খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম
Advertisement
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কথায় বলে, ‘কার্যোত্তর ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে পূর্বসতর্কতা অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে অধিকতর কার্যকর’। ব্যাংক খাতে সৃষ্ট খেলাপি ঋণ কালচার সৃষ্টির পেছনে পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবই প্রধানত দায়ী। ঋণ প্রস্তাব পাওয়ার পর তা যদি সঠিক ও নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হতো, তাহলে ভয়াবহ আকারে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির প্রবণতা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হতো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো অধিকাংশ সময়ই রাজনৈতিক চাপে অথবা নানা অনৈতিক কারণে প্রকল্প প্রস্তাব সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন করে না। ফলে ঋণ মঞ্জুরের পর এসব প্রকল্প ব্যাংকের ঋণের কিস্তি সঠিকভাবে নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করে না। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করছেন না। বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা ঋণের অর্থ উদ্দিষ্ট খাতে ব্যবহার না করে অসৎ উদ্দেশ্যে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করেছেন। কেউবা ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। তারা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা জানেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া অর্থ ফেরত না দিলেও কোনো সমস্যা হবে না।
ঋণখেলাপি দুই ধরনের। একটি শ্রেণি আছে, যারা নানা প্রতিকূলতার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গৃহীত ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে পারেন না। এরা প্রকৃত ঋণখেলাপি। আরেকটি শ্রেণি আছে, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করে আটকে রাখে। এরা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। পরিস্থিতির কারণে যারা ঋণখেলাপি হয়েছেন আর যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে ঋণের কিস্তি আটকে রাখেন, তাদের একই পাল্লায় পরিমাপের সুযোগ নেই।
প্রাপ্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যান মোতাবেক, দেশের ব্যাংক খাতে মঞ্জুরিকৃত এবং ছাড় করা ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে দৃশ্যমান ঋণের (অর্থাৎ ব্যাংক যে ঋণের পরিমাণ প্রকাশ বা প্রদর্শন করে) পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের এক নম্বর ব্যাংক ঋণখেলাপি দেশ। দারিদ্র্যপীড়িত দেশ চাঁদ ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। গিনির (ইকোয়েটরিয়ান) ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ। এ খাতে জুন কোয়ার্টারে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর বাইরে বিপুল পরিমাণ ঋণের উপস্থিতি রয়েছে, যেগুলো ব্যাংক প্রদর্শন করে না। এর মধ্যে পুনঃতফসিলিকৃত ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংক হচ্ছে একটি দেশের অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’। ব্যাংক ব্যবসার ধরন অন্য দশটি সাধারণ ব্যবসার মতো নয়। ব্যাংক নিজের অর্থে ব্যবসা করে না। তারা নির্দিষ্টি হারে মুনাফা প্রদানের শর্তে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এবং সেই অর্থ বিনিয়োগ করে যে বেনিফিট লাভ করে, সেটাই ব্যাংকের পুঁজি। আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতাদের মাঝে ব্যাংক কার্যত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে থাকে। আমানতকারীর অর্থের সুরক্ষা দেওয়া ব্যাংকের একটি বড় দায়িত্ব। কিন্তু উদ্যোক্তা ও সাধারণ গ্রহীতাকে ঋণ প্রদানের পর সেই ঋণের কিস্তি যদি সঠিক সময়ে নিয়মিত আদায় না হয়, তাহলে ব্যাংক বিপাকে পড়ে। কারণ ব্যাংক প্রদত্ত ঋণের কিস্তি আদায় করতে না পারলেও আমনতকারীদের ঠিকই নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করতে হয়। তাই ঋণ প্রদানকালে প্রাথমিকভাবে ঋণ আবেদনকারীকে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা ব্যাংকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ব্যাংক যদি ঋণ আবেদনকারীকে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে, তাহলে সমূহ বিপদ ঘটার আশঙ্কা থাকে। ঋণ প্রদানের পর তা আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে ঋণদানের আগে আবেদনকারীদের সঠিকভাবে যাচাই করা একজন ব্যাংকারের জন্য সবচয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা যখন কোনো ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করেন, তখন তার আচার-আচরণ এবং দাখিলকৃত ডকুমেন্ট ভালোভাবে যাচাই করা হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অধিকাংশ ব্যাংকে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের বিপুল প্রভাব লক্ষ করা গেলেও তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। প্রতিটি ব্যাংকেই এখনো সৎ ও যোগ্য অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন। কিন্তু তারা সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। যারা ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা, তারা যদি সৎ ও দায়িত্বশীল হন, তাহলে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তারা অসৎ পন্থা অবলম্বনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বাধ্য থাকেন। সততা ও