নজরুলের ইসলামি সংগীতে আল্লাহপ্রেমের অনুরণন
Advertisement
মমতাজ উদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি সংগীত পাঠ করলে একটি বিষয় খুব দ্রুত স্পষ্ট হয়ে ওঠে-তার কাব্যভাষার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আল্লাহর প্রতি এক গভীর প্রেম, আকুলতা এবং অন্তরঙ্গ সম্বোধন। তিনি বিশ্বাসের কথা বলেছেন, তওবার কথা বলেছেন, বিচার ও আখিরাতের কথাও বলেছেন; কিন্তু তার কাব্যিক সুরের প্রধান অনুরণন ভীত-সন্ত্রস্ত দূরত্বের নয়, বরং প্রেমময় নৈকট্যের। এ কারণেই তার ইসলামি সংগীত ধর্মীয় উপদেশে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা আত্মার অন্তরঙ্গ সংলাপে পরিণত হয়।
নজরুলের কাছে আল্লাহ শুধু সর্বশক্তিমান স্রষ্টা নন; তিনি দয়াময় আশ্রয়, বিপন্ন হৃদয়ের নির্ভর, অশ্রুসিক্ত আত্মার সান্ত্বনা এবং পথহারা মানুষের প্রত্যাবর্তনের চূড়ান্ত গন্তব্য। ফলে তার গানে আল্লাহর প্রতি মানুষের সম্পর্কটি প্রভু ও দাসের আইনি সম্পর্কের ভাষায় নয়, বরং প্রেম, নির্ভরতা, অনুতাপ ও আশার ভাষায় উন্মোচিত হয়। এখানেই তার ইসলামি সংগীতের কাব্যিক স্বাতন্ত্র্য।
নজরুলের কাব্যভাষা
নজরুলের ইসলামি গানের ভাষা একইসঙ্গে সরল, সুরময় এবং গভীর প্রতীকসমৃদ্ধ। তিনি এমন শব্দ নির্বাচন করেন, যা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সহজে পৌঁছে যায়, কিন্তু সেই সরলতার অন্তরালে থাকে আধ্যাত্মিক গভীরতা। তার ভাষায় মিনতি আছে, কিন্তু আত্মসম্মানহীনতা নেই; কান্না আছে, কিন্তু নিরাশা নেই; অনুতাপ আছে, কিন্তু হতাশা নেই। এ ভারসাম্যই তার কাব্যভাষাকে অসাধারণ মর্যাদা দিয়েছে।
তিনি প্রায়ই এমন শব্দভান্ডার ব্যবহার করেন, যেখানে আরবি-ফারসি ঐতিহ্যের ধর্মীয় শব্দ বাংলা কাব্যের øিগ্ধতার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ফলে তার ইসলামি সংগীত একদিকে মুসলিম আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের আবহ বহন করে, অন্যদিকে বাংলা ভাষার সংগীতধর্মী কাব্যরীতিকেও সমৃদ্ধ করে।
নজরুলের ইসলামি সংগীতের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য তার সম্বোধনের ভঙ্গি। তিনি আল্লাহকে দূরবর্তী কোনো শক্তি হিসাবে ডাকেন না; ডাকেন এমন এক সত্তা হিসাবে, যার কাছে হৃদয়ের সব গোপন ব্যথা উন্মুক্ত করা যায়। তার সম্বোধনে যেমন শ্রদ্ধা আছে, তেমনি রয়েছে অন্তরঙ্গতা; যেমন বিনয় আছে, তেমনি রয়েছে অকুণ্ঠ আস্থা।
এ সম্বোধন শুধু ভাষার অলংকার নয়; এটি একটি আধ্যাত্মিক অবস্থান। মানুষ যাকে সত্যিকার অর্থে আপন মনে করে, তার কাছেই নিজের দুর্বলতা স্বীকার করতে পারে। তাই নজরুলের মিনতি ভিক্ষার ভাষা নয়; এটি বিশ্বাসের ভাষা। তার ডাকে আত্মা নিজেকে লুকায় না; বরং সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে।
এই নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই তার গানে সম্বোধন একটি পুনরাবৃত্ত অলংকার নয়; বরং প্রত্যাবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ। মানুষ যখন ডাকে, তখনই সে নিজের বিচ্ছিন্নতাকে স্বীকার করে এবং সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।
নজরুলের আল্লাহভাবনার সবচেয়ে উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য হলো করুণার প্রতি তার গভীর আস্থা। তার গানে মানুষের পাপের চেয়ে আল্লাহর দয়া বৃহত্তর, মানুষের দূরত্বের চেয়ে আল্লাহর নৈকট্য গভীরতর, মানুষের দুর্বলতার চেয়ে তার অনুগ্রহ অধিক শক্তিশালী। এ বিশ্বাস তার ইসলামি সংগীতকে আশাবাদের এক অনন্য সুর দিয়েছে।
তাই তার গানের মানুষটি ভেঙে পড়লেও ভরসা হারায় না। সে কাঁদে, কিন্তু নিরাশ হয় না; সে অনুতপ্ত হয়, কিন্তু প্রত্যাখ্যাত বোধ করে না। কারণ তার বিশ্বাস যিনি আহ্বান করেন, তিনিই গ্রহণও করেন; যিনি পরীক্ষা করেন, তিনিই আশ্রয়ও দেন।
এ করুণাময় আল্লাহভাবনা নজরুলের কাব্যে আত্মার এক গভীর নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করে। মানুষ এখানে ভয়ের কারণে স্রষ্টার দিকে ফিরে আসে না; ফিরে আসে কারণ সে জানে, তার দয়ার দ্বার উন্মুক্ত। ফলে পুনঃসংযোগ শাস্তির ভয়ে নয়, প্রেমের আকর্ষণে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ অর্থে নজরুলের ইসলামি সংগীতের আল্লাহভাবনা বাংলা কাব্যভাষায় আধ্যাত্মিক প্রেমের এক স্বতন্ত্র নন্দনতত্ত্ব নির্মাণ করেছে। তার কাছে আল্লাহ শুধু বিশ্বাসের বিষয় নন; তিনি আত্মার অন্তরঙ্গতম প্রিয়, যার স্মরণে ভাষা সংগীতে, অশ্রু প্রার্থনায় এবং সমর্পণ সৌন্দর্যে রূপান্তরিত হয়। এখানেই তার ইসলামি সংগীতের স্থায়ী শিল্পমূল্য এবং আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য নিহিত।
লেখক : সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা
