জ্বালানি তেলের দাম যে কারণে বেড়েই চলছে
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে যে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে না, বরং বাড়ছে।
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ৪৬ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের গড় রপ্তানির পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে এই হার।
তবে বৈশ্বিক বাজারে তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গত এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি।
শুক্রবার ডিসেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের আগাম চুক্তির দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে সাময়িকভাবে প্রতি ব্যারেল ১১৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী যুদ্ধে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা, তেলের মজুত কমে যাওয়া এবং অঞ্চলটি থেকে তেল পরিবহণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক আদি ইমসিরোভিচ আল জাজিরাকে বলেন, বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত তেল রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রবল। বাজারের আগাম চুক্তিতে সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন ঘটছে বলে জানান তিনি। ইমসিরোভিচ দীর্ঘদিন তেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও তেলের সরবরাহ সচল রাখতে উৎপাদক ও পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলো নানা কৌশল নিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার আশঙ্কায় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ জলসীমায় কোনো একটি জাহাজকে কম দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে।
এই ব্যবস্থায় ছোট জাহাজে করে তেল হরমুজ প্রণালি পার করা হয়। ঝুঁকিমুক্ত এলাকায় পৌঁছানোর পর অপেক্ষমাণ বড় ট্যাংকারে সেই তেল তুলে দেওয়া হয়।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেলের ৭০ শতাংশের বেশি এভাবে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তর করে পরিবহণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে তেল রপ্তানিও বাড়িয়েছে উৎপাদক দেশগুলো। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূলে ইয়ানবু বন্দরে তেল নেওয়া হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের হাবশান-ফুজাইরা পাইপলাইন ব্যবহার করে বিকল্প পথে তেল সরবরাহ করছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর নাগাদ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে রপ্তানি করা তেলের ৪০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে পরিবহণ করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে এ হার ছিল ১৭ শতাংশ। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
তেল পরিবহণে আকাশচুম্বী ব্যয়
তেল সরবরাহ সচল রাখতে নেওয়া বিকল্প ব্যবস্থাগুলোর জন্য বড় অঙ্কের ব্যয় গুনতে হচ্ছে।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেল পরিবহণের ভাড়া ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এই ব্যয় প্রায় ১০ গুণ। বীমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং পরিবহনের নানা জটিলতার কারণে এ ব্যয় বেড়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর অক্টোবর মাসে বাণিজ্যিক জাহাজে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের (ইউকেএমটিও) তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত এ মাসে ৩২টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
স্পেনের মাদ্রিদের কোমিয়াস পন্টিফিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তেলবাজার বিশেষজ্ঞ ইসাবেল ফিগেরোলা-ফেরেত্তি আল জাজিরাকে বলেন, তেলের সরবরাহ সচল থাকলেও তা স্বাভাবিক বা নির্ভরযোগ্য উপায়ে হচ্ছে না। এটিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, এক ব্যারেল তেল সরবরাহের ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন সময়ে তেল রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
রেমন্ড জেমস অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের বিনিয়োগ কৌশলবিদ পাভেল মলচানভ মনে করেন, তেলের সরবরাহ এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফেরেনি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সর্বশেষ উৎপাদন তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে উপসাগরীয় ওপেকভুক্ত দেশগুলোর দৈনিক তেল উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৫৮ লাখ ব্যারেল, যা যুদ্ধ শুরুর আগের উৎপাদনের ৭৫ শতাংশ।
জুলাইয়ের ৭৪ শতাংশের তুলনায় উৎপাদন সামান্য বাড়লেও যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরতে এখনো অনেকটা পথ বাকি বলে জানান তিনি।
এদিকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দিতে যে তেলের মজুত ব্যবহার করা হয়, তা-ও কমে আসছে।
আইইএর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বিশ্বজুড়ে পর্যবেক্ষণ করা তেলের মজুত ১ কোটি ব্যারেল কমেছে। ফলে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় বৈশ্বিক মজুত কমে দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেলে।
ফিগেরোলা-ফেরেত্তি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি, পরিবহন সংকট এবং তেলের মজুত কমে যাওয়ায় বাজারে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হয়েছে।
শিগগিরই কমছে না তেলের দাম
ইরান যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের কোনো লক্ষণ না থাকায় শিগগিরই তেলের দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরার সম্ভাবনা কম দেখছেন বিশ্লেষকরা।
শুক্রবার ২০২৭ সালের অক্টোবর মাসে সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের আগাম চুক্তির দামও প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলারের বেশি ছিল। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
ফিগেরোলা-ফেরেত্তি বলেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারে কবে ফিরবে, তা বলা কঠিন। শিগগিরই এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তার মতে, দাম কমাতে হলে সংঘাতের স্থায়ী প্রশমন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল, তেলের মজুত পুনর্গঠন এবং পরিবহণ ব্যয় আগের পর্যায়ে ফিরতে হবে।
বিনিয়োগ কৌশলবিদ মলচানভ বলেন, যুদ্ধের স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া তেলের সরবরাহ যুদ্ধপূর্ব অবস্থার ৮৫ শতাংশের বেশি হওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হলে পরবর্তী পদক্ষেপ হবে বাস্তবায়নসংক্রান্ত। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি থেকে সমুদ্র মাইন অপসারণ, জাহাজের কর্মীদের কাজে ফেরানো এবং বর্তমানে বন্ধ থাকা তেলক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন পুনরায় শুরু করা। সূত্র: আল জাজিরা



