Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

বিনিয়োগের খরা কাটানোর পদক্ষেপ জরুরি

Advertisement

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে ভালো অবস্থায় ছিল রেমিট্যান্স। কিন্তু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথিদের মধ্যে পালটাপালটি হামলায় সেখানেও হতাশা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকটের আঁচ বাংলাদেশেও পড়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে বিনিয়োগে চরম মন্দা চলছে। আর এ মন্দার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়েছে। ইতোমধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়ে গেছে দেশ। বাজেটের বিশাল অঙ্কের টাকা ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যাচ্ছে। দেশে বিনিয়োগ স্বাভাবিক থাকলে এ সমস্যা হতো না। এছাড়া বিনিয়োগ সংকটের কারণে সরকারের রাজস্ব আয়েও টান পড়েছে। রপ্তানিতে প্রভাব পড়েছে। তবে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো কারণও নেই। কারণ, দেশে ঋণের ওপর কর অত্যন্ত বেশি। একজন ব্যবসায়ী কিংবা কোম্পানির মালিককে নানা ধরনের ট্যাক্স দিতে হয়। যারা নিয়মিত কর দেন, তাদেরই আবার চেপে ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দ্বিতীয়ত, এমনিতেই পুঁজির সংকট, এর ওপর ঋণের সুদ অত্যন্ত বেশি। সুদ কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। সুতরাং এই হারে ট্যাক্স এবং ঋণের উচ্চসুদ দিয়ে বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসতে চাইবেন না, এটাই স্বাভাবিক। কেননা উচ্চহারে ট্যাক্স এবং ঋণের সুদ দিয়ে উদ্যোক্তা বা বিনিয়োগকারীরা আশানুরূপ মুনাফা করতে পারবেন না। এই হারে সুদ ও কর দিয়ে সৎভাবে কেউ ব্যবসা করলে তার লোকসান হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর লোকসান দিতে কেন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন? সরকারও এটি স্বীকার করে। সুতরাং দেশের এ ধরনের পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, সরকারের লক্ষ্য কর্মসংস্থান বাড়ানো। আর বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন বাজেট জরুরি। আয় বাড়াতে সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসতে হবে।

দেশের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের খরা কাটাতে আমাদের উদ্যোগী হতে হবে। তা না হলে দেশের অর্থনীতির এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, পুরোনো উদ্যোক্তাদেরই ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে যাবে। দেশে বেসরকারি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে প্রাণ ফেরাতে হলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসতে হবে। কেননা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রথমেই দেখবে দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে পাঁচ শতাংশের উপরে কি না, স্থানীয় বেসরকারি খাতগুলো এগিয়ে আসছে কি না, সমুদ্রবন্দর-বিমানবন্দর ঠিকমতো কাজ করছে কিনা ইত্যাদি। সুতরাং নিজেদের অর্থনীতির চলমান খাতগুলোকে যদি নিজেরা ঠিক না করি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাদের এখানে আসবে কেন? আর যা-ই হোক, তারা তো ঋণ বিক্রেতা। আইএমএফ বলি, বিশ্বব্যাংক বলি, তারা তো আমাদের কাছে ঋণ বিক্রি করতে চাইবে। কারণ, বাংলাদেশে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ আছে। এখন আমরা যদি নিজেরা হাত গুটিয়ে বসে থাকি এবং ওদের থেকে ঋণ নিয়ে নিয়ে দু-একটা প্রজেক্ট করেই ক্ষান্ত হয়ে যাই, তাহলে তো দেশ এগোবে না।

দেশের স্থলবন্দর, নদী বা সমুদ্রবন্দরগুলো অর্থনীতির চলমান খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। সুতরাং অর্থনীতির চাকা সচল করতে এসব বন্দরকে শক্তিশালী করতে হবে। এটা করার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করতে হবে। যেভাবেই হোক, সেটা করতে হবে। এবার ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কথায় আসি। এটা কি আন্তর্জাতিক মানে কাজ করছে? না, করছে না। কারণ গত ৫০ বছর ধরে এই বিমানবন্দরের বিভিন্ন অনিয়ম, অনাচার, দুর্নীতির চিত্রই আমরা দেখে আসছি। এখানে বিমানযাত্রীদের লাগেজ চুরি এবং লাগেজ পেতে মানুষের ভোগান্তির অন্ত নেই। আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের লাগেজ কেটে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির বিষয়টি কারও অজানা নয়। ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এসব চিত্র এখন আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। আমরা যেন দেখেও না দেখার ভান করছি। আসলে আমাদের বিমানবন্দরগুলোকে দেশীয় কৃর্তপক্ষের হাত থেকে বের করে আনা উচিত। এদের দিয়ে কিছু হবে না। ৫০ বছর তো দেখলাম। অবিলম্বে দেশের বিমানবন্দরগুলোকে, বিশেষ করে ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে বিদেশি কর্তৃপক্ষ বা বিদেশি এজেন্সির কাছে হস্তান্তর করে দিতে হবে। তা না হলে এর মান কখনো উন্নত হবে না। দেশের স্থলবন্দর, নদীবন্দর ও বিমানবন্দরগুলোকে যদি আধুনিকায়ন করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পারি, তাহলে এর একটি চিত্র যাবে বিদেশিদের কাছে। তখন তারা আমাদের দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।

আমাদের শেয়ারবাজারেও গতি আসছে না। অনেক সভা-সমাবেশ হয়, অনেক নীতিকথা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তবে শেয়ারবাজারের কিছু নীতি অনেক সহজ হয়েছে। সরকার তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য করসংক্রান্ত কিছু প্রণোদনা রেখেছে। সেটা আগে ১০ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ তালিকাভুক্ত কোম্পানি হলে করপোরেট আয়কর ১০ শতাংশ কম দিতে হতো। বর্তমানে যেটা দেওয়া হয়েছে, সেটা যৎসামান্য। আড়াই বা ৫ শতাংশ। যাই হোক, যেটাই দেওয়া হয়ে থাকুক না কেন, সেটা শর্তসাপেক্ষেই দেওয়া হয়েছে। তবে সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়টিকে এখন সহজ করা হয়েছে। আগে প্রাইভেট সেক্টরের কোম্পানিগুলো ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে যেতে পারত না, একটা রেস্ট্রিকশন ছিল। সেই রেস্ট্রিকশন এখন তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন যে কোনো কোম্পানি খুব সহজেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে।

বর্তমানে শেয়ারবাজার নিয়ে যে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার, সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কমিশন এবং ইদরা (বিমা কর্তৃপক্ষ)-এই চার পক্ষ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেবে পুঁজিবাজার নিয়ে। সমন্বয়টি হওয়ার পথে রয়েছে। এটা শেয়ারবাজারের জন্য কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, ঠিক জানি না। তবে যাই হোক না কেন, শেয়ারবাজার নিয়ে একটা সঠিক কার্যকর সিদ্ধান্তে আসা উচিত। কেননা আড়াই থেকে তিন বছর শেয়ারবাজারে কোনো আইপিও আসেনি। তালিকাভুক্তির বিষয়টিকে সহজ করার পরও এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্ত হয়নি। আর সরকারও কোনো কোম্পানি বিক্রি করতে পারেনি। সরকারি কোম্পানি বিক্রির বিষয়টি আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকার সময় শুরু হয়েছিল। বিক্রি করার জন্য সরকারি কোম্পানির তালিকাও করা হয়। কিন্তু একটিও বিক্রি করা যায়নি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারও সেটা করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের সাত মাস চলে গেছে, তারাও পারেনি। এসব বিষয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ দেখছি না। মানে কোনো ইমপ্লিমেন্টেশন দেখছি না। ইমপ্লিমেন্টেশনটি হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। আসলে শেয়ারবাজার নিয়ে অনেক কথা হয়েছে; কিন্তু বিনিয়োগকারীরা আর কথায় সন্তুষ্ট থাকতে চায় না, তারা একটা ভালো ফল চায়।

আলোচ্য বিষয়গুলোর পাশাপাশি সুদের হারের বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে আনা উচিত। আমি বরাবরই সুদের হার কমের পক্ষে। আমাদের পলিসি রেটটি আরও ৫০ পয়সা কমানো উচিত ছিল। কিন্তু এটা করা হয়নি। সামনে হয়তো কমানো হবে। সরকার বিভিন্ন কোম্পানিকে শর্তসাপেক্ষে ২০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার কিছু প্রণোদনা দিচ্ছে। কুঋণ বা শ্রেণিবিন্যাসকৃত ঋণ থেকে মুক্তির জন্যই এ ব্যবস্থা। কিন্তু সেটা কাজে দিচ্ছে না। কিছুদিন আগেই রিপোর্ট এসেছে, ২০০-৬০০ কোটি টাকা প্রণোদনার পরও সামান্যই ইমপ্লিমেন্ট করা গেছে। সেটারও কোনো ডিমান্ড হচ্ছে না। যারা অতীতে ঋণ করেছে, তারা কেউ টাকা ফেরত দিতে চাচ্ছে না। আবার অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তারা প্রকৃত অর্থে টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আসলে এখন নতুন করে শুরু করতে হবে। যদি সুদের হার কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে নতুন করে অনেকে এগিয়ে আসবে। যারা আগে খেলাপি ঋণের মধ্যে আবদ্ধ হয়নি, তারা এগিয়ে আসবে। সুতরাং শেয়ারবাজারের সঙ্গে সুদের হারের একটা সম্পর্ক আছে।

১০/১৫ বছর আগে থেকেই শেয়ারবাজার সংকুচিত হয়ে আছে। বিমা কোম্পানির ৬০-৭০ শতাংশের কোনো কাজ নেই। তারা শেয়ারবাজারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। সুতরাং শেয়ারবাজারে এগুলো থাকা-না-থাকারই সমান। বেশির ভাগ বিমা কোম্পানিকে কেউ বিশ্বাস করে না। তাই বিমা কোম্পানিতে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। দ্বিতীয়ত, দেশে ব্যাংকব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দেউলিয়া হয়ে যাওয়া পাঁচটি ব্যাংকের গ্রাহকের টাকাপয়সা সরকারকেই দিতে হচ্ছে। সামনে পদ্মা ব্যাংক নিয়ে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয় জানি না। তবে যেসব ব্যাংক চলবে না, সেগুলোকে জোর করে চালানো উচিত হবে না। যা হোক, এত হতাশার মাঝেও আমাদের জন্য শুভ সংবাদ হচ্ছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ একটু বেড়েছে। রপ্তানি অত বাড়েনি। এটি ৬-৭ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া আর কোনো ভালো সংবাদ এ মুহূর্তে দেখছি না।

প্রাইভেট সেক্টরের ক্রেডিট ডিমান্ড, মানে বিনিয়োগের জন্য অর্থের যে চাহিদা, সেটা ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে। সাড়ে ৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হারের জন্য মোট বিনিয়োগ ৩২ শতাংশ দরকার। এমনকি সাড়ে পাঁচের জন্যও ৩০ শতাংশ দরকার। কিন্তু সরকার মাত্র ১২-১৩ শতাংশ করতে পারছে। বাকিটা তো প্রাইভেট সেক্টর থেকে আসতে হবে। কিন্তু সেটা আসছে না। এর জন্য দরকার সুদের হার কমানো। তা না হলে বিনিয়োগে গতি আসবে না। কলকারখানার চাকাও ঘুরবে না। দেশে বেকার সমস্যা বাড়বে। মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়বে। অর্থনীতির দুর্গতির লাগাম টানা মুশকিল হয়ে যাবে।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি

অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত বিনিয়োগের খরা কাটানোর পদক্ষেপ জরুরি

বিনিয়োগের খরা কাটানোর পদক্ষেপ জরুরি

ক্রসফায়ারের দুঃস্বপ্ন আর যেন ফিরে না আসে

ক্রসফায়ারের দুঃস্বপ্ন আর যেন ফিরে না আসে

লুলার বিজয় লাতিন আমেরিকার জন্য টার্নিং পয়েন্ট

লুলার বিজয় লাতিন আমেরিকার জন্য টার্নিং পয়েন্ট

এমন সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ আগামীতেও অটুট থাকুক

এমন সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ আগামীতেও অটুট থাকুক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম