বিশ্বে সংঘাত বাড়ছে, শান্তির সন্ধান ব্যাহত
Advertisement
সৈয়দ তোশারফ আলী
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্ব আজ এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত সামরিক সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জনঅসন্তোষ সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শান্তি রক্ষার সক্ষমতাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। একসময় ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হওয়া সংঘাতগুলো এখন জ্বালানি বাজার, কৌশলগত জোট, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
সৌদি আরব : সামরিক প্রতিরোধের সীমাবদ্ধতা : আরব বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি সৌদি আরব ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে হুথিরা রিয়াদকে লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করে। এসব হামলার মধ্যে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সৌদি আরামকোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আঘাতের ঘটনাও রয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো সুরক্ষিত রাখার সৌদি সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সৌদি আরবের হাতে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম ও বিপুল আর্থিক সম্পদ রয়েছে। তবু এসব সুবিধা অসম যুদ্ধকৌশলে অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষের হুমকি দূর করতে পারেনি। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, বিচ্ছিন্ন সামরিক নেটওয়ার্ক এবং ইয়েমেনের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি-সব মিলিয়ে শুধু আকাশ প্রতিরক্ষা বা পালটা হামলার মাধ্যমে এ সংঘাতের সমাধান কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সংকটের সঙ্গে ইরান এবং তার আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বৃহত্তর বিরোধও জড়িত। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। তিন দেশ ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয়, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর। পরিশেষে, সৌদি আরবের একটি কার্যকর রাজনৈতিক কৌশলও প্রয়োজন। ইয়েমেনের সংঘাতের অবসান এবং আঞ্চলিক বৈরিতা হ্রাসে আলোচনা দীর্ঘমেয়াদে আক্রমণ ও পালটা আক্রমণের অন্তহীন চক্রের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
ইউরোপ : যে যুদ্ধের শেষ দেখা যাচ্ছে না : ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউরোপকে এ যুদ্ধের পরিণতি বহন করতে হচ্ছে। সংঘাতটি ইউরোপের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার বদলে দিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে এবং মহাদেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে এবং উভয় পক্ষই হামলা জোরদার করেছে। ১৭ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যের কথা উঠে আসে। এতে কিয়েভের প্রতি মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা অব্যাহত থাকবে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপের জন্য এ যুদ্ধের প্রভাব শুধু রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারগুলোকে প্রতিরক্ষা চাহিদার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। একইসঙ্গে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো সুরক্ষা এবং রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এখনো বড় প্রশ্ন। রাশিয়ার কৌশলগত সুবিধা অর্জনের চেষ্টা কিংবা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংকল্প-কোনোটিই এখনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। টেকসই শান্তির জন্য ইউক্রেনের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্ন সমাধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন করে আগ্রাসন ঠেকানোর বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-উত্তেজনা থেকে প্রকাশ্য যুদ্ধ : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য অন্যতম গুরুতর হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এটি এখন আর শুধু বৈরী বক্তব্য, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা নয়। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং সামুদ্রিক চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অক্টোবরেও কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল, কিন্তু বিরোধের মৌলিক বিষয়গুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এ সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। সরু এ জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। জাহাজ চলাচলে বাধা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর হুমকি জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গাজা-যুদ্ধবিরতি মানেই শান্তি নয় : কূটনৈতিক অঙ্গীকারকে স্থায়ী নিরাপত্তায় রূপান্তর করতে না পারার আরেকটি বেদনাদায়ক দৃষ্টান্ত গাজা। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও সহিংসতা ও বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর জাতিসংঘ জানায়, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজায় ১,৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত সংঘাত সম্পর্কিত ১,০৭৬টি মৃত্যুর ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করেছিলেন। এ দুটি পরিসংখ্যানের সময়সীমা ও যাচাইয়ের মানদণ্ড আলাদা। তাই এগুলোকে একই ধরনের তথ্য হিসাবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
দক্ষিণ এশিয়া-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা : দক্ষিণ এশিয়ার সামনে ভিন্ন ধরনের হলেও সমান গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাকিস্তান ও ভারতের রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখিয়ে দিচ্ছে, জনআস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা এবং ভিন্নমত মোকাবিলার পদ্ধতি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
পাকিস্তানে সরকার, কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক এবং প্রাদেশিক রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিরোধ অস্থিরতা বাড়িয়েছে। অক্টোবর মাসে খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণসহ প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করার ঘটনা নিরাপত্তা-উদ্বেগ ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মধ্যকার টানাপোড়েন প্রকাশ করেছে। ভারতেও নির্বাচনি স্বচ্ছতা নিয়ে বিক্ষোভ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। রয়টার্সের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও গ্রেফতারের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনি ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগ এসব আন্দোলনের অন্যতম বিষয়, যদিও নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে।
সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো এবং মানবিক নীতি রক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর হতে হবে। বৃহৎ শক্তিগুলোর উচিত কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্য আঞ্চলিক সংঘাতকে ব্যবহার না করে সংযম প্রদর্শন করা। আঞ্চলিক সংস্থা ও মধ্যম শক্তিগুলোরও উচিত প্রতিদ্বন্দ্বী জোটকে আরও শক্তিশালী করার পরিবর্তে আলোচনা ও পারস্পরিক আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখা।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপদ সামুদ্রিক বাণিজ্য, মানবিক সহায়তা এবং নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক যোগাযোগ সংঘাতের প্রণোদনা কমাতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার জন্য ইয়েমেন, ইরান, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের পরস্পরসংযুক্ত সংকটগুলোর অগ্রগতি জরুরি। ইউরোপে যে কোনো সমঝোতায় ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং নতুন করে আগ্রাসন প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও সংলাপ অপরিহার্য। বিশ্বনেতাদের সামনে মৌলিকভাবে দুটি পথ রয়েছে। তারা সংঘাত, প্রতিশোধ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যেতে পারেন অথবা উপলব্ধি করতে পারেন, দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার ভিত্তি হলো আলোচনা, ন্যায়বিচার, সংযম এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।
শান্তি দুর্বলতার লক্ষণ নয়, কূটনীতিও দায়িত্ব এড়ানোর পথ নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস, কৌশলগত ধৈর্য এবং মৌলিক নীতির প্রশ্নে আপস না করেও অন্যের বৈধ উদ্বেগ উপলব্ধি করার মানসিকতা।
ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কোনো দেশের সামরিক শক্তি সবচেয়ে বেশি তার ওপর নয়; বরং কোনো দেশের নেতারা নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকাতে এবং আরও স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তার ওপরও।
জরুরি কাজটি শুধু একের পর এক সংকট সামাল দেওয়া নয়; বরং যেসব পরিস্থিতি এসব সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলছে, সেগুলোর মূল কারণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।
সৈয়দ তোশারফ আলী : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও দ্য নিউ নেশন পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক
