সাক্ষাৎকার
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তাৎপর্যপূর্ণ: এম হুমায়ুন কবীর
Advertisement
খালিদ বিন আনিস
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফর, দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ), মুক্ত ও উন্মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (এফওআইপি) কৌশল, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিসহ নানা দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে যুগান্তরের মুখোমুখি হয়েছিলেন সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষক এম হুমায়ুন কবীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-
খালিদ বিন আনিস
যুগান্তর : বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এম হুমায়ুন কবীর : সামগ্রিক দিক বিবেচনা করলে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক সফর হিসাবেই গণ্য করা যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের সামষ্টিক নীতিমালায় যেসব বিষয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে, সেগুলোর বিচারে এ সফরের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। আমি মূলত এ গুরুত্বকে দুটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে চাই। প্রথমত, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার যে জোর চেষ্টা চলছে, সেই জায়গায় এ সফরটি একটি বড় অনুঘটক হিসাবে কাজ করতে পারে। আমরা যদি গত ৮ থেকে ৯ মাসের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখতে পাব, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবার শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে প্রচুর কূটনৈতিক সমর্থন, বৈদেশিক সাহায্য এবং টেকসই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। সেই বিচারে জাপান আমাদের অত্যন্ত সুপরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত এক বন্ধু। ঐতিহাসিকভাবেই জাপান আমাদের শীর্ষ অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগী এবং দেশের এক নম্বর দ্বিপাক্ষিক তহবিলদাতা দেশ। দ্বিতীয়ত, সরকারের বর্তমান কৌশল পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা মূলত দুই থেকে তিনটি প্রধান খাতে জাপানের শক্তিশালী অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো, জ্বালানি খাত। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশ বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এ খাতের স্থায়িত্ব রক্ষায় বিপুল বৈদেশিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি হলো, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)। দেশে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের বিনিয়োগ খরা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। আর দেশে যদি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা না যায়, তবে চব্বিশের ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে বিপুল তরুণ সমাজ এক ধরনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে, তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। কর্মসংস্থানের অভাব রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সুতরাং, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামষ্টিক অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন, নতুন শিল্প বিনিয়োগ এবং তরুণদের কর্মসংস্থান-এ প্রতিটি জরুরি জায়গাতেই সরকারের পক্ষ থেকে জাপানের সমর্থন চাওয়া হয়েছে। আর এ সফরের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক সাফল্য হলো, জাপানের পক্ষ থেকে আশ্বাস এসেছে, তারা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এর ফলে দেশের অন্তত দুই লাখ তরুণের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ প্রতিশ্রুতি যদি মাঠপর্যায়ে সত্যি সত্যিই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে তা সরকার ও দেশের জন্য এক বিরাট অর্থনৈতিক কল্যাণ বয়ে আনবে।
যুগান্তর : এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং জাপানি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) স্বাক্ষরের যে আলোচনা চলছে, এ সফর কি সেই প্রক্রিয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছে?
এম হুমায়ুন কবীর : গত ফেব্রুয়ারিতে উভয় দেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের ব্যাপারে চূড়ান্ত ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছিল। এবারের উচ্চপর্যায়ের সফরে দুই দেশের প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্বই-অর্থাৎ জাপানের প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী-এ চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর ও ত্বরান্বিত করার জোরালো কমিটমেন্ট নিশ্চিত করেছেন। ইপিএ স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশ ঠিক কোন কোন জায়গায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুফল পাবে, তা অনুধাবন করা জরুরি। এ চুক্তির ফলে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য বহুমুখীকরণের একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে। একইসঙ্গে দেশীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আধুনিকায়ন ঘটবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জটিল আইন-কানুন ও কলাকৌশল সহজীকরণের পথ প্রশস্ত হবে। বর্তমানে উভয়পক্ষই এ চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নে আন্তরিক। তবে এখানে একটি বড় ‘কিন্তু’ রয়েছে, যা আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক এসব চুক্তি থেকে প্রকৃত সুবিধা আহরণ করতে হলে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় একটি বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন বা উল্লম্ফন ঘটাতে হবে। জাপানি তরফ থেকে স্পষ্ট করেই কিছু শর্ত ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে-যার মধ্যে রয়েছে আমাদের আইনকানুন, রুলস অব অরিজিন, বাণিজ্য বিধিমালা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আধুনিকায়ন। তারা পরিষ্কারভাবে ব্যবসার সুপরিবেশ ও সুশাসনের কথা বলছে। জাপানিদের কথাগুলো মুখে শুনতে খুব ছোট মনে হলেও এর গভীরতা ও গুরুত্ব অপরিসীম।
আমরা যদি আমাদের অবকাঠামোগত সক্ষমতা, আইনি পরিকাঠামো, আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা এবং দক্ষ জনশক্তির মান বৃদ্ধি করতে না পারি, তবে জাপান সরকারের সঙ্গে যত চুক্তিই হোক না কেন, মাঠপর্যায়ে এর সুফল পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, ৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব আর ইপিএ বাস্তবায়ন-এ দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এর জন্য আমাদের নিজেদের ঘরের ভেতরের কাঠামোগত সংস্কার সাধন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
যুগান্তর : মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ (বিগ-বি) এবং দেশের অন্যান্য মেগা প্রকল্পে জাইকার ভূমিকা অত্যন্ত বড়। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এসব প্রকল্পের অর্থায়ন ও সময়মতো বাস্তবায়নে জাপান কতটুকু প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে পারে?
এম হুমায়ুন কবীর : জাপান বহু বছর ধরেই দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ‘বিগ-বি’ বাস্তবায়নে কাজ করছে। এটি তাদের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি বড় অংশ। মাতারবাড়ীতে আমাদের দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হচ্ছে, যা কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, পুরো অঞ্চলের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। জাপান এ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এনার্জি, ইন্ডাস্ট্রি, হাব-ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি এবং পুরো ভারত মহাসাগরীয় ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়। তবে এ হিসাব-নিকাশের সঙ্গে এ অঞ্চলের আরও কিছু পরাশক্তির স্বার্থ যুক্ত রয়েছে। প্রথমত, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের অত্যন্ত গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নজর রয়েছে। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক নানা কারণেই চীন ও জাপানের মধ্যে এক ধরনের সূক্ষ্ম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। চীনের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে নানাবিধ আকর্ষণীয় প্রস্তাব রয়েছে। অতএব, আমাদের মূল কূটনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা সেখানেই দিতে হবে, যেখানে আমরা চীন ও জাপান উভয় দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে এবং তাদের পারস্পরিক সংঘাতের মধ্যে না জড়িয়ে নিজেদের উন্নয়ন লক্ষ্য হাসিল করতে পারছি কিনা।
দ্বিতীয়ত, জাপানের প্রস্তাবিত এই বিগ-বি উদ্যোগের সঙ্গে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সংযোগ করার একটি বড় প্রস্তাবনা টেবিলে রয়েছে। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণেই বাংলাদেশকে এখানে অত্যন্ত সতর্ক ও বিচক্ষণ নীতি গ্রহণ করতে হবে। আমাদের স্পষ্ট রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান ঠিক রাখতে হবে। কৌশলগতভাবে বড় শক্তিগুলোর-তা সেটা চীন, ভারত, জাপান কিংবা আসিয়ান জোটভুক্ত দেশই হোক না কেন-কারও বৈরিতা বা অক্ষের প্রতিযোগিতায় আমরা জড়িয়ে পড়ব না। প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে সুষম, ভারসাম্যপূর্ণ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রেখে যদি মাতারবাড়ীর মতো মেগা প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তবেই বাংলাদেশ একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাব হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
যুগান্তর : জাপানের ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ দর্শনে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করা হয়। আঞ্চলিক ভৌগোলিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে বাংলাদেশ-জাপান প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি কতটা বাস্তবসম্মত?
এম হুমায়ুন কবীর : এ সফরের পর প্রকাশিত যৌথ ঘোষণাপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশ অত্যন্ত পরিপক্ব ও চতুর কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেছে। জাপানের মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক (Free and Open Indo-Pacific-FOIP) ধারণার জবাবে বাংলাদেশ বলেছে-‘উই হ্যাভ নোটেড’, অর্থাৎ আমরা বিষয়টি লক্ষ করেছি বা বিজ্ঞাপিত হয়েছি। আমরা যে হুট করে এতে সরাসরি সামরিক বা রাজনৈতিকভাবে যুক্ত হয়ে গেছি-এমনটা বাংলাদেশ পরিষ্কারভাবেই এড়িয়ে গেছে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি চাল। কারণ জাপান যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে এফওআইপির কথা বলে, তখন বেইজিং সেই বক্তব্যকে তাদের বিরুদ্ধে একটি অক্ষ তৈরির প্রয়াস হিসাবে দেখে এবং ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে না। বাংলাদেশ যেহেতু সব দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বের নীতিতে বিশ্বাসী, তাই আমরা জাপানের কৌশলগত গুরুত্বকে অনুধাবন করেও কোনো বিশেষ ব্লকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বার্তা দিইনি।
তবে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে জাপান-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে জোরদার হচ্ছে। জাপান সরকার তাদের ওডিএ’র (Official Development Assistance) পাশাপাশি ওএসএ (Official Security Assistance) নামক নতুন একটি কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশকে এনেছে। ইতোমধ্যে তারা আমাদের কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা বাড়াতে একটি আধুনিক টহল জাহাজ হস্তান্তর করেছে এবং আরও পাঁচটি জাহাজ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আমার মনে হয়, সমুদ্র নিরাপত্তা ও কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা বাড়ানোর সুবিধার্থে জাপানের কাছ থেকে এ ধরনের টহল জাহাজ বা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম গ্রহণ করলে চীন বা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্কে কোনো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
যুগান্তর : জাপানের শ্রমবাজারে বর্তমানে মারাত্মক জনবল সংকট চলছে। বাংলাদেশ কীভাবে সাধারণ শ্রমিকের বদলে আইটি, নার্সিং ও প্রকৌশল খাতে উচ্চমানের দক্ষ জনশক্তি প্রেরণে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে পারে?
এম হুমায়ুন কবীর : জাপানি শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর বিষয়টি কেবল কিছু কারিগরি সার্টিফিকেট অর্জনের বিষয় নয়; এটিকে দুটি ভিন্ন মাত্রায় দেখতে হবে-প্রথমটি টেকনিক্যাল বা পেশাগত দক্ষতা এবং দ্বিতীয়টি হলো, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপযোগিতা। প্রথমত, কারিগরি দক্ষতার জায়গায় আমাদের নার্সিং, আইটি, ড্রাইভিং কিংবা টেক্সটাইলের মতো নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। তবে তার চেয়েও বড় কথা হলো, আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজে ‘দক্ষতা’ বা ‘ওয়ার্ক কালচার’ বিষয়টি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার ফসল। এটি শুধু শ্রেণিকক্ষে অর্জিত টেকনিক্যাল বিদ্যা নয়। জাপানি সমাজ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি শান্তিকামী, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং পরম কর্মনিষ্ঠ এক জাতি। জাপানিদের কাজের মান বিশ্বজুড়ে সর্বজনস্বীকৃত; কারণ তারা কাজে কোনো প্রকার ফাঁকি দেয় না। জাপানিরা কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে ঠকায় না, এমনকি সেখানে কর্মচারীদের জোর করে ছুটিতে পাঠাতে হয়!
অতএব, আমরা যখন বাংলাদেশ থেকে জাপানে লোক পাঠানোর পরিকল্পনা করব, তখন কেবল নার্সিং বা আইটি ট্রেনিং দিলেই চলবে না; সেই সঙ্গে তাদের মধ্যে জাপানিদের জীবনযাত্রা, তাদের ভাষা, কাজের প্রতি আত্মনিবেদিত মানসিকতা, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক তালিম দিতে হবে। আমাদের মূল শিক্ষা কাঠামোতেই সার্বিক দক্ষতা ও শৃঙ্খলার চর্চা বাড়াতে হবে। আজ ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো কীভাবে জাপানের বাজারে হাজার হাজার দক্ষ লোক পাঠাচ্ছে, তাদের অভিজ্ঞতা ও মডেল আমাদের গভীরভাবে রূপরেখা তৈরি করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সঠিক কৌশল, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে জাপানের মতো একটি উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন দেশে বাংলাদেশের জন্য স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ এক শ্রমবাজার গড়ে তোলা পুরোপুরি সম্ভব।
যুগান্তর : মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক জান্তা সরকারের ওপর জাপানের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপান কি আরও কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখতে পারে?
এম হুমায়ুন কবীর : রাখাইনে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন এবং সেখানে টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে জাপানের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। আমরা জানি, মিয়ানমারে বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে জাপানের বিপুল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ রয়েছে এবং নেপিডোর ওপর টোকিওর এক ধরনের বিশেষ প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা রয়েছে। তবে এ সংকটের রাজনৈতিক সমীকরণটি বেশ জটিল। কারণ চীনও এ রোহিঙ্গা ইস্যুতে দ্বিপাক্ষিক মধ্যস্থতাকারী হিসাবে যুক্ত থেকে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে। ফলে এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে এ সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি সার্বিক অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে এবং মিয়ানমার সরকার যদি ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার মতো আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে, তবেই জাপান তার প্রভাব ব্যবহার করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য একটি কার্যকর ও শক্তিশালী কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
এম হুমায়ুন কবীর : ধন্যবাদ।
