ধিকালের কারণে এমন হচ্ছে। মা ও বলেছিলেন, বয়স বাড়লে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কয়েক মাস পরও যখন সমস্যা কমল না, তখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় পরিবার। পরীক্ষার পর জানা গেল, সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয় এর পেছনে রয়েছে পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা PCOS।

মেহরিনের গল্পটি কাল্পনিক। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বহু কিশোরীর বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। কারণ PCOS এর উপসর্গগুলো অনেক সময় বয়:সন্ধিকালের স্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে মিশে যায়। মাসিক অনিয়মিত হওয়া, মুখে ব্রণ, শরীরের বিভিন্ন অংশে অতিরিক্ত লোম, ওজন বেড়ে যাওয়া কিংবা ত্বকের পরিবর্তন, এসব নিয়ে কিশোরীরা যেমন অস্বস্তিতে থাকে, তেমনি পরিবারের অনেকেই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়।

Polycystic Ovarian Syndrome বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বর্তমানে প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের মধ্যে একটি অত্যন্ত পরিচিত ও জটিল হরমোনজনিত সমস্যা। নারীদের বহুল পরিচিত পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)-এর নতুন আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত নাম পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম Polyendocrine Metabolic Ovarian Syndrome  (PMOS)। ২০২৬ সালের মে মাসে বৈশ্বিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই নাম পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

বিশ্বজুড়ে প্রজনন বয়সের ৫ থেকে ১০ শতাংশ নারী এই সমস্যায় ভুগে থাকেন। এই রোগটি মূলত হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-ওভারিয়ান অক্ষের ব্যাঘাত ঘটায়, যার ফলে নিয়মিত মাসিক বন্ধ থাকা বা অনিয়মিত হওয়া, অতিরিক্ত অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের প্রভাবে মুখে অবাঞ্ছিত লোম গজানো এবং ব্রণের মতো সমস্যা দেখা দেয়।

এছাড়াও বন্ধ্যাত্ব এবং জরায়ুর ক্যানসারের ঝুঁকিও এর সাথে যুক্ত। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি-এর অভাব এই জটিলতাগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ভিটামিন ডি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হরমোন নিঃসরণ এবং ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশে পিসিওএসে আক্রান্ত কিশোরীদের বিপাকীয় জটিলতা নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় ১৭৫ জন কিশোরীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ১৬.৮ বছর। ফলাফলে দেখা যায়, তাদের ৪২.৩ শতাংশের মধ্যে মেটাবলিক সিনড্রোম, ৯০.৯ শতাংশের মধ্যে ডিসলিপিডেমিয়া এবং ২৪ শতাংশের মধ্যে গ্লুকোজ অসহিষ্ণুতা ছিল। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ৭০ জন পিসিওএসে আক্রান্ত নারীর ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় মেটাবলিক সিনড্রোমের হার পাওয়া যায় ১৫.৩ শতাংশ। তবে ফলাফলগুলো পিসিওএসে আক্রান্ত কিশোরী ও নারীদের বিপাকীয় স্বাস্থ্য মূল্যায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে।

সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ভিটামিন ডি-এর তথ্য। গবেষণায় ৯২.৬ শতাংশ কিশোরীর শরীরে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি পাওয়া গেছে। ৫.৩ শতাংশের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি ছিল অপর্যাপ্ত এবং মাত্র ২.১ শতাংশের শরীরে পর্যাপ্ত মাত্রা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জন PCOS আক্রান্ত কিশোরীর মধ্যে প্রায় ৯ জনের শরীরেই ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ থেকে ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা আদর্শ মাত্রার চেয়ে অনেক কম থাকে। সাধারণত রক্তে ২৫-হাইড্রক্সি ভিটামিন ডি (25-OHD)-এর মাত্রা প্রতি মিলিলিটারে ২০ ন্যানোগ্রামের নিচে থাকলে তাকে ভিটামিন ডি ঘাটতি এবং ২০ থেকে ৩০ ন্যানোগ্রামের মধ্যে থাকলে তাকে অপর্যাপ্ততা হিসেবে ধরা হয়।

​বাংলাদেশেও এই সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। দেশের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পিসিওএস (PCOS)-এ আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশের ক্ষেত্রে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং ১৫.৩ শতাংশের ক্ষেত্রে মেটাবলিক সিনড্রোম বা বিপাকীয় লক্ষণ জটিলতা রয়েছে।

গবেষণাটি বিশেষ করে স্থূল বা অতিরিক্ত ওজনযুক্ত কিশোরীদের রক্তে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মধ্যকার সম্পর্ক উদঘাটনে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে দেশের নারী স্বাস্থ্যের চিকিৎসায় নতুন দিক উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই বাস্তবতা চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দাবি জানায়। PCOS এর চিকিৎসা শুধু মাসিক নিয়মিত করার ওষুধে সীমাবদ্ধ নয়। রোগীর বয়স, উপসর্গ, ওজন, বিপাকীয় ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ প্রজনন পরিকল্পনা বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওজন ব্যবস্থাপনা চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মাত্রায় ভিটামিন ডি সেবন করা যেতে পারে। তবে পরীক্ষায় ঘাটতি ধরা পড়লেই নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন ডি গ্রহণ করা উচিত নয়। অতিরিক্ত ভিটামিন ডি সেবন শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এবং তাই এর মাত্রা ও সময়কাল চিকিৎসকের পরামর্শেই নির্ধারণ করা উচিত। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণ করা স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক হলেও এটি পিএমওএসের একমাত্র চিকিৎসা নয়।

কিশোরীদের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাসিক নিয়ে মেয়েদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। মাসিক দীর্ঘদিন অনিয়মিত হলে, মুখ বা শরীরে অস্বাভাবিক অতিরিক্ত লোম দেখা দিলে, দ্রুত ওজন বেড়ে গেলে কিংবা হরমোনজনিত অন্য কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি লুকিয়ে না রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ লজ্জা, ভয় বা সামাজিক সংকোচের কারণে চিকিৎসা পিছিয়ে গেলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

আর একটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার, PCOS কোনো কিশোরীর পরিচয় নয়। এটি তার শরীরের একটি স্বাস্থ্যগত অবস্থা। সঠিক তথ্য, সহানুভূতিশীল পরিবার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেলে একজন কিশোরী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। তাই PCOS আক্রান্ত মেয়েদের নিয়ে কৌতুক, শরীর নিয়ে মন্তব্য বা ‘মোটা হয়ে গেছ’ ধরনের সামাজিক চাপ সমস্যাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

মেনোপজের পর নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি কেন বাড়ে, যা জানালেন দেবী শেঠি

মেনোপজের পর নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি কেন বাড়ে, যা জানালেন দেবী শেঠি

কিশোরীদের শরীরে নীরবে বাড়ছে PCOS

কিশোরীদের শরীরে নীরবে বাড়ছে PCOS

সুস্থ হার্ট বলতে কী বোঝায়, জানালেন ডা. দেবী শেঠি

সুস্থ হার্ট বলতে কী বোঝায়, জানালেন ডা. দেবী শেঠি

ল্যাবরেটরি ছাড়াই বিপাকীয় কার্যক্রম পরিমাপ করবে নতুন মাস্ক

ল্যাবরেটরি ছাড়াই বিপাকীয় কার্যক্রম পরিমাপ করবে নতুন মাস্ক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম