বৈষম্য কত গভীর হলে আমাদের চোখে পড়ে
Advertisement
ড. একেএম আহসান উল্লাহ
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ধরা যাক, একজন বিদেশি প্রথমবার বাংলাদেশে এলেন। বিমানবন্দরের আলোকিত পরিসর, কাচের দেওয়াল, ব্যস্ত মানুষের চলাচল দেখে তার মনে হলো, দেশটি এগোচ্ছে। সেখান থেকে শহরে এসে মেট্রোরেলে উঠলেন। সময়মতো ট্রেন আসে, দরজা খোলে, মানুষ গন্তব্যে পৌঁছায়। জানালার বাইরে উঁচু ভবন। উন্নয়নের এই দৃশ্য মিথ্যা নয়। কিন্তু স্টেশন থেকে নেমে কয়েকটি গলি পেরোতেই তিনি আরেক বাংলাদেশের মুখোমুখি হলেন : ক্লান্ত মুখ, কাজের অনিশ্চয়তা, চিকিৎসার টাকা জোগাড়ের উদ্বেগ। তার প্রথম ধারণাটি বদলে গেল। দেশটি এগোচ্ছে, কিন্তু সবাই কি একই ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে?
কিছু মানুষের দারিদ্র্য দেখলে বিস্ময়ের সঙ্গে অসহায় লাগে। মনে হয়, তাদের জীবনে যেন কিছুই নেই, আরও ভয়াবহ মনে হয়, হয়তো কিছুই হবে না। কিন্তু এ দ্বিতীয় ভাবনাটির মধ্যে আমাদের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতাও আছে। অনেক দরিদ্র মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা, বুদ্ধিমত্তা কিংবা পরিশ্রমের অভাব নেই। অভাব হলো সেসব অবলম্বনের, যেগুলো দিয়ে আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়। তাদের মুখে আমরা অনেক সময় দারিদ্র্যের চেয়ে বড় কিছু দেখি : দীর্ঘ অনিশ্চয়তার ক্লান্তি, বারবার চেষ্টা করেও অবস্থান বদলাতে না পারার ক্ষয়।
অন্যদিকে, আপনার পরিচিত কয়েকজনের বাড়ির প্রবেশদ্বার খালি পড়ে থাকার অভিজ্ঞতাটি ভাবুন। বিদেশ থেকে কোটি টাকা দামের দরজা আসেনি, তাই অপেক্ষা। এ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে গোটা দেশের বৈষম্য মাপা যাবে না। তবু দৃশ্যটি একটি গভীর প্রশ্ন সামনে আনে। একই সমাজে একজন অপেক্ষা করেন পছন্দের দরজাটির জন্য, অন্যজন অপেক্ষা করেন এমন একটি ঘরের জন্য, যেখানে বৃষ্টি ঢুকবে না। দুজনেরই অপেক্ষা আছে, কিন্তু একজনের অপেক্ষা রুচির, অন্যজনের বেঁচে থাকার। কখনো কখনো টাকার ব্যবধানের চেয়ে অপেক্ষার এ পার্থক্যে বেশি স্পষ্ট হয়।
পরিসংখ্যানও ব্যবধানটির সাক্ষ্য দেয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে সর্বোচ্চ আয়ের ১০ শতাংশ খানার অংশ ছিল মোট খানাভিত্তিক আয়ের ৪০.৯২ শতাংশ, সর্বনিম্ন আয়ের ১০ শতাংশের অংশ মাত্র ১.৩১ শতাংশ। সমান আকারের এ দুই গোষ্ঠীর আয়-অংশের ব্যবধান প্রায় ৩১ গুণ। আয় বৈষম্যের গিনি সহগ ২০১৬ সালের ০.৪৮২ থেকে ২০২২ সালে ০.৪৯৯ হয়েছে; শহরে তা ০.৫৩৯। এগুলো আয়ের হিসাব, সম্পদের নয়; আবার ২০২২ সালের পরিমাপকে আজকের হুবহু চিত্রও বলা যাবে না। তবে বৈষম্যের গভীরতা বোঝার জন্য এগুলো শক্ত ভিত্তি।
এখানে বাংলাদেশের অর্জন অস্বীকার করার কারণ নেই। দারিদ্র্য হ্রাস, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্যানিটেশনে অগ্রগতি বাস্তব। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে জাতীয় উচ্চ দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ২০১০ সালের ৩৭.১ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ১৮.৭ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু দারিদ্র্য কমা ও বৈষম্য কমা একই ঘটনা নয়। নিচের মানুষ কিছুটা এগোলেও ওপরের মানুষ অনেক দ্রুত এগোতে পারেন। তখন জীবনযাত্রার উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক দূরত্বও বাড়ে। প্রশ্নটি তাই শুধু কত মানুষ দারিদ্র্যসীমা পেরিয়েছেন নয়, তারা কতটা নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছেছেন।
এ বৈষম্য শুধু বাংলাদেশে ঘটে না। অনেক উন্নয়নশীল, এমনকি ধনী দেশেও সমৃদ্ধি ও বঞ্চনা পাশাপাশি থাকে। বাংলাদেশের প্রশ্নটা হলো, অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বিস্তৃত সুযোগে রূপান্তরের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর। বাজার আয় সৃষ্টি করে, কিন্তু তার শুরুতে সবাই সমান অবস্থানে থাকেন না। কারও জমি আছে, কারও পুঁজি, কারও পরিচিতি আছে, কারও ভালো শিক্ষার সুযোগ। অন্য কেউ শুরু করেন ঋণ, অপুষ্টি ও পরিবারের দায় নিয়ে। এ অসম সূচনা সংশোধিত না হলে প্রতিযোগিতা অনেক সময় পুরোনো সুবিধাকেই নতুন সাফল্যের ভাষায় ফিরিয়ে আনে।
দুটি শিশুর কথা ভাবা যায়। একজনের ঘরে বই, নিরিবিলি পড়ার জায়গা, প্রয়োজনে শিক্ষক ও চিকিৎসক আছেন। অন্যজনের পড়ার সময় নির্ভর করে ঘরের কাজ, বিদ্যুৎ কিংবা উপার্জনের প্রয়োজনের ওপর। পরে একই পরীক্ষায় বসিয়ে আমরা বলি, মেধার বিচার হচ্ছে। পরীক্ষা প্রয়োজনীয়, কিন্তু পরীক্ষার আগের জীবনের অসমতাও ফলাফলে উপস্থিত থাকে। পরিবারের অর্থ শিক্ষার মানে রূপান্তরিত হয়; শিক্ষা, পেশা ও সামাজিক যোগাযোগে; সেগুলো আবার আয় ও সম্পদে। এভাবে বৈষম্য উত্তরাধিকার সূত্রে শুধু জমি পায় না, সম্ভাবনাও পায়।
সম্পদের মালিকানা ব্যবধানটিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে। জমি, বাড়ি কিংবা ব্যবসার অংশীদারত্ব থেকে আয় ও মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ পাওয়া যায়। মজুরিনির্ভর পরিবারের আয় আসে কাজ করতে পারার শর্তে। অসুস্থ হলে আয় থামে, কিন্তু ভাড়া ও খাবারের খরচ থামে না। মূল্যস্ফীতিও তাদের বেশি আঘাত করে, কারণ প্রয়োজনীয় পণ্যে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় এবং ব্যয় কমানোর অবকাশ অল্প। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ অসুস্থতা, দুর্যোগ বা অন্য আকস্মিক আঘাতে দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। দারিদ্র্য থেকে সাময়িক মুক্তি তাই সবসময় নিরাপত্তা নয়।
এর সঙ্গে যোগ হয় ক্ষমতায় প্রবেশের অসমতা। বৈধ উদ্যোগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে সম্পদ অর্জন আর বিশেষ সংযোগের কারণে সুবিধা পাওয়া এক বিষয় নয়। ঋণ, সরকারি ক্রয়, অনুমোদন কিংবা বিচারপ্রাপ্তিতে প্রভাব খাটানোর সুযোগ থাকলে আয়বণ্টন শুধু বাজারের ফল থাকে না। নিয়ম কার জন্য কতটা কার্যকর, সেটিও সম্পদ নির্ধারণ করে। তাই সব ধনীকে দুর্নীতিগ্রস্ত ভাবা যেমন ভুল, সব সম্পদকে পরিশ্রমের স্বাভাবিক পুরস্কার ভাবাও অসম্পূর্ণ। বিশ্লেষণের কেন্দ্র হওয়া উচিত সম্পদ অর্জনের পথ এবং সেই পথে সবার প্রবেশাধিকার।
বিমানবন্দর ও মেট্রোরেলের পাশের বঞ্চনাকে এ জায়গা থেকে দেখতে হবে। অবকাঠামো মানুষের সময় বাঁচায়, উৎপাদন বাড়ায়, শহরকে সংযুক্ত করে। কিন্তু স্টেশনের কাছে জমির দাম বাড়লে জমির মালিক লাভবান হন, ভাড়াটিয়ার খরচও বাড়তে পারে। উন্নয়ন থেকে কে কতটা সুবিধা পাবেন, তা নির্ভর করে ভাড়া, যাতায়াত ব্যয়, কর্মসংস্থান ও আবাসননীতির ওপর। একটি পরিচ্ছন্ন ট্রেন থেকে নেমে যদি মানুষ অনিরাপদ বাসস্থান ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার জীবনে ফেরেন, তাহলে পরিবহণ আধুনিক হয়েছে, কিন্তু জীবনযাপনের নিরাপত্তা একই গতিতে বাড়েনি।
বৈষম্যের সবচেয়ে নীরব ক্ষতি ঘটে ভবিষ্যৎ ভাবার ক্ষমতায়। প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটাতে ব্যস্ত মানুষ দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে পারেন না, ভালো কাজ খুঁজতে দূরে যেতে পারেন না, ব্যবসার ঝুঁকি নিতে পারেন না। আমরা পরে তাদের সিদ্ধান্তকে অদূরদর্শী বলি। অথচ আগামী মাসের ভাড়া অনিশ্চিত হলে আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা করা কঠিন। দারিদ্র্য তখন শুধু কম আয় নয়; সিদ্ধান্তের পরিসর সংকুচিত হয়ে যাওয়া। এ সংকোচন বোঝা ছাড়া দরিদ্র মানুষকে নিয়ে সহানুভূতি সহজেই পৃষ্ঠপোষকতায় পরিণত হয়।
প্রতিকারের শুরু হওয়া উচিত জীবনের মৌলিক ঝুঁকি কমানো দিয়ে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ওষুধ নিশ্চিত করলে অসুস্থতা পরিবারের অর্থনৈতিক পতনের কারণ কম হবে। সরকারি বিদ্যালয়ে শেখার মান, পুষ্টি ও প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা বাড়ালে জন্মপরিস্থিতির প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব। অর্থ বরাদ্দের সঙ্গে দেখতে হবে সেবা বাস্তবে পৌঁছাচ্ছে কি না। একটি বিদ্যালয়ের ভবন আছে কি না এবং সেখানে শিশু শিখছে কি না-দুটি আলাদা প্রশ্ন।
পরবর্তী কাজ ভালো কর্মসংস্থান। দক্ষতা প্রশিক্ষণকে নিয়োগের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা, ছোট প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও বাজারে প্রবেশ সহজ করা এবং জেলা শহরে উৎপাদন ও সেবা খাতের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। নারীর কাজের সুযোগে নিরাপদ যাতায়াত ও শিশুযত্নও অর্থনৈতিক অবকাঠামো। কৃষকের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারসংযোগ গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সঙ্গে শ্রমিকের প্রাপ্য আয় এবং কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষা বাড়াতে হবে। কাজ আছে বলেই একটি পরিবার নিরাপদ, এমন ধরে নেওয়া যায় না।
এর অর্থায়নে প্রয়োজন ন্যায্য ও কার্যকর করব্যবস্থা। উচ্চ আয়, সম্পত্তি ও মূলধনি লাভের যথাযথ হিসাব, অযৌক্তিক করছাড়ের মূল্যায়ন এবং কর ফাঁকি রোধ জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক সহায়তায় যোগ্যতার স্বচ্ছতা ও আপিলের ব্যবস্থা দরকার। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০২২ সালে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের অর্ধেক সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পায়নি, অথচ সবচেয়ে ধনী পরিবারের ৩৫ শতাংশ কোনো-না-কোনো সুবিধা পেয়েছে। এ অসামঞ্জস্য সংশোধন করা নতুন ঘোষণার চেয়েও জরুরি। সরাসরি অর্থ প্রদানের পাশাপাশি তালিকার ভুলও সংশোধন করতে হবে।
সেই বিদেশি হয়তো শেষে বুঝবেন, বিমানবন্দরও বাংলাদেশ, ক্লান্ত মুখের মানুষটিও বাংলাদেশ। দেশের সামগ্রিক চিত্র পেতে দুটিকেই দেখতে হয়। কোটি টাকার দরজা সমাজের সব সমস্যা ব্যাখ্যা করে না, কিন্তু তার পাশে আশ্রয়হীন মানুষের উপস্থিতি আমাদের উন্নয়নের হিসাবকে প্রশ্ন করে। একটি দেশের সমৃদ্ধি কত দূর পৌঁছেছে, তা বোঝা যায় সবচেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষটির ভবিষ্যৎ কতটা বদলাতে পারে, সেখানে। যে শিশুটি আজ অনিশ্চয়তার মধ্যে জন্মাচ্ছে, তার জন্য কি এমন পথ আছে, যেখানে পরিশ্রম সত্যিই জীবন বদলাবে? বাংলাদেশের বৈষম্য কমানোর সবচেয়ে গভীর পরীক্ষা হবে সেই পথটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।
ড. একেএম আহসান উল্লাহ : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও অভিবাসন, ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই
