লুলার বিজয় লাতিন আমেরিকার জন্য টার্নিং পয়েন্ট
Advertisement
গুইলাম লং
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আশি বছর বয়সে এসেও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা একটি অসাধারণ রাজনৈতিক বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর ছেলে ফ্ল্যাভিও বোলসোনারোর কাছে প্রথম রাউন্ডে ৪৭ শতাংশের বিপরীতে ৪৫ শতাংশ ভোটে পিছিয়ে পড়ার পর সব প্রতিকূলতা জয় করে লুলা দ্বিতীয় রাউন্ডের নির্বাচনে নাটকীয়ভাবে ৫১.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে দুর্দান্ত জয় নিশ্চিত করেছেন, যেখানে বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২ শতাংশ ভোট। তার এই বিজয় সব জনমত জরিপকে ভুল প্রমাণিত করেছে।
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশটিতে লুলার এই বিজয় কেবল ব্রাজিলে উগ্র ডানপন্থিদের ক্ষমতায় ফেরার পথই রুদ্ধ করেনি, এটি পুরো অঞ্চলে ডানপন্থি নির্বাচনি বিজয়ের ধারাবাহিকতাতেও ছেদ টেনেছে এবং পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপমূলক এজেন্ডায় এক বড় ধাক্কা দিয়েছে।
যদিও সরকার পতনের মুখে রয়েছে-এমন কোনো অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দেশটিতে মোটেও ছিল না। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ব্রাজিলের অথনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ক্রমাগতভাবে ৯.২ শতাংশ, যেখানে এর দক্ষিণ আমেরিকান প্রতিবেশী দেশগুলোতে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৫.৬ শতাংশ। ২০২২ সালে বেকারত্বের হার যেখানে ছিল ৯.৩ শতাংশ, তা ২০২৬ সালে নেমে আসে ৫.৪ শতাংশে। সাবেক বোলসোনারো প্রশাসনের আমলে ব্রাজিল জাতিসংঘের হাঙ্গার ম্যাপ বা ক্ষুধার মানচিত্রে পুনরায় ফিরে গেলেও ২০২৫ সালে দেশটি তা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্ত হয়। এছাড়া আমাজনে বন ধ্বংসের পরিমাণ গত দশকের তুলনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা তার পূর্বসূরীদের আমলের বিপরীত ধারার এক দারুণ ইতিবাচক পরিবর্তন।
অবশ্য লুলার প্রশাসনের সবকিছুই যে ত্রুটিহীন ছিল, তাও নয়। ব্রাজিলের লাখ লাখ মানুষ এখনো ক্রেডিট কার্ডের ঋণের জালে জড়িয়ে আছে এবং অত্যন্ত চড়া সুদের হারের সঙ্গে লড়াই করছে। অন্যদিকে অনলাইন জুয়ার প্রকোপ বহু পরিবারের জীবনযাত্রাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে রান-অফের ফলাফল একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল যে, সমাজে অসন্তোষ রয়েছে। অবশ্য লুলা অত্যন্ত সাহসী কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে এর জবাব দেন। যেমন, একটি বড় ধরনের ঋণ মওকুফের উদ্যোগ এবং অনলাইন জুয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, সেই সঙ্গে সামাজিক সুবিধার পরিধি বৃদ্ধি, জ্বালানি ভর্তুকি এবং ছয় দিনের কর্মদিবসকে কমিয়ে পাঁচ দিনের কর্মদিবসে রূপান্তর। এই নীতিগুলোর উদ্দেশ্য ছিল সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান ভোটারদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক উদ্বেগের মেলবন্ধন ঘটানো।
অন্যদিকে বোলসোনারো ব্রাজিলের জন্য একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপকল্প উপস্থাপন করেছিলেন। যেমন, ব্যাপক ব্যয় সংকোচন, বেসরকারীকরণ, কর হ্রাস এবং সর্বোপরি অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে লৌহমানবসুলভ প্রতিক্রিয়া। তার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল এল সালভাদরের কুখ্যাত কারাগার ব্যবস্থার আদলে পাঁচটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার নির্মাণ এবং সশস্ত্র অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অনুমোদন দেওয়া। বোলসোনারো আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ২০২২ সালের নির্বাচন পণ্ড করার ষড়যন্ত্রের দায়ে ২৭ বছরের সাজাপ্রাপ্ত তার পিতাকে তিনি ক্ষমা করবেন এবং ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার দায়ে দণ্ডিতদেরও সাধারণ ক্ষমা প্রদান করবেন। তার সমর্থকদের কাছে এটি ছিল তাদের ভাষায় বিচারিক নিপীড়নের শিকার হওয়ার প্রতিশোধ নেওয়ার একটি সুযোগ। কিন্তু তার বিরোধীদের কাছে এটি ছিল অভ্যুত্থান চেষ্টার পুনর্বাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি এক গুরুতর হুমকি।
লুলার নির্বাচনি প্রচারণা নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং বহু তরুণ ব্রাজিলিয়ান তৃণমূল পর্যায়ে এতে অংশ নেন। মেটার মতো সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টদের অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতিত্বও এই প্রচারণা সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়, যা মূলত বোলসোনারোর পক্ষে কাজ করছিল।
শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন কেবল ব্রাজিলের গণতন্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি দেশটির সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়। লুলার পুরো মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের রাজনীতিতে নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ, জাইর বোলসোনারোর বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারপতির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং তার ছেলের প্রার্থিতাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া।
এই পদবি বা তকমার প্রভাব নির্বাচনি রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এগুলো ওয়াশিংটন বর্ণিত তথাকথিত ‘মাদক-সন্ত্রাসবিরোধী’ যুদ্ধের অংশ হিসাবে ব্রাজিলের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক অভিযানের পথ উন্মুক্ত করতে পারে। বিশ্ব দেখেছে কীভাবে ঠিক এ ধরনের একটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের তকমা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল এবং দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করেছিল। যেখানে ট্রাম্প লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশটিকে ওয়াশিংটনের বর্ধিত ভূ-খণ্ডগত সামরিক আধিপত্যের জালে টানতে চান, সেখানে লুলা ব্রাজিলের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করে গেছেন। তিনি জোরালোভাবে বলেছেন, সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে সহযোগিতা অবশ্যই জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
রোববারের নির্বাচনি ফলাফল দেখিয়েছে, ব্রাজিলের জনগণ তাদের সঠিক পথ বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে লুলার এ বিজয় লাতিন আমেরিকার ডানপন্থি ঝোঁকের ক্ষেত্রে একটি বড় মোড় পরিবর্তন করতে পারে। বিষয়টি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে এই ফল আমেরিকা মহাদেশে ট্রাম্পের নেতৃত্বের শক্তিতে একটি বড় ধাক্কা দিতে পারে। আর্জেন্টিনায় প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে-যিনি নিয়মিত লুলার সমালোচনা করেন এবং বোলসোনারোর পক্ষে তার সব শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন-আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে পিছিয়ে পড়েছেন। চিলিতে প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তও জনসমর্থনের ক্ষেত্রে তীব্র পতনের মুখোমুখি হয়েছেন। অন্যদিকে মেক্সিকোর ক্লুডিয়া শেনবাম সম্ভবত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। লুলার পরাজয় ঘটলে মেক্সিকোর উত্তর দিকের প্রতিবেশীর দিকে ঝুঁকে পড়া এই অঞ্চলে তিনি আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেন। এর পরিবর্তে লাতিন আমেরিকার দুটি জনবহুল দেশ এবং বৃহত্তম অর্থনীতি আগামী দিনগুলোতে দৃঢ়ভাবে বামপন্থিদের হাতেই থাকছে।
যদিও এ অঞ্চলের ডানপন্থি ঝোঁক যে পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, তা ঘোষণা করার সময় এখনো আসেনি; তবে লুলার এই বিজয় এ সম্ভাবনাই জাগিয়ে তুলেছে যে, উগ্র ডানপন্থিদের এই ঢেউ হয়তো ইতোমধ্যেই তার শিখরে পৌঁছে নিচে নামতে শুরু করেছে। লুলার এই বিজয় হলো সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের জন্য ব্যয় করা তার সারাজীবনের লড়াইয়ের এক চূড়ান্ত স্বীকৃতি। আর এর তাৎপর্য ব্রাজিলের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূরে বিস্তৃত। গণতন্ত্র, বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক আইন, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং গ্লোবাল সাউথের সার্বভৌমত্বের প্রবক্তাদের জন্য এটি একটি শক্তিশালী বার্তা দেয় : উগ্র ডানপন্থিদের অগ্রযাত্রা অনিবার্যও নয়, অপরিবর্তনীয়ও নয়। ব্রাজিলে তো বটেই, পৃথিবীর কোথাও না।
আল জাজিরা থেকে অনূদিত
গুইলাম লং : সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সিনিয়র পলিসি অ্যানালিস্ট