দুর্নীতি উপর থেকে নিচের দিকে ধাবিত হয়। একটি ঋণ প্রস্তাব ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্যায়ে যেতে হলে অন্তত ৭ থেকে ৮ জন কর্মকর্তার সুপারিশ/মতামত প্রয়োজন হয়। প্রত্যেক কর্মকর্তা তার বিবেচনা মোতাবেক ঋণ প্রস্তাবের অনুকূলে বা প্রতিকূলে তার মতামত উপস্থাপন করবেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেসব মতামত থেকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত সমর্থন করবেন। অথবা নিজে বিকল্প কোনো মত প্রদান করবেন। এটাই প্রত্যাশিত ও নিয়ম। কিন্তু ব্যাংকগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, একজন কর্মকর্তাও ভিন্নমত প্রদান করেন না। এর অর্থ হচ্ছে, নিচের পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা তার নিজস্ব স্বাধীন মতামত নোটে উপস্থাপন করতে পারেন না। শীর্ষ কর্মকর্তা যেভাবে নোট উপস্থাপন করতে বলেন, নিচের দিকের কর্মকর্তারা ঠিক সেভাবেই নোট উপস্থাপন করে থাকেন। ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক আমলাতন্ত্রের সংস্কার সংক্রান্ত আলোচনাকালে মন্তব্য করেছিলেন, কেরানি থেকে ডিজি পর্যন্ত সবাই যদি একই মত পোষণ করেন, তাহলে কেরানি আর ডিজি থাকলেই তো হয়। মাঝখানে এত কর্মকর্তার প্রয়োজন কী? আমরা এখনো সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। খেলাপি ঋণ কালচার বন্ধ বা কমিয়ে আনতে হলে ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
খেলাপি ঋণ সৃষ্টির নানাবিধ কারণ রয়েছে। তবে আমি এখানে অনালোচিত একটি সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ঋণের নিরাপত্তা হিসাবে স্থাবর সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে রেজিস্ট্রিমূলে বন্ধক দিতে হয়। বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, জামানতের হার ১:১.২৫ শতাংশ অথবা ১:১.৫০ শতাংশ। অর্থাৎ কেউ যদি ১০০ টাকা ঋণ গ্রহণ করতে চান, তাহলে তাকে ১২৫ টাকা অথবা ১৫০ টাকার স্থাবর সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে বন্ধক দিতে হয়। সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটে বন্ধকিযোগ্য সম্পত্তির ভ্যালুয়েশনের ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক চাপ অথবা অন্য কোনোভাবে যদি ব্যাংকের শীর্ষ কর্তৃপক্ষকে খুশি করা যায়, তাহলে ১০ টাকার সম্পত্তির ভ্যালুয়েশন ২০০ টাকা দেখানোও কোনো সমস্য হয় না। আবার ব্যাংক কর্মকর্তারা যদি সংশ্লিষ্ট ঋণ আবেদনকারীর প্রতি সন্তুষ্ট না থাকেন, তাহলে ১০০ টাকার সম্পত্তি ৫০ টাকা ভ্যালুয়েশন দেখানোও সম্ভব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আদালতের নির্দেশে যখন কোনো খেলাপি ঋণের বিপরীতে বন্ধকীকৃত সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, হয়তো তখন উপযুক্ত ক্রেতা পাওয়া যায় না। এর অন্যতম কারণ, ব্যাংক নিলামে সম্পত্তির যে দর নির্ধারণ করে, বাস্তবে সেই সম্পত্তির মূল্য থাকে অনেক কম।
বন্ধকীযোগ্য সম্পদ ভ্যালুয়েশন সিস্টেমের মধ্যেই গলদ রয়েছে। সাধারণত দেখা যায়, ব্যাংকের কোনো শাখায় ঋণ প্রস্তাব দাখিল করা হলে ম্যানেজার একজন ইঞ্জিনিয়ার, একজন ইকোনমিস্ট অথবা অ্যাকাউন্ট্যান্টসহ মোট তিনজনের একটি টিম গঠন করে তাদের ওপর বন্ধকিযোগ্য সম্পদ ভ্যালুয়েশনের দায়িত্ব দিয়ে থাকেন। ম্যানেজার আগেই ভ্যালুয়েশন টিমকে নির্দেশনা দেন সম্পত্তির মূল্যায়ন কত করতে হবে। টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আশপাশের লোকজনের কাছে জানতে চান এ সম্পত্তির মূল্য কত হতে পারে। ঋণ আবেদনকারী আগে থেকেই তার পছন্দনীয় লোকজন সম্পত্তির কাছে জড়ো করে রাখেন। তারা সম্পত্তির মূল্য বাড়িয়ে বলেন। এভাবেই ১০ টাকা মূল্যের সম্পত্তি ৫০ টাকা হয়ে যেতে পারে। আবার আবেদিত ঋণের পরিমাণ যদি বেশি হয়, তাহলে ব্যাংকের নিবন্ধিত ভ্যালুয়েশন কোম্পানির মাধ্যমেও সম্পত্তির ভ্যালুয়েশন করা হয়। কিন্তু বাইরের ভ্যালুয়েশন কোম্পানির পক্ষেও সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না। কারণ ম্যানেজার যেভাবে মূল্যায়ন করতে বলবেন, তারা ঠিক সেভাবেই মূল্যায়ন করে থাকে। ভ্যালুয়েশন কোম্পানি যদি ম্যানেজারের নির্দেশনা উপেক্ষা করে সম্পত্তির সঠিক মূল্যায়ন করে, তাহলে পরবর্তীকালে সেই কোম্পানিকে আর কোনো কাজ দেওয়া হয় না। অথবা কাজ দিলেও বিল প্রদানের ক্ষেত্রে নানা ঝামেলা করা হয়। এ চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
এ থেকে মুক্তির জন্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধ করা যেতে পারে। কোনো ঋণ প্রস্তাবের বিপরীতে বন্ধকিযোগ্য সম্পদ যদি অতিমূল্যায়ন করা হয়, তাহলে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার ম্যানেজারকে দায়বদ্ধ করা যেতে পারে। যে ম্যানেজারের নির্দেশে সম্পদের অতিমূল্যায়ন করা হয়েছে, তাকে চাকরিচ্যুত করাসহ নানা ধরনের কঠিন শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। এমনকি সম্পদ অতিমূল্যায়ন করার অভিযোগ যে ম্যানেজারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হবে, তিনি যদি চাকরি থেকে অবসরে যান, তাহলে তার অবসর বেনিফিট আটকে দেওয়া যেতে পারে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা যদি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। কাজেই খেলাপি ঋণ সৃষ্টির পর তা আদায়ের চেষ্টা করার চেয়ে খেলাপি ঋণ যাতে তৈরি না হয় সেই চেষ্টা করাই উত্তম।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : অর্থনীতিবিদ, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা
অনুলিখন : এম এ খালেক
