স্বাস্থ্য খাতে কী ঝুঁকি তৈরি করছে এআই
Advertisement
ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পর্কিত বিষয় পড়াই। এ বিষয়েই চিন্তা ও গবেষণা করি কয়েক বছর ধরে। আর এ গবেষণা যদি কোনোভাবে দেশের মানুষের কল্যাণে লাগে, তাহলেই সেটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। সম্প্রতি আমি একটি প্রশ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেছি। প্রশ্নটি হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঠিক কতটা সংবেদনশীল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা নিরাপদ? আমার চিন্তা শুরু হয়েছে বিশেষ করে সেসব সেবা খাতে বা ক্ষেত্রে, যেগুলো সরাসরি মানুষের সঙ্গে, মানুষের জন্য এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করে। এ তালিকার সেবা খাতে একেবারে শীর্ষে আছে স্বাস্থ্যসেবা। শুরুতেই আমার সিদ্ধান্তটি বলে রাখি : স্বাস্থ্য খাতে এআই নিয়ে যে গতিতে কথা হচ্ছে, সেই গতিতে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়, এবং সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পর্কিত উদ্ভাবন এখানে গ্রহণ করাও উচিত নয়।
প্রথমেই মূল কারিগরি প্রশ্নটি স্পষ্ট করে নিই। কারণ, এটি না বুঝলে বাকি আলোচনা অর্থহীন। স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর দিকে তাকিয়ে যা বোঝেন, সেই জ্ঞান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিখিয়ে দেওয়া যায় না। সেই জ্ঞান বইয়ে লেখা থাকে না, কম্পিউটারের ফাইলেও থাকে না। সেটি বছরের পর বছর হাজার হাজার রোগী দেখে তৈরি হওয়া এক ধরনের বোধ, যেখানে রোগীর মুখের ভাব, কণ্ঠের দুর্বলতা, পরিবারের ইতিহাস এবং এলাকার পরিচিত রোগবালাইসম্পর্কিত অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান কাজ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যা পারে তা হলো, এসব বিষয়ে কিছু সহায়তা এবং সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
এখানে ছোট্ট করে দুটি শব্দ বলে রাখা উচিত। কারণ, এ দুটি শব্দই পুরো সায়েন্স কমিউনিটিতে বিতর্কের কেন্দ্রে। প্রথমটি ‘ডিটারমিনিস্টিক’ বা নির্ধারিত পদ্ধতি, যার অর্থ হলো এআইকে একটি নির্দিষ্ট নকশা বা প্যাটার্ন চিনতে শেখানো, যেমন এক্স-রে ছবিতে ফুসফুসের একটি নির্দিষ্ট ধরনের ছায়া ও তার বড় বা ছোট হওয়ার ধারণ। নকশাটি চেনার পর যে কেউ একজন ফুসফুসের ডাক্তার হিসাবে বলতে পারে এ মুহূর্তে রোগীর অবস্থাটি কোন পর্যায়ে আছে। দ্বিতীয়টি ‘প্রোবাবিলিস্টিক’ বা সম্ভাবনানির্ভর পদ্ধতি, যেখানে সে বলে দিতে পারে এ রোগীর অবস্থা থেকে পরিস্থিতি কোনদিকে কতটা এগোতে পারে, কত শতাংশ সম্ভাবনা নিয়ে। তো লক্ষ করুন, এ দুটির কোনোটিই ‘বোঝা’ বা জ্ঞান সম্পর্কিত নয়। এগুলো হিসাবনির্ভর মাত্র। কারণ, নকশা চেনা আর রোগ বোঝা এক জিনিস নয়, আর এ পার্থক্যটুকুই স্বাস্থ্য খাতে বা রোগীর জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ কথাটি তাত্ত্বিক শোনালেও এর প্রমাণ হাতের কাছেই আছে এবং আমি মনে করি, প্রমাণটি যথেষ্ট ভয় ধরানো। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত হাসপাতালে সেপসিস নামের একটি প্রাণঘাতী সংক্রমণ আগেভাগে ধরার জন্য একটি বহুল ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থা চালু ছিল। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দাবি করেছিল এর নির্ভুলতা ০.৭৬ থেকে ০.৮৩। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ২০২১ সালের এ কাজে স্বাধীনভাবে ৩৮ হাজার ৪৫৫টি ভর্তির তথ্য যাচাই করে দেখলেন, এই এআই ব্যবস্থাটির বাস্তব নির্ভুলতা মাত্র ০.৬৩। যা হোক, সংখ্যাটির মানে বোঝা দরকার। এ পরিমাপে ১.০ মানে নিখুঁত, আর ০.৫ মানে কার্যত আন্দাজে বলার সমান। আরও গুরুতর বিষয় হলো, ব্যবস্থাটি সেপসিসে আক্রান্ত রোগীদের ৬৭ শতাংশকেই শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ হাসপাতালে ভর্তি সব রোগীর ১৮ শতাংশের ক্ষেত্রেই সে সতর্কবার্তা বাজিয়েছে।
একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ের সময় একসঙ্গে বহু রকম তথ্য মেলান। পরীক্ষার ফল, রোগীর বর্ণনা, চোখে দেখা লক্ষণ, বহু বছরের চিকিৎসা-ইতিহাস, নাড়ি ও রক্তচাপের ধারাবাহিক পরিবর্তন, এমনকি রোগীর পারিবারিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা। এসব তথ্য একত্র করে একজন বিশেষজ্ঞ যেভাবে দেখেন, সেভাবে দেখতে পারে এমন সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা গবেষণার সক্রিয় বিষয় বটে। কিন্তু এআই গবেষণাজগতে বাস্তবে তা এখনো অনেক দূরের পথ।
মানুষ এখন সাধারণ চ্যাটবটের কাছে নিজের উপসর্গ লিখে জানতে চাইছেন তার কী হয়েছে এবং আরোগ্য লাভের জন্য কোন ওষুধ খাওয়া উচিত। সাধারণ এআই চ্যাটবট কোনো চিকিৎসাযন্ত্র নয়। সেটি চিকিৎসার জন্য তৈরি হয়নি, চিকিৎসার মান যাচাইয়ের কোনো পরীক্ষা তাকে পাশ করতে হয়নি এবং ভুল বললে তার কোনো দায়ও নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের নির্দেশিকায় এ ঝুঁকিগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া, রোগীর আবেগ নিয়ে খেলা, গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া এবং সবচেয়ে গুরুতর যেটি-স্বাস্থ্যসেবা স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়া। আমাদের দেশে যেখানে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনা এখনো সহজ, সেখানে এই শেষ ঝুঁকিটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক।
অনেকে বলবেন, বাংলাদেশে চিকিৎসকের এত সংকট যে এআই যা-ই দিক, তা না থাকার চেয়ে ভালো। সংকটটি সত্যি বাস্তব কি না? গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রতি হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক আছেন ০.৮৩ জন, আর নার্সের প্রয়োজন যেখানে ৩ লাখ ১০ হাজার ৫০০ জন, সেখানে কর্মরত আছেন ৫৬ হাজার ৭৩৪ জন, অর্থাৎ প্রয়োজনের মাত্র ২৮ শতাংশ। কিন্তু আমার উত্তর হলো, এই সংকট যুক্তিটিকে উলটো দেয়। যেখানে রোগীর পাশে একজন বিশেষজ্ঞ দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে যন্ত্রের ভুল তিনি ধরে ফেলতে পারেন। আর যেখানে কোনো বিশেষজ্ঞ নেই, সেখানে যন্ত্রের ভুল সরাসরি রোগীর শরীরে গিয়ে পড়ে, কেউ তা ঠেকায় না। অর্থাৎ চিকিৎসকের অভাব যত বেশি, খারাপ এআইয়ের বা যন্ত্রের বিপদও তত বেশি, কম নয়।
আমাদের বাস্তবতা এ সতর্কতাকে আরও জরুরি করে তোলে। দেশে স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বড় অংশ এআই নিয়ে আগ্রহী, অথচ প্রকৃত ব্যবহারকারীর সংখ্যা এর তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ আগ্রহ আছে, কিন্তু দরকারি প্রস্তুতি নেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে এআই প্রকল্পের একটি পরিচিত রোগ আছে, যাকে গবেষকরা বলছেন পাইলট-রোগ। এটি ছোট পরিসরের পরীক্ষামূলক প্রকল্প চমৎকার ফল দেয়, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে কখনো পৌঁছায় না। কারণগুলোও চেনা : বিচ্ছিন্ন তথ্যব্যবস্থা, বিদেশি অনুদান ফুরিয়ে গেলে খরচ চালাতে না পারা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, চিকিৎসক ও রোগীর অনাস্থা, এবং গ্রামীণ হাসপাতালে কম্পিউটারে এআই অ্যাপ চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অভাব। গবেষকদের সিদ্ধান্তটি আমার নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মেলে। স্বাস্থ্য খাতে এআই ছড়িয়ে দেওয়ার আসল কাজটি অ্যালগরিদম বা নতুন এআই-এর বা যন্ত্রের প্রমাণ করা নয়, বরং এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা যা অ্যালগরিদমের বা যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের সেবায় কাজ করতে পারে।
বিষয়টিকে আমি একটি ছবির মধ্যে দাঁড় করাতে চাই। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন নারী এসেছেন বুকে ব্যথা নিয়ে। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, আছে একটি এআই সহায়ক যন্ত্র, যেটি তৈরি হয়েছে ইংল্যান্ডে, যেখানে যন্ত্রটিকে ইউরোপের রোগীদের তথ্য দিয়ে ট্রেনিং করানো হয়েছিল। যা হোক যন্ত্রটি বলল, ঝুঁকি কম। এখন প্রশ্ন হলো, এ সিদ্ধান্তটি কে যাচাই করবে? কে জানবে যে এই এআই যন্ত্র আমাদের জনগোষ্ঠীতে কখনো পরীক্ষা করা হয়নি? আর যদি সিদ্ধান্তটি ভুল হয়, তার দায় কার? এ তিনটি প্রশ্নের উত্তর যতদিন আমাদের হাতে নেই, ততদিন স্বাস্থ্য খাতে এআই চালিত বা সম্পর্কিত যন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার তাড়াহুড়া আমাদের সাহায্য নয়, বরং ক্ষতি করবে।
শেষ কথাটি আমি সরাসরি বলতে চাই। আমি স্বাস্থ্যসেবায় এআই-এর বিরুদ্ধে নই, তবে স্বাস্থ্য খাত এমন একটি জায়গা যেখানে প্রযুক্তি ব্যাবহারের উৎসাহের চেয়ে সতর্কতা বেশি দরকার। এবং যেখানে ‘এটি কাজ করে’ বলার আগে প্রমাণ করতে হয় ‘এটি আমাদের মানুষের জন্য কাজ করে’, সেই প্রমাণের দায়িত্ব নেওয়ার মতো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান আমাদের গড়ে তুলতে হবে, আর সেটি যত আগে হয় ততই মঙ্গল।
ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অব বিজনেস এনালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া; ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম
