ট্রাম্পের দৃষ্টিতে জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহু
Advertisement
আহমদ আসমার
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অক্টোবরে মাত্র ৮ দিনের ব্যবধানে দুই যুদ্ধকালীন নেতাকে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন দুটি মন্তব্য করেছেন, যা পাশাপাশি রাখলে আক্ষরিক অর্থেই একে স্বীকারোক্তির মতো শোনায়। ১০ অক্টোবর হোয়াইট হাউজ ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের কাছে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে নিয়ে ট্রাম্প বলেন : ‘আমার মনে হয় ইউক্রেনের এবার একজন নতুন প্রেসিডেন্ট খোঁজার সময় এসেছে।’ রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ থামানোর সুযোগ ‘বহুবার, বহু বহুবার’ হাতছাড়া করার এবং রুশ তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়ে ডিজেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি জেলেনস্কিকে সরাসরি দায়ী করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘সে ডিজেল নিয়ে আমাদের কৃষক ও খামারিদের বিপদে ফেলতে চায়।’
এরপর ১৮ অক্টোবর ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে একটি চিঠি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘একজন মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী এবং শান্তির এক অতুলনীয় অংশীদার’ হিসাবে আখ্যা দেন। ২৭ অক্টোবর ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র ৯ দিন আগে ওই চিঠিতে তিনি নেতানিয়াহুকে নিজের ‘সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত সমর্থন’ জানান।
ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নিঃশর্ত সমর্থনের ইতিহাস ঘাঁটলে নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের এ সমর্থন একেবারেই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু জেলেনস্কিকে নিয়ে তার মন্তব্য অনেককেই পুরোদস্তুর চমকে দিয়েছে। মূলত এ মন্তব্যগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের আসল চরিত্র প্রকাশ করে : তাদের রাজনীতি কোনো মিত্রতা বা বন্ধুত্বের ওপর নির্ভর করে না, বরং পুরোটাই স্বার্থের হিসাব-নিকাশ। যারা বিশ্বাস করেন, আমেরিকার সমর্থন মানেই এক অলঙ্ঘনীয় প্রতিশ্রুতি, তাদের জন্য এ দুটি বক্তব্য এক বিশাল শিক্ষণীয় বিষয়। পাশাপাশি এটি জেলেনস্কির নিজস্ব কৌশলগত ব্যর্থতাকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতে নিজের সক্ষমতার বাস্তব মূল্যায়ন না করে তিনি অন্ধের মতো এমন এক পরাশক্তির ওপর ভরসা করেন, যাদের কাছে নিজেদের স্বার্থই শেষ কথা।
জেলেনস্কির এ আকস্মিক পতনের শুরুটা মূলত ডিজেল নিয়ে এক বিরোধ থেকে। ৯ অক্টোবর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর ট্রাম্প একটি চুক্তির ঘোষণা দেন। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া তাৎক্ষণিকভাবে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে, নভেম্বরে দেবে আরও ৫ লাখ টন এবং এরপর এর পরিমাণ আরও বাড়বে। ক্রেমলিন জানায়, ‘আমেরিকান ও বৈশ্বিক বাজারে’ জ্বালানি সরবরাহ করতে তারা প্রস্তুত। অন্যদিকে জেলেনস্কি এ চুক্তির কড়া সমালোচনা করে বলেন, এটি হলো ‘এমন এক যুদ্ধে বিনিয়োগ, যা টেনে লম্বা না করে বরং এখনই শেষ করা উচিত।’ তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এই ডিজেলের দাম রাশিয়া ‘আরও বেশি আতঙ্ক ও প্রতারণা দিয়ে’ শোধ করবে। এর জবাবে ট্রাম্প ক্ষোভে ফেটে পড়েন। রুশ শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার কারণে রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদন তলানিতে ঠেকে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ে। এ হামলা থামাতে ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহ ধরেই জেলেনস্কিকে চাপ দিয়ে আসছিলেন। নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের নেশায় ট্রাম্প চেয়েছিলেন, ইউক্রেন একতরফাভাবে হামলা বন্ধ করুক, অথচ মস্কোর কাছে তিনি এমন কোনো দাবিই তোলেননি। সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা তো বলেইছিলাম, রাশিয়ার ওপর যা খুশি করো, শুধু শোধনাগারগুলোতে আঘাত কোরো না। অথচ সে কী করল? সে গিয়ে সোজা শোধনাগারেই হামলা চালাল।’
এক্ষেত্রে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের (৩ নভেম্বর) তখন মাত্র তিন সপ্তাহের মতো বাকি। ডিজেলের দাম প্রায় রেকর্ড ছুঁইছুঁই, যার ফলে প্রায় সবকিছুরই দাম বেড়ে যায়। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা ইরান যুদ্ধের জেরে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। মূলত ওই যুদ্ধ এবং কিছুটা ইউক্রেনের ড্রোন হামলাই ছিল এ জ্বালানি সংকটের পেছনের কারণ। জেলেনস্কিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ট্রাম্প মূলত জিনিসপত্রের দাম বাড়ার দায়ভার এক বিদেশি নেতার ঘাড়ে চাপান-ঠিক এমন এক সময়ে, যখন আমেরিকান ভোটাররা ক্ষমতাসীন দলকে ব্যালটের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া নিশ্চিত করে।
এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়, জেলেনস্কিকে ছুড়ে ফেলার বিষয়টি নিছক কোনো সাময়িক কৌশল নয়, বরং এটি কাঠামোগত বাস্তবতার ফসল। মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তিনি এখন আক্ষরিক অর্থেই এক অকেজো কার্ড। আমেরিকার মাটিতে ইসরাইলপন্থি গোষ্ঠীগুলোর যে প্রবল দাপট রয়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো কোনো ইউক্রেনীয় লবি সেখানে নেই। ট্রাম্প প্রশাসনসহ অন্য পশ্চিমা রাজনৈতিক মহলও মনে হচ্ছে এখন এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে আর জেতা সম্ভব নয়।
ট্রাম্পের এ অবজ্ঞার পেছনে যুদ্ধের এমন কিছু নির্মম সত্য লুকিয়ে আছে, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো কিয়েভকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার যতই ইন্ধন দিক না কেন, আলোচনার টেবিলে না বসে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি কিন্তু জেলেনস্কিরই ছিল। তিনি নিজের সব বাজি ধরেছিলেন পশ্চিমা সমর্থনের ওপর। তার সাবেক মুখপাত্র ইউলিয়া মেন্দেল দাবি করেছেন, যুদ্ধ থামানোর অন্তত সাতটি উদ্যোগ জেলেনস্কি নিজেই নস্যাৎ করে দিয়েছেন (অবশ্য জেলেনস্কির কার্যালয় এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে)। ২০২২ সালের অক্টোবরে তিনি পুতিনের সঙ্গে যে কোনো ধরনের আলোচনাকে ‘অসম্ভব’ ঘোষণা করে একটি ডিক্রিতেও স্বাক্ষর করেন। এর চূড়ান্ত পরিণতি এখন সবার সামনে পরিষ্কার : বিদেশি শক্তির ওপর অন্ধের মতো নির্ভর করে তিনি আজ এমন এক চোরাবালিতে আটকে পড়েছেন, যেখানে বিদেশি সাহায্যও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ের ন্যূনতম কোনো সম্ভাবনাও আর অবশিষ্ট নেই।
নেতানিয়াহুর হিসাবটা একেবারেই ভিন্ন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ওয়াশিংটন এ আদালতের বিচারক, ডেপুটি প্রসিকিউটর ও প্রেসিডেন্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিলেও সেই পরোয়ানা কিন্তু এখনো বহাল রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার চোখে তিনি একজন পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি। অথচ আমেরিকার একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট কিনা অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও উষ্ণ ভাষায় তার পুনঃনির্বাচনকে সমর্থন জানায়।
কিন্তু কেন? কারণ ট্রাম্পের নিজের স্বার্থেই তাকে প্রয়োজন-তা সে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর জন্যই হোক, কিংবা মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলপন্থি লবিগুলোর সাজানো নির্বাচনি ছকের কারণে। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো ‘আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’ (এআইপিএসি)। এক মার্কিন সেনেটরের মতে, নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচক প্রার্থীদের হারাতে এ গোষ্ঠী ২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার খরচের ছক কষেছে। ট্রাম্প যদি এখন নেতানিয়াহুকে ছুড়ে ফেলেন, তবে তা হবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করার নিজের সিদ্ধান্তকেই জলাঞ্জলি দেওয়া। তিনি মনে করেন, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এ ইসরাইলি নেতাই প্রধান ভরসা।
জেলেনস্কি আর নেতানিয়াহুর মধ্যকার এ ব্যবধান কোনো ভালো আর মন্দের লড়াই নয়। এটি মূলত একটি বাস্তবধর্মী শিক্ষা যে, একজন নেতা কতদূর পর্যন্ত বিদেশি শক্তির ওপর ভরসা করতে পারেন। নেতানিয়াহু আজও অপরিহার্য রয়ে গেছেন, এর কারণ এই নয় যে, তার ওপর থেকে অপরাধের দায় মুছে গেছে; বরং যিনি তাকে সমর্থন দিয়েছেন, তার কাছে তিনি এখনো দারুণ কাজের মানুষ। অন্যদিকে, ট্রাম্পের চোখে জেলেনস্কি এখন এক অপ্রয়োজনীয় বোঝা, তাই তাকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। তাছাড়া আমেরিকায় তাকে রক্ষা করার মতো কোনো শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ লবিও নেই।
এই পার্থক্য শুধু দুজন নেতার বা তাদের সংঘাতের নয়; এটি মূলত একটি ‘লাভজনক সম্পদ’ এবং একটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ বোঝার’ মধ্যকার পার্থক্য। একজন হলেন আন্তর্জাতিকভাবে ফেরারি এক সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধী, যিনি প্রকাশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের লিখিত সমর্থন পেয়েছেন। অন্যজন এক যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট, যার মুখের ওপর প্রকাশ্যেই বলে দেওয়া হয়েছে যে, তার দেশের এখন অন্য কাউকে খুঁজে নেওয়া উচিত। এ চরম বৈপরীত্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বর্তমান ভূরাজনীতির এক জীবন্ত নির্দেশিকা। যারা নিজেদের ভাগ্য ওয়াশিংটনের হাতে সঁপে দেন, তাদের উচিত জেলেনস্কির পরিণতি থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং বিদেশি শক্তির কাছে প্রত্যাশার লাগাম টেনে ধরা। কারণ, এসব পরাশক্তির সহায়তা কখনোই নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আসবে না। এটাই আজকের দিনের আমেরিকান রাজনীতির নগ্ন বাস্তবতা।
মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে : পরম ওয়াজেদ শিকদার
আহমদ আসমার : তুরস্কভিত্তিক সাংবাদিক
