বাবার ভিটাই যেন আজাদের কারাগার
মানসিক রোগী সাজিয়ে শিকলে বন্দি ২০ বছর
Advertisement
সৌরভ মাহমুদ হারুন, ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা)
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাবার ভিটা, অথচ সেই ভিটাতেই যেন বন্দিজীবন! যখন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে হাসি-আনন্দে থাকার কথা, সেই বয়সের দুই দশক কেটেছে পায়ে শিকল পরা অবস্থায়। চার দেওয়ালের স্যাঁতসেঁতে ঘরই যেন তার পৃথিবী। নেই পর্যাপ্ত বিছানা-পোশাকের ব্যবস্থা। এভাবেই দীর্ঘ ২০ বছর ধরে শিকলবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের টাটেরা গ্রামের আজাদ মিয়া (৪০)।
আজাদ মিয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মুছা মিয়ার ছোট ছেলে। সরেজমিন টাটেরা গ্রামে দেখা যায়, একতলা টিনশেড ভবনের একটি স্যাঁতসেঁতে কক্ষে শিকল পরা অবস্থায় রয়েছেন আজাদ। ঘরে নেই কোনো খাট, বিছানা কিংবা বালিশ। নাম জানতে চাইলে মুখে ফুটে ওঠে হাসি। সাবলীলভাবেই নিজের নাম ও বয়স ৪০ বছর বলে জানান তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজাদের বয়স যখন প্রায় ২০ বছর, তখন পারিবারিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাড়িতে কাজ করতে আসা দিনমজুর আবদুল লতিফের সঙ্গে তার তর্কাতর্কি হয়। একপর্যায়ে আজাদ ওই শ্রমিককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন বলে স্থানীয়দের দাবি। পরে ওই শ্রমিকের হাতে সংক্রমণ দেখা দিলে তার হাত কেটে ফেলতে হয়েছিল। এর প্রায় দুই বছর পর বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধে জড়িয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান।
এসব ঘটনার পর থেকেই পরিবারের পক্ষ থেকে আজাদকে মানসিক ভারসাম্যহীন দাবি করে শিকলে বেঁধে রাখা হয়। এরপর পেরিয়ে গেছে ২০টি বছর। কিন্তু দুই দশক পরও প্রশ্নের উত্তর মেলেনি- আজাদ কি সত্যিই মানসিকভাবে অসুস্থ, নাকি চিকিৎসা ও যথাযথ মূল্যায়নের পরিবর্তে তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে?
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার দাবি, আজাদ মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রামবাসী বলেন, ‘আজাদের বাবা সরকারি চাকরি করেছেন, মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল। আজাদ যদি অসুস্থ হয়, তাহলে এত বছরেও তার যথাযথ চিকিৎসা হলো না কেন?
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আজাদের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই দুটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর পর নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে শিকলে বেঁধে রাখতে বাধ্য হয়েছি। এক সময় তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। চিকিৎসকরা ভালো হওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়ায় পরে আর চিকিৎসা করা হয়নি।
ব্রাহ্মণপাড়া থানার ওসি মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি শোনার পরই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আজাদের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও সামাজিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ইউএনও মুন্নী ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন বিষয়টি সম্পর্কে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জেনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
