Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

Advertisement

Icon

মহিউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

বাংলার আকাশে কার্তিকের চাঁদ উঠেছে। তার আলো নদীর জলে পড়েছে, যেন কোনো বিধবার সাদা শাড়ির আঁচল ভেসে যাচ্ছে। কাশবনের মাথায় বাতাস এসে দাঁড়িয়েছে পথহারা বাউলের মতো; নদীর নিথর জলরাশি আকাশের ভাঙা আয়না হয়ে শুয়ে আছে। পৃথিবীকে দেখে মনে হয়, প্রকৃতি যেন এক ধ্যানমগ্ন ঋষি, আর মানুষ তার অস্থির শিষ্য।

এ দেশের মাটিতে ধান জন্মায়, শাপলা ফোটে, শিশির নামে; কিন্তু মানুষের ইতিহাসে প্রায়ই জন্ম নেয় আরেক ফসল, যার নাম ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা কখনো গ্রীষ্মের নদীর মতো শান্ত নয়; বরং বর্ষার পাহাড়ি ঢলের মতো, যা নিজের পথের গাছ, ঘর, স্বপ্ন ও নৈতিকতাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে জানে।

সম্প্রতি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, সমাজের নিকৃষ্ট ব্যক্তিরাই অনেক সময় সংসদ-সদস্য ও মন্ত্রী হন, আর ভালো মানুষের জন্য রাজনীতির দুয়ার সংকুচিত হতে থাকে। কথাটি শুনে মনে হলো, যেন বহুদিন ধরে শুকিয়ে যাওয়া কোনো নদীর তলদেশ হঠাৎ ফেটে উঠে তার লুকানো শিলালিপি প্রকাশ করেছে।

এ জনপদের ইতিহাসের ভেতরেও এমন এক গোপন নদী বয়ে চলে। উপরে আমরা দেখি স্লোগান, পতাকা, মঞ্চ, মাইক্রোফোন, করতালি। আর নিচে, মাটির অনেক গভীরে, বয়ে যায় নীরব মানুষের দীর্ঘশ্বাস। সেই দীর্ঘশ্বাসের রং ধূসর। সেই দীর্ঘশ্বাসের গন্ধ ভেজা ধানের খড়ের মতো। সেই দীর্ঘশ্বাস সন্ধ্যার শেষে একা ঘরে ফেরা কৃষকের চোখের মতো ক্লান্ত।

অনেক সময় মনে হয়, বাংলাদেশের রাজনীতি একটি বিশাল বটগাছ। তার শাখা-প্রশাখা আকাশ ছুঁয়েছে, তার চারপাশে মানুষের ভিড়; কিন্তু শিকড়ের নিচে জমে আছে বহু বছরের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলা, অবহেলার মৃত পাতা। সেই বৃক্ষের ছায়ায় সাধারণ মানুষ বিশ্রাম নিতে আসে, কিন্তু ফল খায় অন্য কেউ।

যে কৃষক ভোরে মাঠে যায়, সে যেন সূর্যের অনুবাদক; সে মাটির ভাষা পড়তে পারে। যে জেলে মাঝরাতে নদীতে জাল ফেলে, সে জলরাশির হৃদস্পন্দন শুনতে পারে। যে শিক্ষক একটি গ্রামীণ বিদ্যালয়ে অক্ষরের প্রদীপ জ্বালান, তিনি ভবিষ্যতের স্থপতি। অথচ এ দেশের ক্ষমতার সিঁড়িতে তাদের পদচিহ্ন খুব কম দেখা যায়।

সেখানে প্রায়ই দেখা যায় অন্য এক জাতের মানুষকে। তারা ঋতুর মতো বদলাতে জানে। কুয়াশার মতো ছদ্মবেশ নিতে জানে। গিরগিটির চামড়ার মতো রং পালটাতে জানে। তারা মানুষের আবেগকে নৌকার দাঁড়ের মতো ব্যবহার করে, কিন্তু কখনো সেই নদীর গভীরতা অনুভব করে না।

রাজনীতির ইতিহাস অনেক সময় আমাকে শুষ্ক নদীর খাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। একদিন সেখানে প্রবল স্রোত ছিল, মাছ ছিল, নৌকা ছিল, গান ছিল। তারপর ধীরে ধীরে পলি জমেছে। লোভের পলি। দম্ভের পলি। স্বার্থের পলি।

একসময় নদী আর নদী থাকে না, মানচিত্রের ওপর শুধু তার নামটুকু বেঁচে থাকে। রাষ্ট্রও কখনো কখনো তেমন হয়ে যায়। আদর্শ তখন শুধু ভাষণে বেঁচে থাকে। সততা শুধু স্মৃতিস্তম্ভে বেঁচে থাকে। ত্যাগ শুধু জাতীয় দিবসের ফুলেল মালায় বেঁচে থাকে। আর বাস্তব জীবনের সংসদ ও মন্ত্রণালয়ে হাঁটে সুযোগের ব্যবসায়ীরা। তারা আসে মৌসুমি পাখির মতো, আবার উড়েও যায়; কিন্তু মানুষের দুঃখ থেকে যায়। নদীর জল যেমন বর্ষার স্মৃতি বহন করে, তেমনি মানুষের হৃদয়ও বহন করে অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস।

আমি কখনো কখনো কল্পনা করি, গভীর রাতে জাতীয় সংসদ ভবনের ওপর নেমে এসেছে চাঁদের আলো। লুই কানের স্থাপত্য তখন বিশাল কোনো নিঃসঙ্গ জাহাজের মতো অন্ধকার সমুদ্রে ভাসছে। চারদিকে নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যে ভাষা শহীদরা এসে দাঁড়ান। মুক্তিযুদ্ধের অচেনা কিশোররা এসে দাঁড়ায়। নামহীন কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, শিক্ষক, নার্স, জেলে এসে দাঁড়ায়। তারা কেউ মাইক্রোফোন চায় না। কোনো মন্ত্রিত্ব চায় না। কোনো প্রটোকল চায় না। তারা শুধু জানতে চায়: এই দেশ কি তাদেরও? সংসদের আলো কি কখনো তাদের উঠানে পৌঁছাবে? ক্ষমতার বৃক্ষ কি কোনোদিন তার ছায়া তাদের ক্লান্ত কপালের ওপরও মেলে ধরবে? এ প্রশ্নের উত্তর এখনো বাতাসে ভাসে।

হেমন্তের কুয়াশার মতো। অর্ধেক দৃশ্যমান, অর্ধেক অদৃশ্য। তবু আশার মৃত্যু হয় না। কারণ আশা বাংলার নদীর মতো। তাকে বাঁধা যায়, কিন্তু শেষ করা যায় না। সে পথ বদলায়, বাঁক নেয়, পলি জমায়, ভাঙন আনে; তবুও সে সমুদ্রের দিকেই যায়।

আজ যে তরুণ ভাঙা চায়ের দোকানে বসে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে, যে মেয়েটি দূর গ্রামের স্কুলে বই বুকে নিয়ে হাঁটে, যে ছেলে ভাঙা ছাদের নিচে নড়বড়ে বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করে একটি ভালো রাষ্ট্র কল্পনা করে, তাদের চোখেই হয়তো আগামী দিনের নতুন ভোর জমা হচ্ছে।

হয়তো একদিন এ দেশের রাজনীতি শরতের আকাশের মতো স্বচ্ছ হবে। হয়তো একদিন সংসদ হবে নদীর মতো, যেখানে সব স্রোতের জন্য জায়গা থাকবে। হয়তো একদিন ক্ষমতা হবে গাছের ছায়ার মতো, যা নিজের জন্য নয়, অন্যকে রক্ষা করার জন্য বেঁচে থাকে। সেদিন নদীর ঢেউ আরেক রকম শব্দ করবে। ধানখেতের ওপর বাতাস অন্যরকম গন্ধ বয়ে আনবে। শালিকরা সন্ধ্যায় ফিরে যাবে আরও নির্ভার ডানায়। আর বাংলা, বহু ধূসর শরৎ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক গোধূলি পেরিয়ে, নিজের মুখটি দেখতে পাবে পরিষ্কার জলের আয়নায়; যেমন কোনো হারানো নক্ষত্র বহু শতাব্দী পরে আবার ফিরে পায় তার আকাশ।

বিশ্বাস করি, সব অন্ধকারই চিরস্থায়ী নয়। যেমন হাজার বছরের কুয়াশাও একদিন সূর্যের কাছে পরাজিত হয়, তেমনি ইতিহাসের বুকেও কোনো না কোনো ভোর অপেক্ষা করে। হয়তো আজ যে শিশুটি নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে শঙ্খচিলের উড়ে যাওয়া দেখে, যে তরুণ মাটির ঘ্রাণ মেখে একটি ন্যায়ভিত্তিক দেশের স্বপ্ন দেখে, যে কৃষক খরার মাঠে বীজ বুনেও আকাশের প্রতি বিশ্বাস হারায় না, আগামী দিনের আলোকরেখা তাদেরই চোখে জমা হচ্ছে।

সেদিন ক্ষমতা আর শিকারের জন্য ওতপেতে থাকা কোনো বনপথ হবে না; হবে নদীর মতো, যা নিজের জন্য কিছু রাখে না, কেবল দুই তীরকে জীবন দেয়। সংসদ ভবনের গম্বুজে তখন আর কেবল বৈদ্যুতিক আলো জ্বলবে না; সেখানে জ্বলবে মানুষের বিশ্বাসের দীপশিখা। কুশিয়ারার জল, পদ্মার ঢেউ, মেঘনার গভীর স্রোত তখন বহন করবে না দীর্ঘশ্বাসের লবণাক্ত ভার; বহন করবে এক নতুন সময়ের প্রতিধ্বনি। বাংলার আকাশে উড়ে যাওয়া শঙ্খচিল তখন আর কোনো ধূসর গোধূলির সাক্ষী হবে না; সে দেখবে মানুষের কাছে ফিরে আসা এক দেশের পুনর্জন্ম।

আর সেই ভোরে, যখন নদীর জলে সূর্যের প্রথম আগুন কেঁপে উঠবে, তখন মনে হবে এ দেশ অবশেষে ক্ষমতার নয়, মানুষের কাছে ফিরে এসেছে; যেমন দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ক্লান্ত একটি নদী ফিরে পায় তার সমুদ্র। মনে হবে, বহু ঝড়, ভাঙন, বিভ্রম ও লোভের অন্ধ স্রোতে দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ানো রাষ্ট্র নামের প্রাচীন জাহাজটি অবশেষে তার আসল নক্ষত্রমালা খুঁজে পেয়েছে। আর সেই নক্ষত্রগুলো আকাশে নয়, জ্বলছে মানুষের চোখে; কৃষকের ঘামে, শ্রমিকের হাতের কড়ায়, মায়ের প্রার্থনায়, তরুণের স্বপ্নে। তখন ইতিহাস আর ক্ষমতার প্রাসাদে লেখা হবে না; লেখা হবে বাংলার বাতাসে, নদীর জলে, ধানের শীষে, যেখানে মানুষের নামই হবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে পবিত্র সংবিধান।

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের

প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

হালফিল বয়ান পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম