সড়ক আইন : রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার ও আমাদের দায়িত্ব
Advertisement
লিটন এরশাদ
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সড়ক মানুষের চলাচলের পথ, জীবিকার অবলম্বন এবং দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই সড়ক যখন প্রতিদিন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, পরিবারকে শোকের মধ্যে ঠেলে দেয় এবং অসংখ্য মানুষকে স্থায়ীভাবে আহত করে, তখন সড়ক নিরাপত্তা আর কেবল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয় থাকে না। এটি হয়ে ওঠে জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। দুর্ঘটনার পর শোক, ক্ষোভ, তদন্ত ও আশ্বাস তৈরি হয়; কিন্তু কিছুদিন পর একই ঝুঁকি আবার ফিরে আসে। এ চক্র ভাঙতে হলে শুধু দুর্ঘটনার পর দায়ী চালককে শাস্তি দিলেই চলবে না। দেখতে হবে কেন দুর্ঘটনা ঘটল, রাস্তার নকশায় ত্রুটি ছিল কি না, যানবাহনটি চলার উপযোগী ছিল কি না, চালক যথেষ্ট বিশ্রাম পেয়েছিলেন কি না, গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল কি না, পথচারীর নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার ব্যবস্থা ছিল কি না এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছেছিল কি না। নিরাপদ সড়ক গড়ার কাজ শুরু হয় দুর্ঘটনার আগেই, দুর্ঘটনার পর ন্যায়বিচার ও দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সেই ব্যবস্থার অংশ।
২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন মানুষের নিরাপদে চলাচলের অধিকারের দাবিকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এনেছিল। সেই আন্দোলনের পর সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮ প্রণীত হয়। আইনটিতে যানবাহন, চালনা, লাইসেন্স, ফিটনেস, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, গতিসীমা ও সড়ক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিধান রয়েছে; কিন্তু আইন থাকা এবং আইন কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ বা লাইসেন্সবিহীন চালক, অতিরিক্ত গতি, চালকের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিরাপদ সড়ক পারাপার এবং দুর্বল নজরদারির মতো সমস্যা এখনো উদ্বেগের কারণ। তাই বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ কোথায় দুর্বল, কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কী করছে এবং আইন ভাঙলে বিচার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে-এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
সড়ক পরিবহণ আইন একটি প্রয়োজনীয় ভিত্তি, তবে সড়ক নিরাপত্তার সব দিক একসঙ্গে দেখার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন দরকার। নিরাপত্তা শুধু চালকের আচরণ বা গাড়ির কাগজপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সড়কের নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহনের নিরাপত্তামান, গতি ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহণ পরিচালনা, চালকের প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা, পথচারী ও সাইকেল আরোহীর অধিকার, দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ এবং দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা সবকিছুকে সমন্বিত কাঠামোয় আনতে হবে। আইনে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, পরিবহণ মালিক ও পরিচালনাকারী, চালক এবং সড়ক ব্যবহারকারীর দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা দরকার।
সড়ক নিরাপত্তায় পাঁচটি প্রধান ঝুঁকির কারণকে গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা জরুরি : অতিরিক্ত গতি, মদ্যপ বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, সিটবেল্ট না বাঁধা এবং শিশুদের জন্য উপযুক্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকা। এগুলোকে শুধু ব্যক্তিগত অসতর্কতা বলে পাশ কাটানো যাবে না।
জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনায় পাঁচটি স্তম্ভের কথাও বলা হয়েছে : সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ সড়ক ও চলাচল, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর কার্যকর সাড়া। প্রথম স্তম্ভে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, আইন, পরিকল্পনা ও জবাবদিহি প্রয়োজন। দ্বিতীয় স্তম্ভে ফুটপাত, পারাপার, সাইকেল চলাচল ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নিরাপদ করতে হবে। তৃতীয় স্তম্ভে যানবাহনের ফিটনেস ও নিরাপত্তামান নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থ স্তম্ভে চালক, যাত্রী, পথচারীসহ সবার প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ আচরণে গুরুত্ব দিতে হবে। পঞ্চম স্তম্ভে উদ্ধার, অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। পাঁচটি স্তম্ভকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করলেই টেকসই পরিবর্তন আসবে।
চালক ও পরিবহণ শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মপরিবেশ সড়ক নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। দীর্ঘ সময় বিশ্রাম ছাড়া গাড়ি চালানো, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশ চালককে ঝুঁকিতে ফেলে; একই সঙ্গে যাত্রী ও অন্য সড়ক ব্যবহারকারীর জীবনও বিপন্ন করে। তাই চালকের কাজের সময় ও বিশ্রাম নির্ধারণ, যথাযথ নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এবং মালিক ও পরিবহণ পরিচালনাকারীদের দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনা তদন্তে চালকের তাৎক্ষণিক ভুলের পাশাপাশি গাড়ির অবস্থা, কর্মঘণ্টা এবং পরিচালনাগত সিদ্ধান্তও যাচাই করা উচিত।
কার্যকর নীতি তৈরির জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য অপরিহার্য। দুর্ঘটনা কোথায়, কখন, কী কারণে ঘটছে, কারা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন এবং কোন সড়কে প্রাণহানি বেশি এসব তথ্য এক জায়গায় সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। পুলিশ, বিআরটিএ, হাসপাতাল, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকারের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা ও অগ্রগতি মাপা কঠিন।
এজন্য অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনসমক্ষে জানাতে হবে। আইন প্রণয়নের কাজ কোন পর্যায়ে, খসড়া কবে প্রস্তুত হবে, জনমত কীভাবে নেওয়া হবে, কোন সংস্থা কোন কাজের দায়িত্বে থাকবে এবং কত অর্থ বরাদ্দ হবে-এসব তথ্য প্রকাশ করা দরকার। পরিবহণ, স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও অর্থ-পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আইন তৈরির আগে চালক, পরিবহণ শ্রমিক ও মালিক, যাত্রী, পথচারী, সাইকেল আরোহী, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধি, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক ও নাগরিক সংগঠনের মতামত নিতে হবে।
সরকারের প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে জবাবদিহির ওপর। প্রতি বছর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির প্রবণতা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সংশোধনের কাজ, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহারের অবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা পৌঁছানোর সময় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। লক্ষ্য পূরণ না হলে কারণ ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ জানানোও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে। শুধু দুর্ঘটনার মোট সংখ্যা নয়, গুরুতর আহতের সংখ্যা, নিরাপদ পারাপারের সুযোগ, জরুরি সেবার সক্ষমতা এবং যানবাহনের নিরাপত্তাও অগ্রগতির সূচক হতে পারে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা নির্ণায়ক। আইন প্রয়োগ যেন কোনো গোষ্ঠীর চাপ, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাব বা প্রশাসনিক উদাসীনতায় থেমে না যায়। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, চালকের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক মেরামত, নিরাপদ পারাপার এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা এসব বিষয়ে ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত বাজেট, দক্ষ জনবল ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব কেবল আন্তর্জাতিক বৈঠকে অঙ্গীকার করা নয়, দেশের মানুষের সামনে সেই অঙ্গীকারের বাস্তব ফল দেখানোও।
দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক মিনিট জীবন বাঁচানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মহাসড়ক ও শহরে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং কাছাকাছি হাসপাতালের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক বা প্রশাসনিক কারণে জরুরি সেবা বিলম্বিত হওয়া চলবে না। দুর্ঘটনার শিকার পরিবারকে তথ্য, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ সহজ করতে হবে। উদ্ধার থেকে পুনর্বাসন পর্যন্ত দায়িত্ব কার-তা আইন ও নীতিতে নির্দিষ্ট থাকা প্রয়োজন।
একটি দুর্ঘটনা শুধু পরিসংখ্যান নয়, তার পেছনে থাকে একজন মানুষের জীবন, একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি। তাই সড়কে মৃত্যু কমানোকে প্রশাসনিক লক্ষ্য বা প্রচারণার বিষয় হিসাবে দেখলে চলবে না। এটিকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, উন্নয়ন-অঙ্গীকার এবং নাগরিক অধিকার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন, বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ, শক্তিশালী ডাটা সেল, নিরাপদ অবকাঠামো, দায়িত্বশীল পরিবহণব্যবস্থা, দ্রুত জরুরি চিকিৎসা এবং নিয়মিত জবাবদিহি এসব উদ্যোগ একসঙ্গে এগোলে জাতিসংঘের কর্মদশা ও এসডিজির লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব। ২০২৭ সালের মধ্যে আইন প্রণয়ন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাণহানি কমানোর সরকারি অঙ্গীকার যেন পরিমাপযোগ্য কাজে পরিণত হয়-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লিটন এরশাদ : মহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই
