এমন সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ আগামীতেও অটুট থাকুক
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
Advertisement
অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ ও কল্যাণ কামনা এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরন্তর শান্তি ও সম্প্রীতির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ২১ অক্টোবর দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা সম্পন্ন হয়েছে। এবারের দুর্গাপূজা নানা কারণেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে যেভাবে আনন্দময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা সম্পন্ন হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সাধারণত দেখা যায়, প্রতিবারই দুর্গাপূজার সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর এবং নানাভাবে পূজার অনুষ্ঠানকে পণ্ড করার চেষ্টা করা হয়, ভীতি ছড়ানো হয়। এবার এর কিছুই হয়নি। সরকার যথাসময়ে পূর্বসতর্কতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করায় নির্বিঘ্নে পূজা সম্পন্ন হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা দুর্গাপূজার সময় অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের কর্তব্য পালন করেছেন। তাদের মধ্যে কোনো বাড়াবাড়ি লক্ষ করা যায়নি।
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব আয়োজন কেমন ছিল, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্য থেকে তা অনুধাবন করা যায়। তিনি বলেছেন, ‘অত্যন্ত আনন্দমুখর, আনন্দঘন ও বর্ণিল পরিবেশে বাংলাদেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। আমি বাংলাদেশের এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে দুদেশের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও মেলবন্ধন দেখতে পেয়েছি।’ পূজামণ্ডপে উপস্থিত হয়ে তিনি বলেন, আমি এখানে রাষ্ট্রদূত হিসাবে আসিনি, এসেছি পরিবারের সদস্য হিসাবে আনন্দ ভাগাভাগি করতে।’ দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া ব্যবস্থায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
দুর্গাপূজা যাতে নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে সে বিষয়ে দৃষ্টি রেখেছেন। অতীতে দেশের সরকারপ্রধান রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন অথবা বনানীতে গিয়ে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে পুণ্যার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন; কিন্তু সেই ধারার ব্যত্যয় ঘটিয়ে এবারই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ঢাকার বাইরে তিনটি জেলা শহরে গিয়ে উপস্থিত হয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে দুর্গোৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন। রাজধানী থেকে বহুদূরে রংপুর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে গিয়ে তিনি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। রাজধানীর বাইরে গিয়ে জেলা শহরে পূজামণ্ডপে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিনিময় সাধারণ কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা; এবং রাষ্ট্রীয় মনস্তত্ত্বে বড় এক পরিবর্তনের বার্তা। এতে প্রান্তিক বা মফস্বলের নাগরিকরাও অনুধাবন করতে পেরেছেন, রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে। ভোটব্যাংকের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সবার প্রতি সমআচরণের এ সংস্কৃতি নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকেই নির্দেশ করে। মফস্বলের পুণ্যার্থীরা তাদের মাঝে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে যারপরনাই বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছেন। পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তাদের পূজার আনন্দ অনেকটাই বেড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিষয়টি বেশ উপভোগ করেছেন।
‘সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ সবার’-এ কথাটি শুধু প্রবচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের পদক্ষেপগুলো আলোচনার দাবি রাখে। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে আর্থিক অনুদানের পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকা বাড়িয়েছে। এতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসব পালনে অনেকটাই সুবিধা হয়। এছাড়া মণ্ডপপ্রতি বরাদ্দকৃত চালের পরিমাণ ৬০০ কেজি করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং আওয়ামী লীগ আমলে মণ্ডপপ্রতি চাল বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৫০০ কেজি। পূজা উদ্যাপন পরিষদ অনেক দিন ধরেই পূজার ছুটি বাড়িয়ে দুই দিনের পরিবর্তে তিন দিন করার দাবি জানিয়ে আসছিল। এবারই প্রথম দুর্গাপূজার ছুটি দুই দিনের পরিবর্তে তিন দিন করা হয়েছে। এর সঙ্গে দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি যোগ হওয়ায় মোট ছুটি দাঁড়িয়েছে পাঁচ দিন। এবারই প্রথম বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় শারদীয় দুর্গোৎসব পালনের জন্য কার্যত পাঁচ দিন ছুটি পেয়েছেন। এর ফলে সবাই আনন্দের সঙ্গে পূজার ছুটি উপভোগ করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেক পরিবার গ্রামে গিয়েছেন আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে পূজার ছুটি উপভোগ করার জন্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় ভালো থাকায় তাদের কোনো উদ্বেগ নিয়ে সময় কাটাতে হয়নি।
শারদীয় উৎসবের আনন্দ ও উপলব্ধি শুধু ঢাকের বাদ্য কিংবা প্রতিমা বিসর্জনের দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে একটি সমাজের সামগ্রিক আস্থার মধ্যে। সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু-এই কৃত্রিম বিভাজনের দেওয়াল ভেঙে ধর্মীয় আনন্দ উৎসবগুলো মানুষকে এককাতারে নিয়ে আসে। উল্লেখ্য, প্রতিটি ধর্মের আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শুধু আনন্দ লাভ করা নয়; ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলা এবং দৃঢ় করাই এর মূল লক্ষ্য। কোনো ধর্মই তার অনুসারীদের অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি বিরূপ আচরণ করতে শেখায় না; তবে কিছু মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধের অপব্যবহার করে বলেই বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টি হয়।
আমাদের দেশে একটি কথা বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, তা হলো, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। অর্থাৎ যে যেই ধর্ম অনুসরণ করুন না কেন, ধর্মীয় আনন্দ আয়োজনে সবাই অংশগ্রহণ করে। সব ধর্মের আনন্দ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজের সব মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলা। বাংলাদেশ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একটি উদার ও আধুনিক রাষ্ট্র। এ দেশের মানুষ স্মরণাতীত কাল থেকে প্রীতি ও আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দিন যাপন করছে। তবে মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে মহলবিশেষ ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করে থাকে। সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি নেই। মাঝেমধ্যে রাজনীতিক ও সমাজপতিরা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেয়। এদের ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব আমাদের শিখিয়েছে, মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকলে কীভাবে সব অনিয়ম-দুষ্কর্ম প্রতিরোধ করা যায়।
বাংলাদেশে স্মরণাতীতকাল থেকে বিভিন্ন ধর্ম-পেশার মানুষ পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করে আসছে। নতুন প্রজন্মের মাঝে এ চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে নিজের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর অটল থাকার পাশাপাশি অন্যের ধর্মমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক মানুষকে বুঝতে হবে, আমার যেমন নিজ ধর্মচর্চার অধিকার আছে, তেমনি অন্য ধর্মের অনুসারীরও তার নিজ ধর্মচর্চা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। আমি সব ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করব; কিন্তু তাতে অন্য ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার যেন খর্ব না হয়। স্বাধীনতার অর্থ স্বেচ্ছাচারিতা নয়, স্বাধীনতার অর্থ দায়িত্বশীলতা। আমাদের এমনভাবে স্বাধীনতা ভোগ করতে হবে, যাতে এর দ্বারা অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
একে অপরের সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা জানানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় নেতাদের তৎপরতা শুধু উপাসনালয়ে সীমিত না রেখে সামাজিক সম্প্রীতি গড়ার ক্ষেত্রে বিস্তৃত করতে হবে। তাদের নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের আত্মীক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের নিয়ে এলাকাভিত্তিক সামাজিক সম্প্রীতি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এ কমিটির উদ্দেশ্য হবে কোনো এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার উপক্রম হলে তাৎক্ষণিকভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তা নিরসন করা। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে; যাতে কেউ গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত হতে না পারে।
এবারের দুর্গোৎসব ঘিরে যে আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তার মূল কারণ হচ্ছে, অন্য ধর্মের অনুসারীরা মনেপ্রাণে কামনা করেছিল, দুর্গোৎসব যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এ নিরপেক্ষ ধর্মীয় চেতনাবোধ আমাদের রাজনৈতিক জীবনেও অনুসরণ করতে হবে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর এক নদী রক্তের বিনিময়ে চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছে। এ যাত্রাপথ মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। আগামীর বাংলাদেশকে সঠিক ও অসাম্প্রদায়িকভাবে পরিচালিত করতে হলে সবার মধ্যে অসাম্প্রদায়িক মনোভাব জাগ্রত করতে হবে। এ মুহূর্তে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজন। এজন্য সরকার এবং সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দলগুলো যখন কোনো ইস্যুতে সরকারের বিরোধিতা করবে, তখন তা কোনো অজুহাতেই উপেক্ষা করা ঠিক হবে না; বরং আলোচনার টেবিলে বসে সম্প্রীতিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাতে হবে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা নেই, যা আলোচনার টেবিলে সৌহার্দপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায় না। বাংলাদেশ যে নতুন বন্দোবস্তের দিকে এগিয়ে চলেছে, তা সফল করতে হলে সবাইকে একতাবদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যেতে হবে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়-এই চূড়ান্ত বিষয়টি আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে।
সবশেষে বলব, এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব যেভাবে আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে, তা অনুসরণ করে জাতীয় জীবনেও ঐক্য ও সংহতি গড়ে তুলতে হবে। বাঙালি জাতি যখনই একতাবদ্ধ হয়েছে, তখন বিশ্বের কোনো শক্তিই তাদের পরাস্ত করতে পারেনি। যখনই জাতি বিভক্ত হয়েছে, তখনই অপশক্তি পেছন থেকে এসে আমাদের ললাটে পরাজয়ের কলঙ্ক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। আমরা আর ভুল করতে চাই না। আমাদের সব চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে জাতীয় স্বার্থকে।
এবারের দুর্গোৎসব যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে, আমি কামনা করি, এ সুন্দর ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ আগামীতেও অব্যাহত থাকুক। ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে এ সম্প্রীতির বন্ধন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : প্রফেসর ইমেরিটাস; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত
