মুক্ত বিনিয়োগ নীতিই হতে পারে সেরা কৌশল
Advertisement
শাহ খসরুজ্জামান
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পত্রিকা পড়লেই দেশের অর্থনৈতিক উদ্বেগ চোখে পড়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে পরবর্তী ঋণের কিস্তি পাওয়া যাবে কিনা, আবার এনবিআর রাজস্ব আদায়ে বাজেটের ঘাটতি পূরণ করে সরকারের প্রধান অর্থ জোগানদাতা হিসাবে সফল হবে নাকি ব্যর্থ হবে, এসব প্রশ্ন পাঠকের মনে চিন্তার ছাপ ফেলে। দেশের কয়েকজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অর্থনীতির সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকারকে সতর্কবার্তা দিলেও অর্থনীতিকে সচল করার কোনো পরামর্শ দেননি। অপরদিকে আইএমএফ গত এপ্রিলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪.৩ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল, যা আগে ৫ শতাংশ ছিল। এখন তা ৩.২ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাসে জানিয়েছে। বিদেশি ঋণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল ১০৩.৪১ বিলিয়ন ডলার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরও ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। তাই এনবিআরকে রাজস্ব আহরণে নতুন পরিকল্পনা বা নতুন পথ খুঁজে বের করতে হবে। প্রত্যেক দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং ব্যবসায়ীদের মনমানসিকতা ভিন্ন ধরনের হয়। সুতরাং, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে কোনো সংস্কার করলে তা আদৌ সফল হবে কিনা-এ ব্যাপারে সন্দেহ আছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে দেশের স্থবির বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে সফল করার পরিবেশ তৈরি করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা চালু না থাকলে তাদের কর প্রদানের সুযোগ ক্রমশ সীমিত হয়ে যাবে। ফলে এনবিআর বাজেটের ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হতে পারে। আর তা হলে এর প্রভাব গোটা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ পড়বে। বিদেশে রাজনীতিবিদ, আমলা এবং ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিন ধরে অর্থ পাচারের ফলে দেশে মুদ্রাবাজারে সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের টাকা পাচারের একটি কারণ ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে ওই জমাকৃত অর্থের কর প্রদান করতে হয়। কর প্রদানের ভয়েও কোটি কোটি টাকা এ দেশের বিত্তশালী ব্যক্তি-ব্যবসায়ীরা বিদেশের ব্যাংকে টাকা জমা রাখা নিরাপদ মনে করেছেন।
গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ জাতীয় আইনজীবী সমিতির প্রস্তাব ছিল, দেশের অর্থনীতি সংকটের মূল কারণ হচ্ছে দেশে অর্থের সংকট, যা কাটিয়ে ওঠার একমাত্র পথ ‘মুক্ত বিনিয়োগ নীতি’। উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি সীমিতকরণ ও ডলারের মূল্য স্বাভাবিকীকরণ-সবই দেশের সার্বিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। বিনিয়োগ তখনই বৃদ্ধি পাবে, যখন মুদ্রাবাজারের অর্থ সরবরাহ বাড়বে এবং দেশে মুদ্রা সংকট থাকবে না। মুদ্রা সংকট দূর করার জন্য মুক্ত বিনিয়োগ নীতির পথ ধরে এগিয়ে আসতে হবে। অর্থনীতিকে চাঙা করতে এর কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশে সব ধরনের ব্যবসা বিদেশিদের বিনিয়োগের মতো উন্মুক্ত করে দিতে হবে। আমদানি-রপ্তানি থেকে শুরু করে শিল্প, কৃষি, আবাসন, ভূমি, স্বাস্থ্যসহ যে কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে নতুন বিনিয়োগকৃত অর্থ এবং করদাতাদের বিনিয়োগ করা মূলধনের ওপর করারোপ করার বিধান বর্তমান অর্থবছরের জন্য রহিত করে সব ধরনের ব্যবসাকে বিদেশি বিনিয়োগের মতো উন্মুক্ত করে দেওয়া দরকার। বিদেশি বিনিয়োগ যেমন বিনা বাধায় মূলধনের ওপর বিনা করারোপে এ দেশে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে; অনুরূপ সুযোগ বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের এ দেশে বিনিয়োগের সুযোগ প্রদান করলে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ যেমন কর প্রদানের ভয়ে গোপনে পাচার হয়েছে, তেমনি গোপনীয়ভাবে এ দেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিনা কর প্রদানের সুযোগ পেলে তা ফেরত আসবে। ব্যবসায়ীরা দেশের প্রচলিত কর আইন অনুসারে তাদের ব্যবসার লাভ এবং মূলধনের ওপর সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ হারে সুদ ও জরিমানা দিতে অভ্যস্ত নয়; তাই বিত্তশালী ব্যক্তিরা তাদের গোপনীয় অর্থ এ দেশের ব্যাংকে জমা না দিয়ে ট্যাক্সের আওতায় বাইরে রেখে পাচারের মাধ্যমে বিদেশে জমা রাখা নিরাপদ মনে করে। সুতরাং, উল্লেখিত বিনিয়োগের মাধ্যমে কর প্রদান না করার সুযোগ পেলে পাচারকৃত অর্থ করমুক্ত রাখার জন্য তারা উদ্যোগী হবেন এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। অনুরূপভাবে এ দেশের বিত্তবান ব্যক্তিরা বিনিয়োগে কর অব্যাহতির সুযোগ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ করলে তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ মুদ্রাবাজারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিশালী করবে। মুক্ত বিনিয়োগ নীতি সরকার ঘোষণা করলে এটি জাদুর চেরাগের মতো কাজ করবে। অর্থমন্ত্রীকে ঝুড়ি নিয়ে আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হবে না; বরং মুক্ত বিনিয়োগ নীতির পথ ধরে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজেটের ঘাটতি পূরণ হলে আইএমএফ স্বয়ং ঋণের ঝুড়ি নিয়ে আমাদের সরকারের দ্বারস্থ হবে। ফলে সরকারের বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যাবে। অতীতের সরকারের মতো ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যাংককে দুর্বল করা কিংবা নোট ছাপিয়ে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি লাগামহীন হওয়ার অবস্থা এ দেশে সৃষ্টি হবে না। মুক্ত বিনিয়োগ নীতি ঘোষণা করে সরকার দেশে-বিদেশে নতুন বিনিয়োগের সুবিধা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে পারে। ফলে দেশে-বিদেশে বিপুল সাড়া পড়ে যাবে এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর বিনা করারোপের ফলে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সুযোগ হওয়ার ফলে পাচারকৃত অর্থ এ দেশে ফেরত আসার একটি সুন্দর গ্রহণযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি হবে। ফলে নতুন ব্যবসার লভ্যাংশ থেকে এনবিআর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার বিপুল পরিবর্তনের সুফল এ দেশের মানুষ ভোগ করতে পারবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব আহরণের জন্য করব্যবস্থাকে শহরকেন্দ্রিক থেকে বিকেন্দ্রীয়করণের মাধ্যমে পল্লিকেন্দ্রিক করার সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম-গঞ্জে অনেক কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছে। তাদের নতুন বিনিয়োগের সুবিধা দিয়ে করের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। তাই এনবিআর প্রতি উপজেলা কর কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে নতুন বিনিয়োগের সুবিধা প্রচারের মাধ্যমে গ্রামের বিত্তশালীদের কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করে করের আওতায় আনার পদক্ষেপ জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করতে পারে। এ নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বাজেটে রাজস্ব আয়ের ঘাটতি থাকবে না। এখন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হবে। ওই পরিকল্পনাকে সাফল্যমণ্ডিত করতে স্থানীয় ডিসিকে আহ্বায়ক করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে জেলার কর কমিশনার ও উপজেলার কর অফিসার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ‘ছোট কর সমন্বয় কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে।
শাহ খসরুজ্জামান : সিনিয়র অ্যাডভোকেট, সুপ্রিমকোর্ট; সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় আইনজীবী সমিতি
