ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
সর্বাগ্রে দেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিবেচ্য
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পারমাণবিক শক্তির সাশ্রয়ী ও আধুনিক ব্যবহার যখন বৈশ্বিক জ্বালানি সুরক্ষার অন্যতম নিয়ামক হয়ে উঠছে, তখন বাংলাদেশের মতো ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার দেশে স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর বা ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও গুরুত্ববহ। রোববার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ, দেশে ৩০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের এসব ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ ৫ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি সই করেছে। চীন সম্ভাব্য স্থান হিসাবে জামালপুরের মাদারগঞ্জ সফর করলেও ঘনবসতি ও পূর্ব-অভিজ্ঞতার অভাবে প্রক্রিয়াটি চিন্তাভাবনার দাবি রাখে।
২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসএমআর প্রযুক্তির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার যে পরিকল্পনা সরকার করছে, তা দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো অতীতে মেগা প্রকল্পগুলোতে অর্জিত অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করে যে, পরমাণু প্রযুক্তির সুবিধা অসীম হলেও, নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিকগুলোতে একটু ভুল হলেই এর মাশুল হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন যে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, তা বলা বাহুল্য।
আমরা মনে করি, যে কোনো প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করার চেয়ে এর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং পরিবেশগত সুরক্ষা যাচাই করা বহু গুণে গুরুত্বপূর্ণ। চীন বাংলাদেশে নিজেদের উদ্ভাবিত এসএমআরের প্রথম প্রয়োগ ঘটাতে আগ্রহী; কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাদের কোনো অভিজ্ঞতার নজির না থাকায় পিডিবির কর্মকর্তাদের সতর্ক অবস্থান প্রশংসার দাবি রাখে। বাংলাদেশকে কোনো পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র বা গিনিপিগ বানাতে না দেওয়ার এই নীতি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় অপরিহার্য। সেক্ষেত্রে নতুন ও আধুনিক চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার নিয়মকানুন অক্ষরে অক্ষরে পালন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তায় এসএমআর গ্রহণের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি মূল বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত। জায়গা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শতভাগ নিরাপত্তার গ্যারান্টি না থাকলে কেবল দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়ার আশায় কোনো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল বা স্পর্শকাতর বাস্তুতন্ত্রে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। রাঙ্গাবালী বা অন্যান্য বিকল্প উপকূলীয় অঞ্চল পর্যালোচনার সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সুনামির ঝুঁকিও গভীরভাবে নিরূপণ করতে হবে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরির যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সুযোগ এসেছে, তা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে মেগা প্রকল্পগুলো এককভাবে বিদেশি বিশেষজ্ঞ বা ঠিকাদারদের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘায়িত না হয়। সর্বোপরি, মুক্ত দরপত্র ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এবং পূর্ব-পরীক্ষিত প্রযুক্তি যাচাই করে চুক্তি করা উচিত, যাতে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না হয়। বাংলাদেশ বিচক্ষণতার সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার সুনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে টেকসই ও নিরাপদ জ্বালানির নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সক্ষম হবে, এটাই প্রত্যাশা।
