Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

ড. মাহফুজ পারভেজ

আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলের থানচি হামলা ছিল ২-৩ এপ্রিল সংঘটিত ব্যাংক লুট, অস্ত্র ছিনতাই ও সংশ্লিষ্ট হামলার ধারাবাহিকতার অংশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাগুলোর সঙ্গে পাহাড়ি সংগঠন কেএনএফের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছিল তখন। ২০২৬ সালের অক্টোবরে সাজেকে গোলাগুলির ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা-ভঙ্গুরতার ধারাবাহিক সংকেত দিচ্ছে। এ ঘটনায় দায়ী করা হচ্ছে আরেক পাহাড়ি দল ইউপিডিএফ সংগঠনকে। ফলে পাহাড়ের নাজুক নিরাপত্তা সংকটকে নিছকই দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসাবে খণ্ডিত অবয়বে দেখার সুযোগ নেই। থানচির দুই বছর পর সাজেকের ঘটনাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা সংকটকে আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান করেছে। অবরোধের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ সময় উজোবাজার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির খবর পাওয়া যায়। ঘটনাগুলোর তাৎপর্য কেবল পর্যটন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো দেখাচ্ছে, পাহাড়ে নিরাপত্তা, শাসন, উন্নয়ন, জাতিগত সম্পর্ক, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন পরস্পর থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না, যা জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় এনে যথোপযুক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রশমন করা জরুরি।

Advertisement

Icon

পার্বত্য চট্টগ্রামের থানচি ও সাজেকের সশস্ত্র হামলার ঘটনাগুলো সেখানকার নিরাপত্তা অবকাঠামোর নানাবিধ দুর্বলতা তুলে ধরেছে। ব্যাংক, থানা বা সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ কেবল অর্থ বা অস্ত্র লুটের ঘটনা নয়, সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের আস্থার ওপর আঘাত এবং প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ জানানোর শামিল। এর ফলে তিনটি ঝুঁকি তৈরি হয় : এক. সাধারণ নাগরিক ও পর্যটকদের সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি। দুই. স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পের ক্ষতি। তিন. পাহাড়ের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

সশস্ত্র আক্রমণের মধ্যেই পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া তাৎক্ষণিক সাফল্য হলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন হলো-কেন এত মানুষ এমন একটি এলাকায় প্রবেশ করলেন, যেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত আগাম সতর্কতা ছিল না? কেন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন ব্যবসায়ী ও নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় আগে থেকে দৃশ্যমান ছিল না? এসব দুর্বলতা দূর করা দরকার। একইসঙ্গে এসব ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান নিরাপত্তা সংকটকে তিনটি স্তরে দেখা দরকার। প্রথমত, সশস্ত্র সক্ষমতার বিস্তার। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যদি ব্যাংক, থানা, নিরাপত্তা চৌকি বা সড়কপথে আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়, তাহলে তাদের সংগঠন, অস্ত্র, অর্থায়ন, চলাচল ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শুধু অভিযান চালালেই হবে না। জানতে হবে : অস্ত্র কোথা থেকে আসছে? অর্থায়নের উৎস কী? সীমান্তপথে চলাচল কীভাবে হচ্ছে? স্থানীয় সহযোগী নেটওয়ার্ক আছে কিনা? সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কারা তথ্য সরবরাহ করছে? পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি কীভাবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ব্যবহার করছে? দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক আস্থার সংকট। পাহাড়ে নিরাপত্তা সমস্যা কেবল বন্দুক দিয়ে তৈরি হয় না; রাজনৈতিক উসকানি, নানামুখী বিরোধ, পরিচয়গত অনিরাপত্তা, উন্নয়নের অসমতা এবং প্রশাসনের প্রতি অবিশ্বাসও সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করে। সব পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নয়-এ মৌলিক সত্য মেনে নিয়েও স্বীকার করতে হবে, নানা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সশস্ত্র-সন্ত্রাসীরা লুক্কায়িত রয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে চিহ্নিত ও নির্মূল করা জরুরি। এ কাজে কারবারি, হেডম্যান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি, তরুণ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতা এবং নাগরিক সমাজকে বৃহত্তর নিরাপত্তা আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করাও অপরিহার্য। তৃতীয়ত, সীমান্ত ও আঞ্চলিক মাত্রা। বান্দরবান ও পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ সীমান্তসংলগ্ন। সীমান্তের ওপারে সংঘাত, সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, মানব পাচার ও অনিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ স্থানীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।

সীমান্ত নিরাপত্তাকে শুধু প্রহরা ও চৌকি দিয়ে দেখা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন: সীমান্ত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়। বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত কমান্ড। সীমান্তবর্তী জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ। বৈধ বাণিজ্য ও যোগাযোগের সুযোগ। অবৈধ অর্থপ্রবাহ ও অস্ত্রপথ শনাক্তকরণ। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ। তাছাড়া, সীমান্ত অঞ্চলের জনগণকে নিরাপত্তার অংশীদার না করে সমস্যার মূলে আঘাত হানা অসম্ভব। ইতোমধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর যৌথ অভিযান পরিচালনার কথা জানা গেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনসম্মত অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। সশস্ত্র হামলা, ব্যাংক লুট, অপহরণ, অস্ত্র ছিনতাই, সাধারণ মানুষকে জিম্মিকরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে, পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। যেমন-সশস্ত্র হামলা ও অপরাধের বিরুদ্ধে লক্ষ্যনির্দিষ্ট অভিযান। নিরপরাধ নাগরিকের সুরক্ষা ও মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ। আটক ও অভিযানের আইনি প্রক্রিয়ার চলমানতা। সিভিল সোসাইটি ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিরাপত্তা সংলাপ। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়। মূল কথা হলো, আইনসম্মত, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহির কার্যক্রমই দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম।

থানচি ও সাজেকের তিক্ত ও নিরাপত্তা হানিকর অভিজ্ঞতার পটভূমিতে কালবিলম্ব না করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় জাতীয় মনিটরিং সেল এবং স্থানীয়ভাবে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, পর্যটন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি রিয়েল-টাইম নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় সংস্থা এবং সিভিল সোসাইটি ও বুদ্ধিজীবীদের অতিদ্রুত কাজে লাগাতে হবে। কারণ, পাহাড়ের নিরাপত্তা সবার জন্যই দরকার এবং সম্মিলিতভাবে তা সুনিশ্চিত করাও সবার দায়িত্ব।

সামরিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন ও তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। স্থানীয় জনগণ যদি মনে করে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী এবং তাদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে অধিকতর কার্যকর, তাহলে বড় আকারের আস্থার সংকট তৈরি হবে। তাই প্রয়োজন স্থানীয় নিরাপত্তা অংশীদারত্বের কাঠামো সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে আস্থার সঞ্চার করা। এর মধ্যে থাকতে পারে : ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিরাপত্তা সংলাপ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঐতিহ্যবাহী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক। নারীদের জন্য পৃথক নিরাপত্তা ও অভিযোগ চ্যানেল। তরুণদের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান কর্মসূচি। গুজব ও সন্ত্রাসীদের প্রচারণা প্রতিরোধে স্থানীয় তথ্যকেন্দ্র। নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত। উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ। সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও জবরদস্তি বন্ধকরণ।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০২৪ সালের থানচির হামলা ও ২০২৬ সালের সাজেকের গোলাগুলির ঘটনা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বাড়-বাড়ন্তের চাক্ষুষ দৃষ্টান্ত এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা। এগুলো দেখিয়েছে, পাহাড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা একদিকে সশস্ত্র চ্যালেঞ্জের মুখে, অন্যদিকে রাজনৈতিক আস্থা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার পরীক্ষার মুখে। সন্ত্রাসীরা অস্ত্র হাতে দলবদ্ধ হয়ে নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ করলে এবং নিরাপত্তা রক্ষায় প্রশাসনকে পরীক্ষার মুখে ফেলে দিলে জনগণের মধ্যে চরম ভীতি ও আস্থাহীনতার সৃষ্টি হতে পারে। ফলে প্রশাসনের প্রথম দায়িত্ব হলো, নাগরিকের আস্থা রক্ষা করে তাদের জীবন, সম্পদ ও চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সশস্ত্র হামলা, অপহরণ, ব্যাংক লুট ও সরকারি স্থাপনায় আক্রমণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী চিহ্নিত ও শনাক্ত ব্যক্তি বা দলের প্রতি কোনোরূপ দুর্বলতা ও শৈথিল্য প্রদর্শন না করা। কারণ, রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা হলো সবার ওপরে অবস্থিত জাতীয় দায়িত্ব, তা যে কোনো মূল্যে নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্টদের সাংবিধানিক কর্তব্য।

সামগ্রিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অভিযান, চেকপোস্ট বা নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্থানীয় আস্থা, কার্যকর গোয়েন্দা সমন্বয়, জনঅংশগ্রহণ এবং দায়িত্বশীল প্রশাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা। স্থানীয় জনগণ যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিজেদের সুরক্ষার অংশ হিসাবে গ্রহণ না করে, যদি তারা প্রশাসনের ওপর আস্থা না রাখে এবং তথ্য দেওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে, তাহলে কোনো গোয়েন্দা কাঠামোই পূর্ণ কার্যকারিতা অর্জন করতে পারবে না। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত নিরাপত্তা সংলাপ গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ও দ্রুত ব্যবস্থা না থাকলে বিচ্ছিন্ন গোয়েন্দা তথ্য বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপ নেবে না। দায়িত্বশীল প্রশাসনের অর্থ শুধু সংকটের সময় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা নয়; বরং সংকটের আগে ঝুঁকি শনাক্ত করা, পর্যটক ও স্থানীয় জনগণকে সময়মতো সতর্ক করা, গুজব প্রতিরোধ করা, নিরাপত্তা অভিযানে মানবাধিকার রক্ষা করা এবং ঘটনার পর স্বচ্ছভাবে জনগণকে তথ্য জানানো।

পাহাড়ে নিরাপত্তা সংকটের সমাধান হবে তখনই, যখন রাষ্ট্র একইসঙ্গে দৃঢ় ও সংবেদনশীল হতে পারবে-সশস্ত্র অপরাধ, অস্ত্র পাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও সরকারি স্থাপনায় হামলার বিরুদ্ধে দৃঢ়; কিন্তু সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবনযাত্রার বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল। পাহাড়ে শান্তি আসবে তখনই, যখন মানুষ রাষ্ট্রকে ভয় পাওয়ার বদলে বিশ্বাস করতে পারবে, যখন প্রশাসন জনগণের কথা শুনবে এবং যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। আস্থা, ন্যায়, জনঅংশগ্রহণ, কার্যকর গোয়েন্দা সমন্বয় ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের এ সমন্বয়ই পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও টেকসই শান্তির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।

প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

ড. সুকোমল বড়ুয়া

বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আজ। প্রবারণা বৌদ্ধধর্মীয় বিধানে বিনয়ভিত্তিক একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্রতকর্ম ও অনুষ্ঠান। এর অপর নাম আশ্বিনী পূর্ণিমা। প্রবারণার এ আবেদন বৌদ্ধ ভিক্ষুজীবনে অধিক গুরুত্ব পেলেও বৌদ্ধ নর-নারী, উপাসক-উপাসিকাদের জীবনেও এর গুরুত্ব কম নয়। শুধু ধ্যানের দিক থেকে নয়, আত্মশুদ্ধিতা, রিপু সংযম এবং আত্মোপলব্ধিতে এর অর্থবহ দিক আমাদের পূর্ণ মনুষ্যত্ব বিকাশে অনেক অবদান রাখে। তাই বিশ্বের সব বৌদ্ধ আজ এই শুভ তিথিটি যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপন করবে।

প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসবে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান তো আছেই, এর সঙ্গে আছে আমাদের আত্মশাসন ও আত্মবোধের মূল শিক্ষা। এ যেন এক জীবনবোধ তৈরির সর্বোত্তম শিক্ষা। কারণ, শাস্ত্রে প্রবারণার অর্থ বলা হয়েছে, প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা এবং নিষেধ করা। বরণ করা অর্থ বিশুদ্ধ বিনয়াচারে জীবনকে পরিচালিত করার উত্তম আদর্শ গ্রহণ করা। আর নিষেধ করা অর্থ আদর্শবান ও ধর্মাচারের পরিপন্থি কর্মগুলো থেকে বিরত থাকা অথবা ওইসব কর্ম পরিহার করা। অতএব, অর্থের দিক থেকে প্রবারণার গুরুত্ব ও মর্যাদা অতীব মহান ও তাৎপর্যমণ্ডিত। তাই বৌদ্ধ প্রবারণা উদযাপনে বলা হয়, পাপ ও অশুভ কর্ম থেকে মুক্ত থাকার জন্যই সৎ এই ব্রতকর্মের সাধনা। সুন্দর জীবন গঠনের ক্ষেত্রে এবং সত্যনিষ্ঠ ধ্যান সমাধির ক্ষেত্রে এর কোনো বিকল্প নেই।

অন্যদিকে ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস সমাপনান্তে ভিক্ষুসংঘ আপন আপন দোষত্রুটি স্বীকারপূর্বক অপর ভিক্ষুসংঘের কাছে প্রকাশ করে এবং তার প্রায়শ্চিত্ত বিধানের আহ্বান জানায়। অর্থাৎ, ভিক্ষুরা জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাতসারে যে কোনো অপরাধ করে থাকলে সেই অপরাধ স্বীকারপূর্বক প্রবারণা দিবসে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। কারণ, দৈনন্দিন জীবনাচারে চিত্ত নানারকম অকুশলে আবিষ্ট হয়। তাই প্রতিটি মুহূর্তে চিত্ত জাগ্রত রেখে গুণের প্রতি আকৃষ্ট থাকার জন্যই এ প্রবারণার প্রবর্তন করা হয়। বুদ্ধের জীবদ্দশায় শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে অবস্থানকালে তিনি ভিক্ষুসংঘের পালনীয় কর্তব্য হিসাবে এ প্রবারণার প্রবর্তন করেন। বৌদ্ধধর্ম মতে, ভিক্ষু-শ্রমণ ও উপাসক-উপাসিকারা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা-এই তিন মাস শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা সাধনার অধিষ্ঠান গ্রহণ করেন। এ তিন মাসে অষ্টমী, অমাবস্যা, পূর্ণিমা এবং ধ্যান, উপবাস ও সংযম শিক্ষার মধ্য দিয়ে তারা তাদের ব্রত অধিষ্ঠান সমাপন করেন। তাই ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস ব্রত অধিষ্ঠানের শেষ দিবসটিকেই বলা হয় বৌদ্ধ আভিধানিক শব্দে ‘প্রবারণা’। এটিকে বৌদ্ধ পরিভাষায় আশার তৃপ্তি বা অভিলাষ পূরণও বলা হয়।

প্রবারণা দিবসে বৌদ্ধরা সব ভেদাভেদ ভুলে পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পারস্পরিক ঐক্য, মৈত্রী, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের ভাব নিয়ে একে অপরের সঙ্গে আলিঙ্গন করেন। হৃদয়কে অনেক বড় করে চিত্তকে বিলিয়ে দেন। এর মাধ্যমে মনের মলিনতা দূর হয়, ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত হয়। এতে চিত্তের সংকীর্ণতাও দূরীভূত হয়। বৌদ্ধরা সব মানুষের, বিশ্বের সব জীবের অখণ্ড সুখ, অখণ্ড কল্যাণ এবং সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করেন।

প্রবারণার দিন বৌদ্ধরা পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করেন, পূজা দেন এবং ধর্ম শ্রবণ করেন। দানের জন্য বিহারে কল্পতরু তৈরি করা হয়। সেদিনের এ কল্পতরু হয় ধর্মীয় আবেশের একটি বিশেষ আকর্ষণ। আবালবৃদ্ধবনিতা-সবাই তাদের সামর্থ্যানুযায়ী এ কল্পতরু বৃক্ষে নানা ধরনের দানীয় সামগ্রী বেঁধে দেন। এ কল্পতরু হচ্ছে জন্মচক্রের গতিধারায় উচ্চদিকে যাওয়ার চিত্তের একটি অবলম্বন। জীবের জীবনগতি যে বহু দীর্ঘ এবং বহু স্তরের মাধ্যমে এ জীবনচক্র অতিবাহিত বা প্রবাহিত হয়, তারই নিদর্শনস্বরূপ এ কল্পতরু। এটিকে কল্পবৃক্ষও বলা হয়।

প্রবারণা পূর্ণিমার আরেকটি উৎসবময় দিক হলো ফানুস উত্তোলন। বৌদ্ধশাস্ত্র মতে, বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর তার মাতৃদেবীকে ধর্মদেশনার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। সেখানে তিনি তিন মাস মাতৃদেবীকে ধর্মদেশনা করেন। প্রবারণা দিবসেই তিনি ওই স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণ করেন। এ কারণেই বৌদ্ধরা প্রবারণা পূর্ণিমা তিথিতে ওই প্রতীকীরূপে আকাশে প্রদীপ প্রজ্বালন করেন এবং ফানুস উত্তোলন করেন।

বৌদ্ধ ধর্ম হলো মূলত শীল-সমাধি-প্রজ্ঞানির্ভরশীল ধর্ম। তাই বৌদ্ধমতে, জীবনের সব ক্ষেত্রে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা অপরিহার্য। কারণ অজ্ঞানতা, মূর্খতা ও অসৎকর্ম মানবজীবনে কখনো সুখ আনতে পারে না, কখনো মানুষকে মহীয়ান করতে পারে না। দেশ ও সমাজকেও সমৃদ্ধ করতে পারে না। কারণ, অন্ধকার দিয়ে যেমন আলোকে আহ্বান করা যায় না, তেমনই অকুশল ও মন্দকর্ম দিয়ে কখনো সৎ, শুভ ও কল্যাণকে সম্ভাষণ করা যায় না। তাই বৌদ্ধরা তিন মাস প্রবারণা শিক্ষায় জীবনকে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করেন এবং অন্তর্মুখী শিক্ষায় নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন। তারা সর্ববিধ মঙ্গল ও কল্যাণময়তাকে আহ্বান জানান। তারা অশুভ শক্তির বিনাশ করেন এবং শুভ শক্তির আরাধনা করেন। এটাই হলো প্রবারণার মূল শিক্ষা।

আমরা গতবারের মতো এ বছরও শুভ প্রবারণা উৎসব এবং কঠিনচীবর দান অনুষ্ঠান বৃহৎ আকারে, উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের প্রত্যাশা রাখি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রবারণার পর থেকে এক মাসব্যাপী তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের সর্বত্র বৌদ্ধ সম্প্রদায় যেন যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে শুভ প্রবারণা ও কঠিনচীবর দানোৎসব উদযাপন করতে পারে।

দেশে এবারের প্রবারণা উৎসব অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশ এবং আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৩ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন বৌদ্ধ প্রবারণার জন্য। বৌদ্ধধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টও নতুনভাবে গঠিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। সাম্য, সম্প্রীতি, সৌভ্রাতৃত্ব এবং পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে এবারের প্রবারণা উদযাপন করা হচ্ছে।

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন, সর্বকল্যাণকর। ধর্মীয় ও সামাজিক ঐক্য এবং সংঘশক্তি বৃদ্ধিতেও এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, সুখং সংঙ্ঘসম্মগ্ঘি সংঙ্ঘনং তপ সুখো। অর্থাৎ একত্রে বসবাস করা সুখকর, একত্রে মিলন সুখকর এবং একসঙ্গে তপস্যাজনিত সর্বত কল্যাণসাধনও সুখকর। অতএব, চলুন আমরা প্রবারণার এ শিক্ষায় নিজেদের গড়ে তুলি, শান্তিশৃঙ্খলায় এবং দেশ, সমাজ ও জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একত্রে কাজ করি, ঐক্যবদ্ধ হই। সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু, জগতের সব জীব সুখী হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক। প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে বিশ্বের সবার প্রতি রইল আমার শুভেচ্ছা।

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া : শিক্ষাবিদ; সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

ফরিদ হাফেজ

গত সপ্তাহের শেষদিকে ফ্রান্সে যখন বিক্ষোভগুলো সহিংস রূপ নেয়, তখন ফরাসি উগ্র-ডানপন্থিরা দ্রুতই বর্ণবাদী ভাষা ব্যবহার করে এ সহিংসতার জন্য মুসলিম তরুণদের দায়ী করতে শুরু করে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে যখন হাজার হাজার অভিবাসী প্রতিবেশী মরক্কো থেকে স্প্যানিশ অঞ্চল সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল, তখনও স্পেনের উগ্র-ডানপন্থিরা একে মরক্কোবাসীদের একটি সুসংগঠিত ‘আক্রমণ’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দাবি করেন, এটি মূলত ‘ইসলামের আধিপত্য বিস্তারের চক্রান্ত’।

উগ্র-ডানপন্থিরা তাদের ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতি বাড়ানোর জন্য যে কোনো সংকটকে কাজে লাগাবে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। তবে ইউরোপের ক্রমবর্ধমান সমস্যার জন্য ইসলাম ও মুসলমানদের দায়ী করার এ ধারণাটি এখন আর শুধু ইউরোপীয় রাজনৈতিক অঙ্গনের সেই উগ্রগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গত সপ্তাহে ফ্রান্সে যখন ছাত্র বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করছিল, তখন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নীরবে একটি প্রস্তাব পাশ করে। প্রস্তাবটি ছিল-‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশ এবং মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্কের প্রভাব মোকাবিলার জন্য একটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন কৌশলের প্রয়োজনীয়তা।’ এ প্রস্তাবটি এনেছিল মধ্য-ডানপন্থি ‘ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি’ (ইপিপি), যা পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন এ দলেরই প্রতিনিধি।

প্রস্তাবটি ৩৮১-১৬৭ ভোটে পাশ হয়, আর ১৫ জন ভোটদানে বিরত ছিলেন। ইপিপির পাশাপাশি আরও চারটি রাজনৈতিক দল প্রায় সর্বসম্মতভাবে এতে সমর্থন দেয় : উগ্র-ডানপন্থি ‘প্যাট্রিয়টস ফর ইউরোপ’ ও ‘ইউরোপ অজ সভরেন নেশনস’, লিবারেল দল ‘রিনিউ ইউরোপ’ এবং ‘ইউরোপিয়ান কনজারভেটিভস অ্যান্ড রিফর্মিস্টস’। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, দ্য লেফট (বামপন্থি) এবং গ্রিনস (সবুজ দল) মূলত এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল, কিন্তু তারা এটি থামাতে পারেনি।

ফ্রান্স সরকারের ‘রাজনৈতিক ইসলামবাদ’ সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত বিতর্কিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এ প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বেশকিছু ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ দাবি করা হয়েছে, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ প্রস্তাবে ‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশকে’ ‘প্রভাব বিস্তার, ধীরে ধীরে ভিত্তি তৈরি, প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ এবং আদর্শগত বৈধতা অর্জনের একটি রাজনৈতিক কৌশল’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, ‘ইসলামপন্থিদের প্রভাব বিভিন্ন সমিতি, ফাউন্ডেশন, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, ধর্মীয়, জনকল্যাণমূলক, বিশ্ববিদ্যালয়, যুব, বৈষম্যবিরোধী বা সামাজিক পদক্ষেপমূলক কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করে।’

আরও নির্দিষ্টভাবে এতে বলা হয়েছে, ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য পরিচালিত বৈধ আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক ধর্মীয় পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে। এভাবে বৈচিত্র্য, সমতা, অন্তর্ভুক্তি এবং বৈষম্যবিরোধী অবকাঠামোগুলোকে ব্যবহার করে এসব সংস্থা নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা আদায় করছে।’ অন্য কথায়, মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো নেটওয়ার্কগুলো ইসলামফোবিয়া-বিরোধী উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে ইউরোপীয় সমাজে ‘অনুপ্রবেশ’ করছে।

এ প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক নয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে এটি বাস্তবায়ন করতেই হবে-এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাছাড়া, সহিংসতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে বর্জন করায় মুসলিম ব্রাদারহুড ও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা সত্তাগুলোকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তা ইউরোপজুড়ে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তা সত্ত্বেও প্রস্তাবটি এমন একটি ভাবধারাকে বৈধতা দেয়, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য গুরুতর পরিণতি বয়ে আনতে পারে। এটি স্বাধীনভাবে পরিচালিত মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোকে সন্দেহের তালিকায় ফেলে দেয় এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে মুসলিম নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণকে এক ধরনের ‘অনুপ্রবেশ’ হিসাবে তুলে ধরে।

প্রস্তাবে ব্রাসেলসভিত্তিক ‘ইউরোপিয়ান নেটওয়ার্ক এগেইনস্ট রেসিজম’সহ বেশ কয়েকটি সংস্থার নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, তারা এ ধরনের ‘ইসলামপন্থি’ আচরণ লালন করে। একইসঙ্গে তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল ব্যবহার বন্ধ করা এবং ইইউ-অর্থায়নে পরিচালিত যে কোনো সত্তাকে তাদের সঙ্গে কাজ করা থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্কের মতো অস্পষ্ট ধারণার কারণে যে কোনো সাধারণ মানুষকেও এর সঙ্গে জড়িয়ে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব হতে পারে।

বাহ্যিক নানা পক্ষ সহজেই এটিকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে পারে এবং ইতোমধ্যেই তা করছেও। উদাহরণস্বরূপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইউরোপ ও অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সহযোগী হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের মানহানি করার জন্য একটি ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ প্রস্তাবটি পেশ করার কয়েক মাস আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত ‘মুসলিম ব্রাদারহুড : ইউরোপের জন্য একটি আসল হুমকি’ শীর্ষক এক সম্মেলনে একজন প্রবীণ আমিরাতি রাষ্ট্রদূত অংশ নিয়েছিলেন। যদিও এখানে আমিরাতের প্রভাব স্পষ্টভাবে রয়েছে, তবুও এ প্রস্তাবে কাতার বা তুরস্কের তথাকথিত ‘বৈদেশিক তহবিল’, যা ‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশে’ সহায়তা করে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে-যা পর্দার পেছনের ভূরাজনীতির আরেক নির্দেশক।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ প্রস্তাবের মাধ্যমে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের রক্ষা করার পদক্ষেপকে ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশের চক্রান্ত হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি ইউরোপীয় সমাজে ইসলামভীতি মোকাবিলার উদ্যোগ ও উন্মুক্ত বিতর্কগুলোকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।

প্রতীকীভাবে, এ প্রস্তাবটি ইউরোপের ডানপন্থি ইসলামবিরোধী শক্তির জন্য একটি বড় বিজয়। এটি দেখায়, মধ্য-ডানপন্থি দলগুলো উগ্র-ডানপন্থিদের যত কাছাকাছি আসছে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টও উগ্র-ডানপন্থিদের প্রতিরোধ করার অবস্থান ততটাই ত্যাগ করতে শুরু করেছে। ইপিপি উগ্র-ডানপন্থিদের এজেন্ডা প্রায় পুরোপুরি আপন করে নিয়েছে, তবে তারা জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সেটিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।

এ প্রস্তাবটি ইউরোপীয় ইসলামফোবিয়া কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তাও স্পষ্ট করে। এখনকার ভয় আর সেই অভিবাসীদের নিয়ে নয়, যারা ‘মিশে যেতে’ ব্যর্থ হওয়া কোনো অপরিচিত মানুষ ছিল; বরং এখনকার ভয় সেই মুসলমানদের নিয়ে, যারা নিজেদের অধিকারের কথা বলতে পারে এবং নিজেদের নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম। মধ্য-ডানপন্থিদের জন্য এ ইসলামফোবিক কাঠামো রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসে। তারা কেবল মুসলিমবিরোধী ভয় দেখিয়ে নির্বাচনি সুবিধা লাভ করে না, বরং যারা বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ায়-সেই বামপন্থিদের ওপরও আঘাত হানতে পারে।

ফরাসি রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ইসলামি-বামপন্থা’ ধারণার প্রচার করা যে আকস্মিক কিছু নয়, তা স্পষ্ট। বামপন্থি দল ‘লা ফ্রান্স ইনসোমিসে’র জ্যাঁ-লুক মেলঁশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রেসিডেন্ট পদের একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। তাকে এখন এ অভিযোগ এনে অভিযুক্ত করা হচ্ছে যে, তিনি ‘বিক্ষোভকারীদের’ উৎসাহিত করছেন; ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, এর পেছনে যারা রয়েছে, তারা মুসলিম।

বামপন্থি এবং মুসলিমদের ওপর এই দ্বিমুখী আক্রমণ মূলত সেই পুরোনো ‘জুডিও-বলশেভিক’ ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রতিচ্ছায়া, যেখানে পশ্চিমা সভ্যতা ধ্বংসের লক্ষ্যে কমিউনিজম ছড়ানোর জন্য ইহুদিদের দায়ী করা হতো। আজ ‘ইসলামি-বামপন্থা’ ধারণাটি রক্ষণশীল, লিবারেল এবং উগ্র-ডানপন্থি-সবার কাছেই একটি বলির পাঁঠা হিসাবে কাজ করছে। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে বর্ণবাদ ও বৈষম্য মোকাবিলার ক্ষেত্রে পশ্চিমারা যে সামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল, তা নস্যাৎ করার এই এক বিপরীতমুখী চেষ্টা। তাদের উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে-মুসলমানদের বাদ দিয়ে এক ‘দুর্গসদৃশ ইউরোপ’ গড়ে তোলা।

‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশ’ সংক্রান্ত এ প্রস্তাবের ভিত্তি যতই দুর্বল হোক না কেন, ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে মুসলিমদের নাগরিক অধিকার রক্ষাকারী স্বাধীন সংস্থায় বাধা দিতে রক্ষণশীল জোটগুলোর পক্ষ থেকে আরও আইনি পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাব। ইতোমধ্যে ভয় দেখানোর দলগুলো সামাজিক সমস্যা এবং কৃচ্ছ্রসাধনের বিরুদ্ধে হওয়া বৈধ আন্দোলনগুলোর জন্য ইসলামকে দায়ী করতে থাকবে, আর রাজনীতিকরা নিজেদের শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা থেকে জনগণের চোখ ফেরাতে মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে আঙুল তুলতে থাকবে।

এ মুহূর্তে যা প্রয়োজন তা হলো-সবার নাগরিক স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে রক্ষার মাধ্যমে এ রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়াশীলতার একটি উপযুক্ত ও জোরালো জবাব দেওয়া।

আল জাজিরা থেকে ভাষান্তরিত

ফরিদ হাফেজ : যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ‘দ্য ব্রিজ ইনিশিয়েটিভের একজন সিনিয়র গবেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ ড. মাহফুজ পারভেজ

ড. মাহফুজ পারভেজ

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

নিউইয়র্কের চিঠি প্রবাসী বাঙালির অর্থহীন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয়

প্রবাসী বাঙালির অর্থহীন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয়

সৎ করদাতার ওপর বাড়তি বোঝা কেন

সৎ করদাতার ওপর বাড়তি বোঝা কেন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম