Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

Advertisement

Icon

ড. মুস্তফা ফেতুরি

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

গত ২০ অক্টোবর গাদ্দাফির সমর্থকরা তার মৃত্যুর ১৫তম বার্ষিকী পালন করেছে। হত্যা করার পর তাড়াহুড়া করে এক গোপন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছিল। স্থানটির কথা শুধু ওই দাফনকারীদেরই জানা ছিল। গাদ্দাফি যেন এমন এক গোপন রহস্য পেছনে ফেলে গেছেন, যা প্রকাশ করতে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ভয় পায়; তার কবরটিই যেন দেশটির বিরাজমান অরাজকতার জন্য এক বড় হুমকি।

গাদ্দাফির জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রকাশ্য জানাজার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া মানুষগুলোই সাইফ আল-ইসলামের জানাজায় সমবেত হয়েছিল-ছেলের শোক পালনের মাধ্যমেই মূলত তারা বাবার জন্যও শোক প্রকাশ করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিহত হওয়া সাইফ রাজনৈতিক সহিংসতা ও জবাবদিহিতার আরেকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখে গিয়েছেন। লিবিয়ার পাবলিক প্রসিকিউটরের কার্যালয় জানায় যে, তারা সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করেছে এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, কিন্তু আট মাস পেরিয়ে গেলেও কাউকে আদালতে হাজির করা হয়নি। বাবা ও ছেলের মৃত্যু এমন এক সূত্রে গাঁথা, যার জবাব লিবিয়াকে এখনো দিতে হবে; নতুন লিবিয়া কি শেষ পর্যন্ত গাদ্দাফি পরিবারকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে, নাকি তাদের মৃত্যু এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলোই দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে থাকবে?

গাদ্দাফির জন্মশহর সিরতেতে মুয়াম্মার গাদ্দাফির হত্যার ১৫ বছর এবং তার ছেলে সাইফ আল-ইসলামের একই ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার কয়েক মাস পর, লিবিয়া এখনো বিচারহীন সহিংসতার ফলে এক স্থায়ী অচলাবস্থায় বন্দি হয়ে আছে। মরুভূমির কোনো গোপন কবর কিংবা বছরের পর বছর ঝুলে থাকা বিচার প্রক্রিয়া-এই দুই মৃত্যুর কোনোটাতেই সত্য প্রকাশ না করার এ প্রবণতা প্রকাশ করে যে, বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের ভিত্তির দুর্বলতা নিয়ে ভয়াবহ আতঙ্কে ভুগছে। বিচার প্রক্রিয়াকে বিজয়ী পক্ষের সুবিধা হিসাবে দেখে ক্ষমতাসীনরা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই লিবিয়ার মূলনীতি বানিয়ে নিয়েছে।

২০১১ সালে যা ঘটেছিল তা কোনো স্বৈরতন্ত্রের অবসান ছিল না, বরং তা ছিল দায়মুক্তি পাওয়া রাজনৈতিক সহিংসতার এক নতুন যুগের সূচনা। মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে : বিপ্লব-পরবর্তী লিবিয়ায় ক্ষমতার ভিত্তি ব্যালট নয়, নির্ধারণ করবে বন্দুক। বিপ্লবের ১৫ বছর পর তার ছেলে সাইফ আল-ইসলামের হত্যা প্রমাণ করে যে, এ নিয়ম এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। বিপ্লবী উন্মাদনা থেকে মিলিশিয়া শাসনে রূপান্তর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেনি; বরং এটি প্রতিশোধপরায়ণতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, সশস্ত্র যুদ্ধবাজদের ধনী করেছে এবং দুর্নীতির এক বিশাল চক্রকে উসকে দিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে (সিপিআই) ১৮২টি দেশের মধ্যে লিবিয়ার অবস্থান ১৭৭তম। সাইফের হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত করা মানে ক্ষমতার মূল ভিত নড়িয়ে দেওয়া, যা পুরো রাজনৈতিক কাঠামোকেই ধসিয়ে দেওয়ার ভয় তৈরি করে।

আজকের দিনের লাখ লাখ লিবিয়ানের কাছে গাদ্দাফি আমলের প্রতি আকুলতা মানেই তার শাসনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন নয়; এটি মূলত ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল জীবনের জন্য হাহাকার।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের একপাক্ষিক ও পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যানের বাইরে, গাদ্দাফির আমলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে নিরাপত্তা ও স্বস্তি ছিল তা আজ পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের একপাক্ষিক ও পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যানের বাইরে গিয়ে দেখলে, গাদ্দাফির আমলের সেই দৈনন্দিন নিরাপত্তা ও স্বস্তির কথা আজ আর কল্পনাই করা যায় না; দেশজুড়ে সার্বিক নিরাপত্তা, গভীর রাতেও নারীদের নিরাপদে গাড়ি চালানো, নিরবচ্ছিন্ন মৌলিক সেবা এবং নাগালের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়-এসব এখন কেবলই অতীত। ‘নিুআয়ের পরিবারগুলো টেলিকম ও তেল খাতের মতো রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে নিয়মিত লভ্যাংশ পেত। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ১৫ বছর ধরে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর সব ধরনের তদন্ত ও নজরদারি সত্ত্বেও গাদ্দাফি ব্যক্তিগতভাবে কোটি কোটি ডলার পশ্চিমা ব্যাংকে লুকিয়ে রেখেছেন-বিরোধীদের এমন দাবির স্বপক্ষে একটি প্রমাণও কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি। বাস্তবে, ২০১১-এর পরবর্তী সময়টা জনগণের নিশ্চিত সামাজিক নিরাপত্তাকে কেড়ে নিয়ে পুরো দেশকে মিলিশিয়াদের চারণভূমিতে পরিণত করেছে।’

বাবা ও ছেলে-এই দুই গাদ্দাফিই লিবিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে রয়েছেন মূলত এ কারণেই, তাদের মৃত্যু নতুন লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো সুরাহা করতে পারেনি। বহু লিবিয়ানের কাছে তাদের নাম স্থায়িত্ব ও এক হারানো রাষ্ট্রের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে, আর সাইফ আল-ইসলামের জনসমর্থন টানার ক্ষমতা এমন সব বিভাজনকে প্রকাশ করে দিয়েছে, যা ২০১১-পরবর্তী লিবিয়া এখনো অতিক্রম করতে পারেনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যখন তাকে হত্যা করা হয়, তখন বনি ওয়ালিদে তার জানাজায় মানুষের ঢল নামে-যেখানে পুরোনো সবুজ পতাকার নিচে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়। মানুষ শুধু মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান জানায়নি, বরং এটি ছিল বর্তমান পরিস্থিতির বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ। জনসচেতনতার এক বড় অংশের কাছে তার মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের চলে যাওয়া নয়, বরং মিলিশিয়া শাসন থেকে বেরিয়ে আসার একটি বিকল্প পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই বিভাজনগুলো দূর করতে সক্ষম এমন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় গাদ্দাফির উত্তরাধিকার লিবিয়ার পরিচয়, বৈধতা ও ভবিষ্যতের লড়াইয়ে এক জীবন্ত ফাটলরেখায় পরিণত হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার বাইরেও লিবিয়া সার্বভৌমত্বের এমন এক চরম অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে, যা দেখলে গাদ্দাফি তার অজ্ঞাত কবর থেকেও নড়ে উঠতেন। তার যত ত্রুটিই থাক না কেন, ১৯৬৯ সালে ক্ষমতা দখলের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে লিবিয়ার মাটি থেকে সব বিদেশি সামরিক ঘাঁটি উচ্ছেদ করতে পেরে তিনি গর্বিত ছিলেন। বর্তমান স্বাধীনতাহীনতা ও আত্মসমর্পণের বিষয়টি বিদেশি হস্তক্ষেপের রাজনৈতিক কূটকৌশলে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। খলিফা হাফতারের বাহিনীর হাতে মধ্য ত্রিপলি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবরুদ্ধ অবস্থায় বেকায়দায় থাকা সেই সময়ের জাতীয় ঐকমত্য সরকারের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা ও সমুদ্র চুক্তি সই করে আঙ্কারা। এই সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য সামরিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছিল। এই চুক্তি তুরস্ককে লিবিয়ায় সরাসরি সামরিক অবস্থান গড়ে তোলার সুযোগ করে দেয়। প্রতিনিধি পরিষদসহ সব রাজনৈতিক বলয়ের রাজনীতিবিদরাই প্রথমে এ সমঝোতাকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে নিন্দা জানায়। অথচ ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর খোদ সেই হাউজ অব রিপ্রেদেনটেটিভস এ সমুদ্র চুক্তি অনুমোদন করে। এ নীতিবদলটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে যে, ২০১১-পরবর্তী রাজনৈতিক এলিটরা স্বল্পমেয়াদি টিকে থাকার স্বার্থে কীভাবে নীতি বিসর্জন দিচ্ছে, লিবিয়াকে বিদেশি শক্তিগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত করছে এবং টুকরো টুকরো করে দেশের স্বাধীনতাকে বন্ধক রেখে দিচ্ছে।

পনেরো বছরের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া বাবা ও ছেলের এই অমীমাংসিত মৃত্যু দুটো বালুচরের ওপর গড়ে ওঠা ২০১১-পরবর্তী শাসনব্যবস্থার জোড়া প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক শ্রেণি-পূর্ণ সত্য উন্মোচিত হওয়ার ভয়ে পঙ্গু, টিকে থাকার জন্য মিলিশিয়ার বন্দুকের ওপর নির্ভরশীল এবং বিদেশি প্রভুদের কাছে নতজানু-লিবিয়াকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কোনো পথ দেখাতে পারে না, কারণ তারাই দেশটির চলমান অরাজকতার প্রধান সুবিধাভোগী। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড এবং কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই কেড়ে নেওয়া অগণিত প্রাণের মুখোমুখি হতে অস্বীকার করে লিবিয়ার শাসকরা আইনের শাসনকে শুধু একটি মায়াজালে পরিণত করেছে। স্বচ্ছ তদন্ত এবং সব ভুক্তভোগীর জন্য সমান জবাবদিহি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত প্রকৃত জাতীয় সমঝোতা অসম্ভব-আর সমঝোতা ছাড়া একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও সার্বভৌম লিবিয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার কোনো পথ থাকতে পারে না।

ন্যায়বিচারকে যদি বিজয়ীদের বিশেষাধিকার না ভেবে একটি সর্বজনীন অধিকার হিসাবে গণ্য করা না হয়, তবে অতীতের ছায়া বর্তমানকে বিভক্ত করে যেতেই থাকবে এবং দেশটিকে চিরস্থায়ী ধ্বংসের বেড়াজালে আটকে রাখবে।

মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে অনুবাদ করেছেন : পরম ওয়াজেদ শিকদার

ড. মুস্তফা ফেতুরি : লিবিয়ান শিক্ষাবিদ ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি ইউ’র ফ্রিডম অব দি প্রেস প্রাইজ লাভ করেছেন।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের

প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

হালফিল বয়ান পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম