Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

শিক্ষাঙ্গন হোক শিশুর নিরাপদ আশ্রয়

Advertisement

Icon

ইবরাহীম আল খলীল

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষাঙ্গন হোক শিশুর নিরাপদ আশ্রয়

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

একটি শিশু যখন মায়ের হাত ছেড়ে শিক্ষকের হাত ধরে, তখন সেখানে শুধু একটি বই, একটি খাতা কিংবা কয়েকটি অক্ষর শেখার সম্পর্ক তৈরি হয় না; তৈরি হয় বিশ্বাসের এক গভীর বন্ধন। অভিভাবক তার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদটিকে শিক্ষকের কাছে তুলে দেন এই বিশ্বাসে-এ মানুষটি আমার সন্তানকে জ্ঞান দেবেন, মানুষ করবেন, আগলে রাখবেন। একটি শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা পেরিয়ে যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে, তখন তার সঙ্গে প্রবেশ করে পরিবারের অগাধ আস্থা।

কিন্তু সেই আস্থার জায়গাটিই যদি কখনো শিশুর জন্য ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে, তার নিরাপদ আশ্রয় যদি পরিণত হয় আতঙ্কের স্থানে, তাহলে ক্ষতটি শুধু শরীরে থাকে না; তা গেঁথে যায় শিশুর কোমল মনোজগতে। একটি শিশুর শৈশব, তার বিশ্বাস, তার আত্মমর্যাদা-সবকিছুই এতে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন নিছক একটি অপরাধ নয়; এটি একটি নির্মল শৈশবের ওপর আঘাত, একটি পরিবারের বিশ্বাসের ওপর আঘাত এবং মানবিকতার ওপর আঘাত।

ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও গভীর। একটি শিশু শুধু তার পরিবারের সন্তান নয়; সে আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত। যে শিক্ষক, অভিভাবক বা দায়িত্বশীলের কাছে তার নিরাপত্তার দায়িত্ব অর্পিত হয়, তার জন্য সেই দায়িত্বও একটি আমানত। সেই আমানতের অপব্যবহার করা তাই শুধু আইন ভঙ্গ নয়; এটি বিশ্বাসভঙ্গ এবং আমানতের খেয়ানতও।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহে পরিণত হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৮)। আল্লাহতায়ালাও আমানত যথাযথভাবে আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন-‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সূরা নিসা, আয়াত ৫৮)।

শিক্ষকতা তাই নিছক একটি পেশা নয়; এটি একটি আমানত। শিক্ষক শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও চরিত্র গঠনের পাশাপাশি তার নিরাপত্তারও অভিভাবকসুলভ দায়িত্ব পালন করেন। সেই অবস্থান ব্যবহার করে কোনো শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন করা হলে অপরাধের মাত্রা আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। কারণ সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের পাশাপাশি বিশ্বাস ও দায়িত্বেরও লঙ্ঘন ঘটে।

ইসলাম শিশুদের প্রতি কোমলতা ও স্নেহের শিক্ষা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) শিশুদের ভালোবাসতেন এবং তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৯৭)। অতএব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি মানবিক, নৈতিক ও ইসলামি দায়িত্বও।

শিশু যৌন নির্যাতনের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। নৈতিক ও চারিত্রিক অবক্ষয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধপ্রবণতা, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো, অপর্যাপ্ত তদারকি, অভিযোগ গোপন করার সংস্কৃতি এবং অপরাধীর প্রতি প্রতিষ্ঠানের পক্ষপাত-বিভিন্ন বিষয় এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পাঠ্যজ্ঞান নয়; নৈতিকতা, আত্মসংযম, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবোধও গড়ে তুলতে হবে। কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতার নিকটেও যেও না।’ (সূরা আনআম, আয়াত ১৫১)। অন্যত্র বলেছেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল এবং নিকৃষ্ট পথ।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩২)।

‘কাছেও যেও না’-এই সতর্কতা আমাদের শেখায়, শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলেই হবে না; অপরাধের সুযোগ সৃষ্টি করে এমন পরিবেশ ও আচরণও প্রতিরোধ করতে হবে। শিশু সুরক্ষায় শুধু আবেগ, প্রতিবাদ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দোষারোপ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা।

প্রথমত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিখিত শিশু সুরক্ষা নীতিমালা থাকতে হবে। শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি হয়রানি বা অপরাধ।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর একান্ত অবস্থান নিরুৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় সাক্ষাৎ বা পরামর্শের জন্য দৃশ্যমান ও নিরাপদ স্থান নির্ধারণ করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের সময় শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, প্রয়োজনীয় পরিচয়-যাচাই, পূর্ববর্তী কর্মজীবন ও পেশাগত আচরণও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

চতুর্থত, আবাসিক প্রতিষ্ঠানে হোস্টেল, সিঁড়ি, নির্জন করিডর ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা ও নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবে নিরাপত্তার নামে শিশুর ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও লঙ্ঘন করা যাবে না।

পঞ্চমত, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত আবাসন, বাস্তবসম্মত ছুটি ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকাও সুস্থ কর্মপরিবেশের অংশ।

ষষ্ঠত, প্রতিষ্ঠানে গোপনীয় ও সহজ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যেন ভয়, লজ্জা বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারে। অভিযোগ উঠলে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা গণমাধ্যমে চূড়ান্তভাবে অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়সংগত নয়। ভুক্তভোগীর সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি ন্যায়সংগত তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক বিচারও জরুরি। সবশেষে প্রয়োজন জবাবদিহিতা ও অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার নামে অপরাধ গোপন করা কোনো সমাধান নয়।

শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ভয়, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা স্থান এড়িয়ে চলা ইত্যাদি বিষয়েও অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো প্রতিষ্ঠানই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; আবার একটি ঘটনার কারণে পুরো একটি শিক্ষাব্যবস্থাকেও অপরাধী বলা যায় না। সঠিক অবস্থান হলো-অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া, ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো এবং নিরপরাধের প্রতি ন্যায়বিচার করা।

মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ কিংবা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-কোথাও শিশুর জন্য অনিরাপদ পরিবেশ গ্রহণযোগ্য নয়। একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব রক্ষা করা পুরো সমাজের আমানত। আর সেই আমানতের খেয়ানত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও, ঢাকা

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

যে ৫ ক্ষেত্রে মানুষের দোষ গোপন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

যে ৫ ক্ষেত্রে মানুষের দোষ গোপন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম গোশত খাওয়া কি হালাল?

ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম গোশত খাওয়া কি হালাল?

ঢিলা-কুলুখ ব্যবহার না করলে ইমামের পেছনে নামাজ পড়ার হুকুম কী?

ঢিলা-কুলুখ ব্যবহার না করলে ইমামের পেছনে নামাজ পড়ার হুকুম কী?

শর্ত কথা বলার কিন্তু মেসেঞ্জারে সালামের জবাব দিলে কি তালাক হবে?

শর্ত কথা বলার কিন্তু মেসেঞ্জারে সালামের জবাব দিলে কি তালাক হবে?

পাতলা ওড়নায় মাথার চুল দেখা গেলে নারীর নামাজ হবে কি?

পাতলা ওড়নায় মাথার চুল দেখা গেলে নারীর নামাজ হবে কি?

ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি কি একদম স্থির রাখতে হবে?

নামাজে অপ্রয়োজনীয় শরীর নড়াচড়া ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি কি একদম স্থির রাখতে হবে?

আরও পড়ুন

বুখারা থেকে সোনারগাঁ হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানসাম্রাজ্যের ইতিহাস

হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানসাম্রাজ্যের ইতিহাস

মিসওয়াক নবীজির প্রিয় সুন্নত

মিসওয়াক নবীজির প্রিয় সুন্নত

নজরুলের ইসলামি সংগীতে আল্লাহপ্রেমের অনুরণন

নজরুলের ইসলামি সংগীতে আল্লাহপ্রেমের অনুরণন

শিক্ষাঙ্গন হোক শিশুর নিরাপদ আশ্রয়

শিক্ষাঙ্গন হোক শিশুর নিরাপদ আশ্রয়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম