হরমুজ খুললেও কাটছে না জ্বালানি সংকট, কবে কমবে পেট্রল-ডিজেলের দাম?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবারও চলাচল শুরু করেছে তেলবাহী জাহাজ। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে স্বস্তি ফিরছে না। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বেড়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, আর ডিজেলের দামও রেকর্ড পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে।
জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে শুধু যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাই দায়ী নয়। তেল পরিবহনের ব্যয় বৃদ্ধি, জাহাজের বিমার বাড়তি প্রিমিয়াম, নাবিকদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক এবং বিভিন্ন দেশের শোধনাগারে হামলার কারণে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের সূত্র ধরে শুরু হওয়া সরবরাহ সংকট এখন বৃহত্তর জ্বালানি সংকটে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যক্তিগত গাড়ির চালক থেকে শুরু করে ট্রাকমালিক, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর। উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে জ্বালানি পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়লেও দাম দ্রুত কমছে না।
হরমুজ প্রণালি সচল, তবু কেন দাম কমছে না?
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছায়।
ইরান যুদ্ধের কারণে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সংঘাতের আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি।
জ্বালানি বিশ্লেষক জান স্টুয়ার্টের মতে, সংঘাতের অবসান ঘটেনি, প্রতিষ্ঠিত হয়নি স্থায়ী শান্তিও। ফলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জাহাজ ভাড়া, বিমা ও নাবিকদের পারিশ্রমিক বেড়েছে। অর্থাৎ, বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়লেও সেটি নিরাপদে পরিবহন করে গন্তব্যে পৌঁছাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে জ্বালানির চূড়ান্ত দামে।
তেলবাহী জাহাজের দৈনিক ভাড়া ১৬ লাখ ডলার
জ্বালানি পরিবহনের ব্যয় বৃদ্ধির বড় উদাহরণ হলো বিশাল তেলবাহী জাহাজের ভাড়া। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লার্কসনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পারস্য উপসাগর থেকে চীনে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে একটি বড় জাহাজের দৈনিক ভাড়া ছিল প্রায় ৬৫ হাজার ডলার। ইরান যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ডলারে।
কিন্তু বর্তমানে একই পথে একটি জাহাজ ভাড়া করতে দৈনিক প্রায় ১৬ লাখ ডলার পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ টম ক্লোজা এই ভাড়াকে অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, যুদ্ধের কারণে জাহাজের ক্ষতি না হলে জাহাজমালিকদের বিপুল মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে ঝুঁকিও কম নয়। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনাকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিতে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যা পরিবহন ব্যয় কমতে দিচ্ছে না।
বিমা ও নাবিকদের পারিশ্রমিকেও বড় ধাক্কা
যুদ্ধকবলিত জলপথে জাহাজ পরিচালনার জন্য নাবিকদের রাজি করানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে সম্মত হওয়ায় তাদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নাবিকদের প্রতি যাত্রায় ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অর্থ একজন নাবিকের এক বছরেরও বেশি সময়ের বেতনের সমান হতে পারে।
একই সঙ্গে বেড়েছে জাহাজের বিমা খরচ। যুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তেল পরিবহনের জন্য বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেশি অর্থ দাবি করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া-আসার একটি পূর্ণ যাত্রায় তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ব্যয় ৩ থেকে ৪ কোটি ডলার পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
টম ক্লোজার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগে পারস্য উপসাগর থেকে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনে প্রায় ২ ডলার খরচ হতো। বর্তমানে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
পরিবহনের এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত তেল ও জ্বালানির দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সাধারণ ভোক্তারা দ্রুত স্বস্তি পাচ্ছেন না।
বাস্তব তেলের দাম ও ফিউচারসের দামে বড় ব্যবধান
জ্বালানি বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, ভবিষ্যতে তেল কেনাবেচার চুক্তির দাম এবং বাস্তবে সরবরাহযোগ্য অপরিশোধিত তেলের দামের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়া।
ব্রেন্ট ফিউচারস মূলত ভবিষ্যতে তেল কেনাবেচার চুক্তিভিত্তিক মূল্য নির্দেশ করে। অন্যদিকে, ডেটেড ব্রেন্ট হলো নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবে সরবরাহযোগ্য অপরিশোধিত তেলের বাজারদর।
সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ডেটেড ব্রেন্টের দাম প্রতি ব্যারেল ১৩৫ দশমিক ৭৪ ডলারে পৌঁছেছিল। বিপরীতে, ব্রেন্ট ফিউচারসের দাম ছিল প্রায় ১০০ ডলার।
এই ব্যবধানের অর্থ হলো, ভবিষ্যতে তেল কেনার চুক্তিতে যে দাম দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে সরবরাহযোগ্য তেল সংগ্রহ করতে তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় হতে পারে। পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের ঝুঁকি এই পার্থক্যের অন্যতম কারণ। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে পেট্রল ও ডিজেলের বাজারেও।
রাশিয়া ও লোহিত সাগরের সংকটও বাড়াচ্ছে চাপ
বিশ্ববাজারে জ্বালানির সংকট শুধু হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক নয়। একই সময়ে একাধিক সংঘাত তেল ও ডিজেলের সরবরাহব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বড় ডিজেল রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রপ্তানি সীমিত করেছে। চীনও নিজেদের বাজারে জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ বজায় রাখতে রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোও উৎপাদনের সর্বোচ্চ সক্ষমতার কাছাকাছি রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কিছু শোধনাগারে উৎপাদন কমানো হচ্ছে। আবার দেশটির উপসাগরীয় উপকূলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহন আরও ব্যাহত হতে পারে।
কমে যাচ্ছে জ্বালানির মজুত
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ সাধারণত বাণিজ্যিক ও জরুরি মজুত ব্যবহার করে। সরবরাহ কমে গেলে এই মজুত বাজারে জ্বালানির ঘাটতি সামাল দিতে সাহায্য করে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সংকটে বিভিন্ন দেশের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় নতুন কোনো বিপর্যয় মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
জান স্টুয়ার্টের মতে, বর্তমানে বিশ্ব জ্বালানির তুলনামূলক কম মজুত নিয়ে চলছে। সংকটের সময় সরবরাহ ধরে রাখার জন্য যে সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন, সেটিও আগের তুলনায় দুর্বল।
মজুত কম থাকলে সরবরাহে সামান্য ঘাটতিও বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পরও দাম কমতে সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪.৩৬ ডলার
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। দেশটিতে পেট্রলের জাতীয় গড় দাম প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ৩৬ ডলারে পৌঁছেছে। অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, বছরের এই সময়ে এর আগে এত বেশি দাম দেখা যায়নি।
ডিজেলের দামও গত মাসে নির্ধারিত সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু ট্রাক ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ায় না; কৃষিকাজ, খাদ্য উৎপাদন এবং বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করার খরচও বাড়িয়ে দেয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পড়তে পারে।
কবে কমবে পেট্রল-ডিজেলের দাম?
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়াই জ্বালানির দাম কমার জন্য যথেষ্ট নয়। স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ হওয়া প্রয়োজন।
- যুদ্ধের ঝুঁকি কমতে হবে: গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল নিরাপদ হলে পরিবহন ও বিমার ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হবে।
- শোধনাগারের উৎপাদন বাড়াতে হবে: ক্ষতিগ্রস্ত শোধনাগারগুলো সচল হওয়া এবং উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়া জরুরি।
- জ্বালানির মজুত পুনর্গঠন করতে হবে: সরবরাহে নতুন কোনো বিঘ্ন ঘটলে বাজার সামাল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত মজুত প্রয়োজন।
- পরিবহন ব্যয় কমতে হবে: জাহাজের ভাড়া, নাবিকদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ও বিমার খরচ স্বাভাবিক না হলে জ্বালানির দামে দ্রুত স্বস্তি আসা কঠিন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ টম ক্লোজার ধারণা, চলমান সংঘাতগুলোর অন্তত দুটি শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
সূত্র: সিএনএন
