নিউইয়র্কের চিঠি
বদলে যাচ্ছে ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ
Advertisement
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্র্রের মধ্যমেয়াদি নির্বাচন বদলে দিতে পারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ। ডেমোক্রেটদের হাতে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে, তা প্রায় নিশ্চিত। সিনেটের নিয়ন্ত্রণও ডেমোক্রেটরা নিতে পারে, এমন সম্ভাবনা ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের চরম উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। যদিও সিনেট আসনগুলোর ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ডেমোক্রেটদের জন্যও কঠিন; কিন্তু বিভিন্ন সংস্থার জরিপে স্পষ্ট, কংগ্রেশনাল আসনে ডেমোক্রেটরা রিপাবলিকানদের চেয়ে ভালো ব্যবধানে এগিয়ে আছে। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল ম্যানেজমেন্টের প্রফেসর টড বেল্টের মতে, ১৯৪৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যতগুলো মধ্যমেয়াদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে গড়ে ২৬.৫টি আসন এবং সিনেটেও কিছু আসন হারিয়েছে। সব হিসাব-নিকাশ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিকূলে।
হাউজে ডেমোক্রেট পার্টির জয়লাভের সম্ভাবনা বিগত নির্বাচনগুলোর চেয়ে বেশি। বর্তমানে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ডেমোক্রেটদের আসন সংখ্যা ২১৪। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যে কোনো দলকে ২১৮ আসন পেতে হবে। জরিপগুলোতে বলা হয়েছে, ডেমোক্রেটরা নিশ্চিতভাবে ২২০ আসন পেতে যাচ্ছে এবং এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে একই জরিপে বলা হচ্ছে, সিনেটে দুই দলের প্রার্থীদের মাঝে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে যাচ্ছে। সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ৫৩, ডেমোক্রেটদের ৪৫। দুজন স্বতন্ত্র সিনেটর ডেমোক্রেট ককাসে যোগ দেওয়ার কারণে ডেমোক্রেটদের আসনসংখ্যা এখন ৪৭। এবারের নির্বাচনে সিনেটের মোট ৩৫ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ আসনগুলোর মধ্যে রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ২০ এবং ডেমোক্রেটদের ১৫। দশটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এ দশ আসনে ডেমোক্রেটরা এগিয়ে আছে। তবে প্রার্থীদের মাঝে ব্যবধান খুব সামান্য। যদি তারা নিজেদের আসনগুলো ধরে রেখে মাত্র ৪টি আসন নিজেদের দখলে নিতে পারে, তাহলে সিনেটে ডেমোক্রেটদের আসনসংখ্যা হবে ৫১। কিন্তু দুই দলের আসনসংখ্যা ৫০-৫০ হলে সিনেট চেয়ারম্যান রিপাবলিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ভোটে সিনেটের ভারসাম্য রিপাবলিকানদের অনুকূলে যাবে।
মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে সিনেটর প্রার্থী ডা. আল-সায়েদ একজন মুসলিম। সেখানে একজন মুসলিম রাজনীতিকের উত্থানকে সহজভাবে নিতে পারছে না রক্ষণশীলরা। মিশিগানের আসনটি মূলত ডেমোক্রেটদের। কিন্তু রক্ষণশীল ও ‘এআইপিসি’ বা ‘আমেরিকা ইসরাইল পার্টনারশিপ কমিটি’ একাট্টা হয়ে ডা. আল-সায়েদের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। ‘এআইপিসি’ যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী লবিস্ট সংগঠন এবং সিটেনের ওই আসনে ডেমোক্রেট প্রার্থী সায়েদকে পরাজিত করতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে। মিশিগানের রিপাবলিকান সিনেটর প্রার্থী মাইক রজার্স বিভিন্ন জরিপে ডেমোক্রেট প্রার্থী আল-সায়েদের চেয়ে ৪ শতাংশ ভোটে পিছিয়ে আছেন।
টেক্সাস ঐতিহাসিভাবে একটি রিপাবলিকান স্টেট। রেড স্টেটখ্যাত টেক্সাসে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের মোট ৩৮টি আসনের মধ্যে ডেমোক্রেট সদস্যসংখ্যা মাত্র ১৩। সিনেটের দুটি আসনেও বিগত ছয়টি নির্বাচনে প্রতিবার রিপাবলিকান প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছেন। বিগত ৬২ বছরের ইতিহাসে টেক্সাসের সিনেট আসনে ডেমোক্রেটরা মাত্র ৫ বার জয়ী হয়েছিল। ১৯৮৮ সালের পর টেক্সাসে কোনো ডেমোক্রেট প্রার্থী সিনেটে নির্বাচিত হতে পারেননি। ৩৮ বছর পর এবার তারা সেখানে চমক দেখাতে পারে। টেক্সাসে ডেমোক্রেট সিনেটর প্রার্থী জেমস তালারিকো রিপাবলিকান প্রার্থী ক্যান প্যাক্সটনের চেয়ে এগিয়ে আছেন। যদিও বিভিন্ন জরিপে উভয় দলের প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ২ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে। তবে টেক্সাসের সিনেট আসনে ডেমোক্রেটরা আশাবাদী।
মঙ্গলবারের মধ্যমেয়াদি নির্বাচনের ফলাফল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে। ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের যে কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের আগামী দুই বছরের কর্মসূচি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং তার প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়বে। এজন্য ৪৩৫ আসনের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ডেমোক্রেটদের ২১৮ আসনে জয়ী হতে হবে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হাউজের ২১৮ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। ডেমোক্রেটরা তিনটি আসনে পিছিয়ে ছিল। হাউজের নিয়ন্ত্রণ নিতে বিগত নির্বাচনে প্রাপ্ত আসনের চেয়ে মোট ৪টি আসনে বিজয়ী হতে হবে এবং জরিপগুলো বলছে, ডেমোক্রেটরা অনায়াসে তা হাসিল করবে।
কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, তারা সেই কক্ষের স্পিকার ও কমিটিগুলোর প্রধান নির্বাচন করে। তারাই আইন প্রণয়নের বিষয়গুলো নির্ধারণ এবং নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারির মূল কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা পায়। অন্যদিকে, সিনেটের মূল কাজ হলো প্রেসিডেন্ট বিচারক, কেবিনেট কর্মকর্তা, রাষ্ট্রদূত ও অন্যান্য পদে যেসব ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেন, সেসব মনোনয়ন অনুমোদন দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র যেসব আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন করে, তা বিবেচনা করা। যে কোনো আইনের বিল প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানোর আগে কংগ্রেসের উভয়কক্ষে পাশ হওয়া বাধ্যতামূলক। যদি হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেট দুটি ভিন্ন দলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, সেক্ষেত্রে নীতিগত দ্বন্দ্বে আইন পাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ডেমোক্রেটরা যদি কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের কাজকর্মে জবাবদিহি ও তদারকি বৃদ্ধি পাবে। ট্রাম্পের নিজ দল, অর্থাৎ রিপাবলিকান পার্টি যদি উভয়কক্ষে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারে, তাহলে হোয়াইট হাউজের নীতি বাস্তবায়নের পথ সহজ হবে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দল জয়ী হলেও তারা প্রেসিডেন্টকে পদচ্যুত করতে পারে না। তবে ট্রাম্প তার মেয়াদের অবশিষ্ট দুই বছর বর্তমান সময়ের মতো স্বচ্ছন্দে কাটাতে পারবেন কিনা এবং পদে পদে তাকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে কিনা, তা নির্ধারিত হবে মঙ্গলবারের নির্বাচনে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কংগ্রেসের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের ৪৩৫ আসন এবং সিনেটের ৩৫ আসন; অর্থাৎ মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের ৪৭০টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আসনগুলোতে প্রার্থী হয়েছেন মোট ২৪৯৭ জন। ২০১৪ সালের পর কংগ্রেসের যে কোনো নির্বাচনে এবারই সর্বোচ্চসংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনি প্রচারে প্রার্থীদের ব্যয় দাঁড়াবে ১১.৬ বিলিয়ন ডলার। এ বিপুল ব্যয়ের অধিকাংশই হবে বিজ্ঞাপনের পেছনে। ২০২২ সালের মধ্যমেয়াদি নির্বাচনে বিজ্ঞাপন খাতে প্রার্থীদের ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৮.৯ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয়, মঙ্গলবারের নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের সম্মিলিত ব্যয় ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারণায় যে ব্যয় হয়েছিল, তা ছাড়িয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই দিনে ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর এবং অঙ্গরাজ্যের আইনসভাগুলোর ৬১৩৯টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্টেট গভর্নর নির্বাচনেও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। অ্যাডইমপ্যাক্ট নামে একটি সংস্থা আভাস দিয়েছে, শুধু ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনের প্রাথমিক পর্বেই বিজ্ঞাপন খাতে প্রার্থীরা ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচন ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল গভর্নর নির্বাচন হিসাবে রেকর্ড সৃষ্টি করবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত ভোটার সংখ্যা ২১ কোটি। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ভোটার সংখ্যা ছিল ১৭ কোটি ৪০ লাখ এবং প্রদত্ত ভোটের হার ছিল ৬৫.৩ শতাংশ।
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : সিনিয়র সাংবাদিক
