আসন্ন ইউপি নির্বাচন
কমিশন-প্রশাসনের সমন্বয় জরুরি
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় তৃণমূলের সক্রিয় ভিত্তি হলো ইউনিয়ন পরিষদ। তৃণমূলের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সুসংহত করতে সময়মতো ইউপি নির্বাচন আয়োজনের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও কার্যকর নির্বাচন সম্পাদনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের একার নয়; এর সঙ্গে জাতীয় অর্থনৈতিক অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা কার্যপদ্ধতি এবং সরকারের কৌশলগত প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। শুক্রবার যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে যে মতপার্থক্য ও নানামুখী যুক্তি উঠে এসেছে, তা জাতীয় স্বার্থে গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
নির্বাচন কমিশন প্রাথমিকভাবে আগামী নভেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে সাত ধাপে ভোটগ্রহণের যে সম্ভাব্য রোডম্যাপ তৈরি করেছিল, সার্বিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে তাতে কিছু সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সচিবদের বৈঠকে উপস্থাপিত যুক্তিগুলোর মূল সুর ছিল বাস্তবমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এ সময়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বার্ষিক মূল্যায়ন, জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা এবং অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোটকেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করা হয় এবং শিক্ষকদের একটি বিশাল অংশকে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাই পরীক্ষার মৌসুমে ভোটের আয়োজন করলে তা লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও মূল্যায়নে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও শেষ প্রান্তিকের মাসগুলো ব্যস্ততার। জাতীয় দিবসগুলোয় নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বার্ষিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং উপনির্বাচন পরিচালনা-সব মিলিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এছাড়া সরকারের নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা ও দারিদ্র্য বিমোচনমূলক কার্যক্রমের বিষয়টিও বিবেচনায় আনা জরুরি। ফলে এসব জটিলতা কাটিয়ে ওঠার সবচেয়ে সুচিন্তিত পথ হলো জানুয়ারি থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করা এবং আগামী জুনে এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই তা সম্পন্ন করা। বছরের প্রথম ভাগে তুলনামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ কম থাকে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতিকে সুসংহত করার সুযোগ দেয়। একইসঙ্গে সাতটি ধাপে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন না চালিয়ে ধাপের সংখ্যা কমিয়ে অল্প সময়ে ভোটগ্রহণ শেষ করার প্রস্তাবটিও বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ, দীর্ঘায়িত নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ফলে স্থানীয় প্রশাসনের মনোযোগ যদি মূল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড থেকে সরে গিয়ে কেবল নির্বাচনি ব্যবস্থাপনাতেই নিবদ্ধ থাকে, তবে তা গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নকে গতিহীন করে তুলতে পারে।
মনে রাখতে হবে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও পূর্ব-আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। কমিশন যদি স্থানীয় সরকার, অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট বাজেট, অর্থায়ন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তাহলে প্রশাসনিক টানাপোড়েন এড়িয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্ভব। গণতন্ত্রকে কার্যকর রূপ দিতে হলেও কমিশনের স্বাধীন সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, জাতীয় উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক ধারাকে অক্ষুণ্ন রেখে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপহার দিতে নির্বাচন কমিশন সমর্থ হবে, এটাই প্রত্যাশা।
