ক্রসফায়ারের দুঃস্বপ্ন আর যেন ফিরে না আসে
Advertisement
ড. এম. আকবর আলী
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্রসফায়ার নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই পুলিশের মূল লক্ষ্য। অপরাধ দমনে ক্রসফায়ার কোনো স্থায়ী, টেকসই কিংবা আইনসম্মত সমাধান নয়; বরং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে। অপরাধী যতই প্রভাবশালী বা বিপজ্জনক হোক, তাকে আইনের আওতায় এনে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করাই একটি পেশাদার পুলিশবাহিনীর দায়িত্ব।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) মো. আলী হোসেন ফকির আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কার্যকর ভূমিকা এবং দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। দেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জানমাল এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রয়োজনে পুলিশকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হয়। পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইন, সংবিধান ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা অপরিহার্য। অপরাধ দমনে কঠোরতা এবং আইনানুগতার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং আইন মেনে দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালনই একটি পেশাদার পুলিশবাহিনীর প্রকৃত পরিচয়।
আইজিপির বক্তব্যের একটি অংশ নিয়ে জনপরিসরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেক্ষেত্রে বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী ব্যাখ্যা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তার বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার পক্ষে ছিল বলে আমার মনে হয়নি। বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আইন প্রয়োগের কঠোরতার মাত্রা নির্ধারণে তিনি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করে সুযোগ সন্ধানীরা পুলিশের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করাসহ একটা বিভ্রান্তি তৈরির অপচেষ্টা করছে বলে আমার মনে হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিগত রাজনৈতিক সরকারের আমলে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে ভয়াবহতা আমরা দেখেছি, সেই দুঃস্বপ্ন আবার ফিরে আসুক, তা সাধারণ মানুষের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যই চায় না। কাজেই এটি না বোঝার কারণ নেই যে, পুলিশপ্রধান তার বক্তব্যে বিষয়টি নিশ্চিত করেই বলেছেন, ‘আইন এবং সংবিধান অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন। আপনার সুখে, শান্তিতে বসবাস করতে হলে পুলিশের কোনো বিকল্প নেই। যত বাহিনীই বলি, সেনাবাহিনী বলি, তারা দেশ রক্ষা করবে, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে। ইন্টারনাল শৃঙ্খলা, শান্তি, সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন-সবকিছুই আপনার-আমার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব।’ বর্তমান বাস্তবতায় তার পুরো বক্তব্যেই ছিল জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করার বিষয়।
পুলিশের কাজ অনেকটা রোগাক্রান্ত মানুষের শরীরে সার্জারি করার মতো। কাটাছেঁড়া হবে, খানিকটা রক্তও বের হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোগ সারিয়ে সুস্থ করে তুলবে। এখানে পুলিশপ্রধানের রূপক অর্থে ব্যবহৃত ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটিকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। আইজিপি আলী হোসেন ফকির তার বক্তব্যে বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করিনি। আমরা কোনো আনওয়ান্টেড ফোর্স অ্যাপ্লাই করি নাই।’
পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তিনি উল্লেখ করেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “কিন্তু আমাদেরও চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স আছে। আমাদের সদস্যরা কেউ অপরাধ করলে আমরা যদি ব্যবস্থা না নিই, তখন আপনি বলতে পারেন যে, ‘আপনারা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন নাই।’ আবার মিথ্যা অভিযোগ, গুজব এগুলোয় কান না দিয়ে আসলে প্রকৃতপক্ষে যে ঘটনা ঘটছে সমাজে, সেটার প্রতিকার করার জন্য আমরা সবাই মিলে কাজ করি।” তার বক্তব্যে গণমাধ্যম কর্মীদের কোনোভাবে দায়ী করা কিংবা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিপ্রায় ছিল বলে মনে হয়নি। অনিয়ম ও অপরাধের তথ্য অনুসন্ধান এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। বলার অপেক্ষা রাখে না, কোনো অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ ও গণমাধ্যম পরস্পরের প্রতিপক্ষ না হয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জনস্বার্থ রক্ষায় পরস্পর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
পুলিশের হাত আইন দিয়ে বাঁধা। আমার অনুরোধ, সব ক্ষেত্রেই পুলিশকে আমরা যেন ভিলেন না বানাই। পুলিশের কাজের প্রয়োজনীয় সমালোচনার পাশাপাশি তাদের পাশে দাঁড়ানোও আমাদের দায়িত্ব। পুলিশ যদি আইনগত দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্রে নিরাপত্তা বলতে কিছু থাকবে না। কাজেই, পুলিশকে প্রতিপক্ষ না ভেবে তাদের কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। তা না হলে ভোগান্তির শিকার হতে হবে সবাইকেই।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের আইনগত সুরক্ষা, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করেছে। ফলে সরকারের অনুমতি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আÍরক্ষাসহ আইনসম্মত পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক বলপ্রয়োগের সুযোগ থাকলেও তা কখনোই বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না। অতীতে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে বহু সন্তান পিতৃহারা হয়েছে, বহু পিতা হয়েছে সন্তানহারা, ভাই ভাইকে হারিয়েছে। সেই ক্রসফায়ারের দুঃস্বপ্ন আর কখনোই যেন ফিরে না আসে বাংলাদেশের জনগণের জীবনে। ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি নয়, বরং অপরাধী শনাক্তকরণ, দক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
ড. এম. আকবর আলী : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি
