প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের
Advertisement
এস এম আজাদ হোসেন
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে আইনগত প্রশ্ন ওঠে; কিন্তু যে ব্যবস্থার মধ্যে দুর্ঘটনাটি ঘটল, সেই ব্যবস্থার জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত-সে প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়। একটি সড়কের নকশা ত্রুটিপূর্ণ হলে, বিপজ্জনক স্থান দীর্ঘদিন সংস্কারহীন থাকলে, গণপরিবহণের চালককে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় গাড়ি চালাতে হলে কিংবা পথচারীর নিরাপদ পারাপারের সুযোগ না থাকলে তার দায় নির্ধারণ হবে কীভাবে? বিদ্যমান আইন কি এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্পষ্ট দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য পৃথক ও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের যৌক্তিকতা নিহিত। নতুন আইন প্রয়োজন কি না, সেই সিদ্ধান্ত কেবল বিদ্যমান আইনের নাম বা সংখ্যা দেখে নেওয়া যাবে না। দেখতে হবে, নাগরিকের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব কতটা সুস্পষ্ট, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বাধ্যবাধকতা কতটা কার্যকর এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা বাস্তব।
পরিসংখ্যান যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে : রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৬৭১ জন ছিলেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার এবং ১ হাজার ৫৬৪ জন ছিলেন পথচারী। অর্থাৎ সংস্থাটির হিসাবে, মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৬ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সঙ্গে এবং ২১ শতাংশের বেশি পথচারী মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ঢাকায় একই বছরে ৪০৯টি দুর্ঘটনায় ২১৯ জন নিহত হয়েছেন।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের চিত্রও উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ওই মাসে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৩৯ জন মোটরসাইকেল আরোহী এবং ১০৬ জন পথচারী। দুর্ঘটনার বিশ্লেষণে ১৬৮টি ঘটনায় যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানো, ১০৯টিতে পথচারীকে ধাক্কা দেওয়া বা চাপা দেওয়া এবং ৯৮টিতে মুখোমুখি সংঘর্ষের তথ্য উঠে এসেছে।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য শুধু মৃত্যুর সংখ্যা নয়। নিয়ন্ত্রণ হারানো, পথচারীকে ধাক্কা দেওয়া কিংবা মুখোমুখি সংঘর্ষের মতো ঘটনাগুলোর পেছনে গতি, সড়কের নকশা, দৃশ্যমানতা, যানবাহনের অবস্থা, চালকের ক্লান্তি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ভূমিকা থাকতে পারে। প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ আলাদাভাবে তদন্ত করা দরকার; তবে এই তথ্যগুলো দেখায়, সড়ক নিরাপত্তার সমাধান শুধু দুর্ঘটনার পর অপরাধী শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।
সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক অনুমানের ব্যবধান : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ ২০২৩ সালের বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ২০২১ সালের সরকারি নথিভুক্ত সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ৫ হাজার ৮৪ উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছরের জন্য সংস্থাটির পরিসংখ্যানগত অনুমান ৩১ হাজার ৫৭৮; অনুমানের আস্থাসীমা ২৭ হাজার ৪৪১ থেকে ৩৫ হাজার ৭১৬।
এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। সরকারি নথিভুক্ত সংখ্যা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান একই পদ্ধতিতে তৈরি নয়; তাই দুটিকে সরাসরি তুলনা করে একটিকে অন্যটির বিকল্প বলা ঠিক হবে না। তবে ব্যবধানটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু শনাক্ত করা, হাসপাতালের তথ্য যুক্ত করা, মৃত্যুর কারণ যাচাই এবং জাতীয় পরিসংখ্যানের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ, কার্যকর বাজেট বরাদ্দ কিংবা নীতির সাফল্য পরিমাপ করা কঠিন।
অতএব, নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনে শুধু দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহের কথা থাকলেই হবে না; তথ্য সংগ্রহের অভিন্ন সংজ্ঞা, সংস্থাগুলোর মধ্যে আদান-প্রদান, তথ্য যাচাই, নিয়মিত প্রকাশ এবং স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
বিদ্যমান আইন আছে, কিন্তু সমন্বিত দায় কতটা স্পষ্ট : বাংলাদেশে সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮ রয়েছে। চালকের লাইসেন্স, যানবাহন পরিচালনা, বিভিন্ন অপরাধ ও শাস্তির বিধানও রয়েছে। পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহনের কারিগরি মান, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও জরুরি চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক আইন, বিধি ও নীতিমালা কার্যকর। ফলে সমস্যাটিকে শুধু আইন নেই বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এসব আইন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তার সামগ্রিক লক্ষ্য কতটা সমন্বিত এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কতটা পরিমাপযোগ্য। কোনো বিপজ্জনক মোড় বারবার দুর্ঘটনার কারণ হলে সেটি শনাক্ত ও সংশোধনের চূড়ান্ত দায়িত্ব কার? নতুন সড়ক চালুর আগে নিরাপত্তা নিরীক্ষা না হলে তার দায় কার? গণপরিবহণের চালক নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে কাজ করলে চালক ছাড়াও মালিক বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কী? আহত ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠানের কী বাধ্যবাধকতা থাকবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর বিচ্ছিন্ন বিধানের ওপর ছেড়ে না দিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামোয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আইন প্রণয়নের আগে বিদ্যমান বিধিবিধানের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করে দেখতে হবে, কোথায় নতুন বিধান প্রয়োজন, কোথায় সংশোধন যথেষ্ট এবং কোথায় বাস্তবায়নের দুর্বলতাই মূল বাধা। এখানে উল্লেখ্য যে, গত ২০ জুলাই ২০২৬ জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ চূড়ান্ত, অনুমোদন ও প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
নতুন আইনে যে চারটি বিষয় বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত : প্রথমত, ‘সড়ক ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা দায়’। নতুন সড়ক চালুর আগে নিরাপত্তা নিরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নিয়মিত পর্যালোচনা এবং শনাক্ত ত্রুটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধনের বিধান থাকতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাইয়েরও নিয়ম থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ‘যানবাহন ও পরিবহণ পরিচালনার জবাবদিহি’। যানবাহনের প্রকৃত ফিটনেস, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য, চালকের প্রশিক্ষণ, কর্মঘণ্টা ও বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। চালক অপরাধ করলে তার বিচার হবে; তবে প্রমাণ থাকলে মালিক বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলাও তদন্তের আওতায় আসতে হবে।
তৃতীয়ত, ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা সমন্বয় ও তথ্যব্যবস্থা’। পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থা এবং স্থানীয় সরকারের তথ্য সমন্বিত করার জন্য কার্যকর জাতীয় তথ্যভান্ডার প্রয়োজন। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা সেলকে যথাযথ ক্ষমতা, অর্থায়ন, জনবল ও জবাবদিহি দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। নতুন কর্তৃপক্ষ গঠনের আগে বিদ্যমান কাঠামোর ঘাটতি মূল্যায়ন করা জরুরি।
চতুর্থত, ‘দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধার ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা’। জরুরি সাড়াদানের দায়িত্ব, উদ্ধারসেবার সমন্বয়, হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় এবং আহত ব্যক্তির চিকিৎসা পাওয়ার পথে বিলম্ব কমানোর বিষয়গুলোও আইনি কাঠামোয় আনতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা কেবল দুর্ঘটনা ঠেকানো নয়; দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাত কমানোও এর অংশ।
শাস্তির সংখ্যা নয়, প্রাণরক্ষাই হবে সাফল্যের মাপকাঠি : একটি আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা আইনের কার্যকারিতা বিচার করতে হবে ফলাফলের ভিত্তিতে। কতটি মামলা হলো, কতজন জরিমানা দিলেন কিংবা কতটি অভিযান পরিচালিত হলো-এসব প্রশাসনিক সূচক গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। দেখতে হবে সড়কে মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত কমেছে কি না, কতটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নিরাপদ হয়েছে, যানবাহনের নিরাপত্তা মান উন্নত হয়েছে কি না, চালকের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে কি না এবং আহত ব্যক্তিরা দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ ব্যবস্থা দর্শনও এই নীতিকে গুরুত্ব দেয় : মানুষের ভুলের আশঙ্কা স্বীকার করেই এমন পরিবহণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভুলের পরিণতি অনিবার্যভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাত না হয়। এর জন্য নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ গতি, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার এবং দুর্ঘটনার পর কার্যকর চিকিৎসাকে একই কাঠামোয় দেখতে হবে।
বাংলাদেশে পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের সবচেয়ে বড় যৌক্তিকতা তাই নতুন শাস্তি যোগ করা নয়। বরং রাষ্ট্র, সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থা, নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ, পরিবহণ মালিক ও পরিচালনাকারী এবং সড়ক ব্যবহারকারীর দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা; দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি কমানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি করা; এবং ব্যর্থতার জন্য কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সড়কে প্রতিটি মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখলে সমস্যার ধারাবাহিকতা আড়ালে থেকে যায়। একটি আধুনিক আইন সেই ধারাবাহিক ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে স্পষ্ট, পরিমাপযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক করাই হবে এমন আইনের প্রকৃত সার্থকতা।
এস এম আজাদ হোসেন : কলামিস্ট, সামাজিক কর্মী ও নিরাপদ সড়ক চাই-এর সাবেক মহাসচিব
