বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, পরিস্থিতি উত্তরণে চাই দ্রুত পদক্ষেপ
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তাণ্ডব বর্তমানে জনজীবনের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে দিনদুপুরে কুপিয়ে হত্যা কিংবা নৃশংস আক্রমণের মতো ঘটনাগুলো এখন প্রায় নিত্যদিনের চিত্র। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে টাকা ও মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীরা বর্তমানে কতটা দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনিক হুঁশিয়ারি, যৌথ বাহিনী ও পুলিশের নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এদের বাগে আনতে পারছে না। অজ্ঞাত কারণে তারা অসহায়। বৃহস্পতিবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গডফাদারদের নাম বদলালেও বাস্তবে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও তাদের অপতৎপরতার কোনো হেরফের হয়নি; বরং কোনো কোনো এলাকায় আরও ভয়াবহ রূপে এই সামাজিক ব্যাধির বিস্তার ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, বর্তমানে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেই এ অপরাধী চক্র সক্রিয়, যা নগরবাসীকে ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
জানা যায়, মূলত স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও তথাকথিত বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ই কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার প্রধান চালিকাশক্তি। রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং, শোডাউন কিংবা নিজেদের কায়েমি স্বার্থসিদ্ধির জন্য একশ্রেণির সুবিধাবাদী মহল কিশোরদের ব্যবহার করে থাকে। অন্ধকার গলির এই ভুল পথ ধরে চালিত হয়ে পরে এরা মাদক ব্যবসা, অস্ত্রবাজি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ক্যাডার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও কিশোরদের অপরাজনীতিতে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করার এই দূষিত সংস্কৃতি বিন্দুমাত্র বদলায়নি। সমাজব্যবস্থার এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধের এ শিকড় ক্রমেই সামাজিক জীবনের গভীরে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে।
এই বেপরোয়া গ্যাং কালচার থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে কেবল সাময়িক বা খণ্ডকালীন দমন-পীড়ন দিয়ে কোনো স্থায়ী কাজ হবে না। কিশোর অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধী এবং তাদের পেছনে থাকা গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব তথাকথিত নেতা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে কিশোরদের অস্ত্র ও মাদকের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তাদেরও মূল অপরাধী হিসাবে বিচারের আওতায় আনার বিকল্প নেই। রাজনৈতিক পরিচয় যাদেরই থাকুক না কেন, অপরাধীর কোনো দল নেই-এই নীতির নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে শুধু প্রশাসনিকভাবে আইন প্রয়োগ করে এই জটিল সামাজিক সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করি আমরা। এর জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামোর এক সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। সন্তানের আচার-আচরণ খেয়াল রাখার পাশাপাশি তার সহপাঠী ও বন্ধু কারা এবং অবসর সময় তারা কীভাবে কাটাচ্ছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক সচেতন থাকতে হবে। একইসঙ্গে শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সুশিক্ষা চর্চার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তরুণদের সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার সার্বিক পরিবেশ তৈরিতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
