Logo
Logo
×

Advertisement

বিনোদন

‘কন্ট্রোল উদয়’—যে চরিত্রে নানা পাটেকার হয়ে উঠেছিলেন নতুন প্রজন্মের হিরো

Advertisement

Icon

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৫ এএম

‘কন্ট্রোল উদয়’—যে চরিত্রে নানা পাটেকার হয়ে উঠেছিলেন নতুন প্রজন্মের হিরো

‘উদয় শেঠি’ চরিত্রে নানা পাটেকার। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

বলিউডের বর্ষীয়ান ও জনপ্রিয় অভিনেতা নানা পাটেকার মারা গেছেন। আজ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) গোয়ার একটি হাসপাতালে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৭৫ বছর।  তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আট থেকে ৮০—সব বয়সি ভক্তরাই তার সেরা কাজগুলো খুঁজে দেখতে শুরু করেছেন। তবে নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকের কাছে নানা পাটেকারের পরিচয়ের শুরুটা তার গুরুগম্ভীর চরিত্র দিয়ে নয়; বরং ‘ওয়েলকাম’ সিনেমার ‘উদয় শেঠি’ চরিত্র দিয়ে।

ফোন, রিলস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বেড়ে ওঠা জেন-জি’দের কাছে তিনি আগে ‘উদয় শেঠি’,পরে গম্ভীর চরিত্রের শক্তিশালী অভিনেতা নানা পাটেকার। 

‘ওয়েলকাম’ সিনেমার গল্প

‘ওয়েলকাম’ মুক্তি পায় ২০০৭ সালের ২১ ডিসেম্বর। ছবিটি পরিচালনা করেন আনিস বাজমি। রাজীব কউল ও প্রফুল্ল পারেখের সঙ্গে মিলে ছবিটির চিত্রনাট্যও লেখেন তিনি। প্রযোজনা করেন ফিরোজ নাদিয়াদওয়ালা।

সিনেমায় অভিনয় করেন ক্যাটরিনা কাইফ, অক্ষয় কুমার, অনিল কাপুর, পরেশ রাওয়াল ও নানা পাটেকর। অতিথি চরিত্রে ছিলেন সুনীল শেঠি।

গল্পটি খুব সহজ। উদয় শেঠি দুবাইভিত্তিক এক গ্যাংস্টার। তার একমাত্র চিন্তা—বোন সঞ্জনার বিয়ে দেওয়া। কিন্তু কোনো পরিবারই অপরাধী পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক করতে রাজি নয়। উদয়ের সহযোগী মজনু ভাই একসময় রাজীব নামের এক যুবককে খুঁজে বের করেন এবং তাকে এই বিয়েতে রাজি করানোর চেষ্টা করেন।

রাজীবের মামা ড. ঘুংরু শর্ত দেন, উদয় ও মজনুকে অপরাধের জগৎ ছাড়তে হবে। এরপর রাজীব ও সঞ্জনা উদয়কে অভিনয়ের দিকে এবং মজনুকে ছবি আঁকার দিকে ঠেলে দেয়। দুই গ্যাংস্টারই তখন শিল্পচর্চায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আর অপরাধের বিষয়টি চলে যায় পেছনে।

‘ওয়েলকাম’ ২০০৭ সালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় করা বলিউড সিনেমা ছিল। ২০০৯ সালে মৃত্যুর আগে এটিই ছিল অভিনেতা ফিরোজ খানের শেষ সিনেমা। ছবিতে তিনি আরডিএক্স চরিত্রে অভিনয় করেন।

নানা পাটেকরকে নিয়ে ঝুঁকি

নানা পাটেকর তখন ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’ ও ‘আব তক ছাপ্পান’-এর মতো মতো গম্ভীর ও কঠিন চরিত্রের জন্য পরিচিত। সেই অভিনেতাকে একজন হাস্যরসাত্মক গ্যাংস্টারের চরিত্রে নেওয়া ছিল বড় ধরনের ঝুঁকি।

পরবর্তী সময়ে ‘দ্য কপিল শর্মা শো’-তে আনিস বাজমি জানান, শুরুতে নানা পাটেকার চিত্রনাট্যই শুনতে চাননি। তিনি পরিচালকের কাছে তার মায়ের নামে প্রতিশ্রুতি চেয়েছিলেন। এরপর প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চিত্রনাট্য শোনানোর পর নানা পাটেকার বাজমিকে জড়িয়ে ধরেন।


এদিকে ‘মজনু ভাই’ নামটি প্রস্তাব করেছিলেন অনিল কাপুর। এভাবেই উদয় ও মজনুর জুটি তৈরি হয়। নানা পাটেকারের অভিনয় ২০০৮ সালের বিভিন্ন পুরস্কারের তালিকায় সেরা কমেডি অভিনেতা ও সেরা পার্শ্ব অভিনেতার বিভাগে জায়গা করে নেয়। যে ধরনের চরিত্রে তাকে দর্শক আগে কখনো ভাবেনি, সেই চরিত্রের জন্যই তিনি পুরস্কৃত হন।

গম্ভীর মুখই হয়ে উঠেছিল হাসির মূল কারণ

‘উদয় শেঠি’ চরিত্রটি এত জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল নানা পাটেকারের অভিনয়ের ধরন। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মজা করার চেষ্টা করেননি। বরং ‘উদয়’ নিজেকে সত্যিকারের ভয়ংকর মানুষ মনে করে—এমনভাবেই চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছেন। অথচ তার চারপাশের পরিস্থিতি ছিল হাস্যকর।

এই পার্থক্যই তৈরি করেছে ছবির মূল হাস্যরস। আগের সিনেমায় যে মানুষটির উপস্থিতি পর্দার খলনায়কদের ভয় ধরিয়ে দিত, ‘ওয়েলকাম’-এ সেই মানুষটিই নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে চিন্তিত। সে চায় মানুষ তাকে ভালোবাসুক, আবার অভিনেতাও হতে চায়।

একটি দৃশ্যে উদয় প্রথমবার অভিনয় করতে যায়। একটি সাধারণ ও হাস্যকর সংলাপকে সে এমন আবেগ দিয়ে বলে, যেন সেটি কোনো মহাকাব্যের কবিতা। তার অতিরিক্ত গম্ভীর অভিনয়ই দৃশ্যটিকে আরও মজার করে তোলে।

আরেকটি দৃশ্যে পৌরসভার কমিশনার উদয়কে জানায়, তার অবৈধ বাড়ি ভেঙে দেওয়া হবে। সেখানে উদয়ের হাতে কোনো বন্দুক নেই। আছে শুধু তার ভয়ংকর ভাবমূর্তি। কিন্তু সেই ভাবমূর্তিও তখন কোনো কাজে আসে না।

ছবিতে এমন একজন চরিত্রও আছে, যে উদয়ের হয়ে মানুষকে ভয় দেখায়, অথচ তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই। সে শুধু উদয়-মজনু কতটা ভয়ংকর, সেই গল্প বলে মানুষকে আতঙ্কিত করে। এই জগতের প্রধান হিসেবে নানা পাটেকরকে দেখা যায় একেবারে শান্ত ও স্থির ভঙ্গিতে।

 ‘কন্ট্রোল উদয়’ থেকে মিমের দুনিয়ায়

‘ওয়েলকাম’-এর সবচেয়ে জনপ্রিয় সংলাপগুলোর একটি হলো—‘কন্ট্রোল উদয়!’মাত্র দুই শব্দের এই সংলাপ সহজেই জায়গা করে নিয়েছে স্ক্রিন, স্টিকার কিংবা ক্যাপশনে।

পরবর্তী সময়ে এই সংলাপ নিয়ে অসংখ্য মিম তৈরি হয়। উদয়ের শক্ত করে চোয়াল চেপে ধরা, হাত উঁচু করা এবং নিজেকেই শান্ত থাকতে বলা—এই দৃশ্যই হয়ে ওঠে মিমের জনপ্রিয় টেমপ্লেট।

আরেকটি জনপ্রিয় সংলাপ হলো—‘ভগবান কা দিয়া সব কুছ হ্যায়’। ভক্তরা এই সংলাপ দুইভাবে ব্যবহার করেন। কেউ নিজের সামর্থ্য বা প্রাপ্তি নিয়ে গর্ব প্রকাশ করতে এটি ব্যবহার করেন, আবার কেউ মজা বা ব্যঙ্গ করেও ব্যবহার করেন।


ছবির শুটিংয়ের একটি দৃশ্যে পরিচালক উদয়কে ঘোড়ার ওপর দেখে মন্তব্য করেন—‘ঘোড়াও ভাবছে, কোন গাধাকে বসিয়ে দিল!’ উদয়ের প্রতিক্রিয়াও ওই দৃশ্যের অন্যতম হাসির জায়গা।

এভাবেই সময়ের সঙ্গে ‘ওয়েলকাম’ একটি কাল্ট সিনেমায় পরিণত হয়েছে এবং এর সংলাপগুলো এখনো মিম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেঁচে আছে।

নতুন প্রজন্মের কাছে এত জনপ্রিয় কেন উদয়?

উদয়ের সংলাপগুলো ছোট ও সহজ। রিলস কিংবা স্টোরিতে দ্রুত বোঝানো যায় এমন সংক্ষিপ্ত কথাই বেশি কাজ করে। ‘কন্ট্রোল উদয়’-এর মতো সংলাপ ব্যবহার করতে সিনেমাটির পুরো গল্প জানারও প্রয়োজন হয় না।

উদয়ের রাগও অনেক তরুণের কাছে পরিচিত অনুভূতি। ‘কন্ট্রোল উদয়’ মূলত নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন। পরীক্ষা, পারিবারিক অনুষ্ঠান, বন্ধুদের গ্রুপ চ্যাট কিংবা রাস্তায় যানজট—বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তরুণরা এই সংলাপ ব্যবহার করেন। সংলাপটি এমন একটি অনুভূতি প্রকাশ করে, যা অনেকেই মনে মনে অনুভব করেন কিন্তু মুখে বলেন না।

এর পাশাপাশি উদয় চরিত্রের একটি নরম দিকও আছে। সে একজন গ্যাংস্টার হলেও বোনকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত বড় ভাই। সে চায় বোনের ভালো ঘরে বিয়ে হোক। একই সঙ্গে সে ভালো অভিনেতাও হতে চায়। একজন কঠিন মানুষের ভেতরে এমন কোমল দিক থাকায় দর্শকদের কাছে চরিত্রটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

উদয় ও মজনুর বন্ধুত্বও তরুণদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তারা একে অন্যের সঙ্গে ঝগড়া করে, ভয় পায়, আবার বিপদে একে অন্যকে সামলায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে একজনকে ‘উদয়’ এবং অন্যজনকে ‘মজনু’ হিসেবে চিহ্নিত করে মজা করেন।

পারিবারিক চাপও মেলে উদয়ের গল্পে

উদয়কে একটি সম্মানিত পরিবারের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে তার পরিবারও বিয়ের উপযুক্ত। আত্মীয়স্বজনের বিচার-বিশ্লেষণ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি অনেক তরুণ ভারতীয়ের কাছেই পরিচিত। ‘ওয়েলকাম’ সেই বাস্তব চাপকে হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরেছে।

সিনেমাটি বারবার দেখাও সহজ। ছবিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২ ঘণ্টা ৪১ মিনিট। এতে অনেক ছোট ছোট দৃশ্য রয়েছে, যেগুলোর বেশির ভাগই আলাদাভাবে কেটে দেখা বা শেয়ার করা যায়। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও বারবার দেখার সুযোগও সিনেমাটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে টিকিয়ে রেখেছে।


এর ওপর ‘ওয়েলকাম’ ফ্র্যাঞ্চাইজিও নানা পাটেকরকে নতুন দর্শকদের সামনে ধরে রেখেছে। ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ মুক্তি পায় ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। সেখানে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের জন্য আবারও ফিরে আসে উদয় শেঠি। সিরিজটির তৃতীয় সিনেমা ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’- এর মুক্তির তারিখ ছিল ২৬ জুন ২০২৬।

উদয় চরিত্রে নানা পাটেকারের অভিনয়ের বিশেষত্ব

কমেডিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টাইমিং। নানা পাটেকারের এই দক্ষতা ছিল অসাধারণ। কখন চুপ থাকতে হবে, আবার কখন একটি সংলাপের চেয়ে সামান্য বিরতিই বেশি হাস্যকর হবে—তিনি তা বুঝতেন।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তিনি উদয়কে নিয়ে হাসাহাসি করেননি। চরিত্রটিকে তিনি নিজের মতো করে মর্যাদা দিয়েছেন। আর সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে হাসি। দুর্বল কোনো অভিনেতা হয়তো শুধু ‘জোক’ হিসেবে চরিত্রটি করতেন; নানা পাটেকর বরং ‘উদয়’ নামের মানুষটিকেই অভিনয় করেছেন। 

তার গম্ভীর অভিনয়ের ক্ষেত্রেও একই দক্ষতা দেখা গেছে। ‘পরিন্দা’ ও ‘ক্রান্তিবীর’-এ তার স্থিরতা ছিল ভয় ধরানো। ‘ওয়েলকাম’-এ সেই একই স্থিরতা হয়ে গেল হাসির কারণ। তার কণ্ঠ, চোখের দৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রিত অভিনয় একই ছিল—শুধু পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল।

নানা পাটেকর রেখে গেছেন দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য কঠিন ও শক্তিশালী চরিত্রের স্মৃতি। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কোটি কোটি দর্শকের কাছে তিনি হয়তো সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন সেই গ্যাংস্টার উদয় শেঠিহিসেবে—যে নিজেকেই বলে, ‘কন্ট্রোল উদয়!’\

তথ্যসূত্র: দ্য স্টেটসম্যান

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

নানা পাটেকারের মৃত্যুতে মোদির শোক

নানা পাটেকারের মৃত্যুতে মোদির শোক

আমি একজন ভালো বন্ধুকে হারালাম: গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী

আমি একজন ভালো বন্ধুকে হারালাম: গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী

মৃত্যুর আগে সর্বশেষ কবে জনসমক্ষে দেখা গেছিল নানা পাটেকরকে?

মৃত্যুর আগে সর্বশেষ কবে জনসমক্ষে দেখা গেছিল নানা পাটেকরকে?

নিজ বাসায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন নানা পাটেকর

নিজ বাসায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন নানা পাটেকর

বলিউডের খ্যাতিমান অভিনেতা নানা পাটেকর মারা গেছেন

বলিউডের খ্যাতিমান অভিনেতা নানা পাটেকর মারা গেছেন

ভারতের প্রখ্যাত আলেম-সাহিত্যিক মাওলানা সাঈদুর রহমান আজমির ইন্তেকাল

ভারতের প্রখ্যাত আলেম-সাহিত্যিক মাওলানা সাঈদুর রহমান আজমির ইন্তেকাল

আরও পড়ুন

মিমির হবু বরকে যে বার্তা দিলেন অঙ্কুশ

মিমির হবু বরকে যে বার্তা দিলেন অঙ্কুশ

‘কন্ট্রোল উদয়’—যে চরিত্রে নানা পাটেকার হয়ে উঠেছিলেন নতুন প্রজন্মের হিরো

‘কন্ট্রোল উদয়’—যে চরিত্রে নানা পাটেকার হয়ে উঠেছিলেন নতুন প্রজন্মের হিরো

১ মিনিটে দুই ট্রেনের শতভাগ টিকিট উধাও, ক্ষোভ আশফাক নিপুণের

১ মিনিটে দুই ট্রেনের শতভাগ টিকিট উধাও, ক্ষোভ আশফাক নিপুণের

নানা পাটেকারের মৃত্যুতে মোদির শোক

নানা পাটেকারের মৃত্যুতে মোদির শোক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম