Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

‘১৮০ দিন ও তারপর’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিং

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বৈষম্যমূলক : সিপিডি

Advertisement

Icon

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বৈষম্যমূলক : সিপিডি

Advertisement

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি ‘বৈষম্যমূলক’। চুক্তির ধারাগুলো দেখে আমরা হতবাক এবং স্তম্ভিত। নতুন সরকারের এই চুক্তি থেকে সরে আসা উচিত। শনিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলা হয়। ধানমন্ডির নিজস্ব কার্যালয়ে এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়ে যদি নিন্দা জানানোর কোনো একটি বিষয় থাকে, সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি। তার মতে, ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি। এর প্রতিকারে তিনটি খাতে ন্যায়পাল নিয়োগ জরুরি। এগুলো হলো-কর ন্যায়পাল, ব্যবসাজনিত ন্যায়পাল ও ব্যাংক ন্যায়পাল। বিফ্রিংয়ের বিষয় ছিল-‘নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত : ১৮০ দিন ও তারপর।’ ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ এবং ইরানে মার্কিন হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এতে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এ সময় সংসদকে কার্যকর করা এবং যত দ্রুত সম্ভব অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়ার সুপারিশ করেছে সিপিডি।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রফেসর ড. ইউনূসের প্রশাসন বিদায় নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বৈষম্যমূলক বাণিজ্য চুক্তি’ সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত। ঠিক সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি হয়েছে। শুল্ক সংক্রান্ত যে সব বিষয় রয়েছে তা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) নীতিমালা পরিপন্থি। তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিতে অযৌক্তিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে। অন্য দেশের সঙ্গে নতুন চুক্তি করলে তা যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো এবং তাদের বিধিনিষেধ মানার বাধ্যবাধকতা থাকায় দেশের নীতি-স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এটি মসৃণ রূপান্তর কৌশল (এসটিএস) বাস্তবায়নে জটিলতা ও দেশের উন্নয়নে বড় বাধা তৈরি করবে।’

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, চুক্তিতে মার্কিন পণ্যের জন্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা রয়েছে। তবে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপ এবং শর্ত ভঙ্গের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া কৌশলগত খনিজ ও জ্বালানি খাতে মার্কিন বিনিয়োগের সুযোগ ও কিছু খাতে নীতিগত সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তার মতে, এতে প্রযুক্তি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের বিকল্প কমে যেতে পারে। এছাড়াও এতে এমন কিছু ধারা রয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের ভালোভাবে এলডিসি উত্তরণ বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে এই চুক্তি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। নতুন সরকারের উচিত তা পুনর্বিবেচনা করা। জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে চুক্তি থেকে সরে আসা উচিত।

এছাড়াও জাপানের সঙ্গে করা ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) দেশের জ্বালানি রূপান্তর বিলম্বিত করতে পারে। এটিও পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে সিপিডি। এ সময় দেশে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর (ফসিল ফুয়েল) কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ না করার নীতি গ্রহণেরও আহ্বান জানায় সংস্থাটি। কয়লা উত্তোলনের যে কোনো উদ্যোগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সরে আসার প্রবণতা তৈরি করবে। সেক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের নতুন কূপ অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নতুন সরকারের জন্য শ্রম অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে অন্যতম সমস্যা শ্রমের মজুরি কম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশের শ্রমিকরা কম মজুরি পায়। শ্রমিকদের মজুরির জন্য কাজ করা দরকার। তবে ইপিজেডকে আলাদা করে না রেখে, এককভাবে ওয়েজ বোর্ড গঠন করতে হবে। সংসদে সরকারের জবাবদিহিতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ সরকারের জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। সংসদে সব সরকারি বিল পাশ হয়। বেসরকারি বিল কোনোভাবেই আসে না। বর্তমান সংসদকে এ বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রশ্নোত্তর পর্বটি বিরোধী দল যেন কাজে লাগায়। স্থায়ী কমিটিগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত হওয়া দরকার বলেও মন্তব্য করে সংস্থাটি। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ ব্যবসায়ীদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন করতে হয়। এজন্য দুর্নীতি ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও বটে। আর দুর্নীতি রোধে আমরা কর ন্যায়পাল, ব্যবসাজনিত ন্যায়পাল ও ব্যাংক ন্যায়পাল নিয়োগের কথা বলছি। যত দ্রুত সম্ভব এই ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়া উচিত।

তার মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজস্ব আহরণ সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ওই সময়ে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজস্ব বাড়াতে তেমন কোনো উদ্যোগ ছিল না। বর্তমানে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় সবচেয়ে কম। বর্তমান সরকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে জিডিপির ১০ শতাংশে নিয়ে যেতে চায়। এটি বাস্তবসম্মত হয়েছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ এই রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সরকার ১৮০ দিনের পরিকল্পনা নিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তাব কর বৈষম্য কমাতে এনবিআরের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করা উচিত। ওই কমিটি কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি, কর ছাড় এবং কর আহরণের বিষয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। অন্যদিকে বর্তমানে ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে ৮টি স্তর রয়েছে। সেটাকে ধীরে ধীরে কমিয়ে ৩ স্তরে নিয়ে আসা উচিত। আর দীর্ঘমেয়াদে ভ্যাট হার ২টি স্তর এবং পরবর্তী সময়ে সিঙ্গেল হারে নিয়ে যেতে হবে।

খন্দকার মোয়াজ্জেম বলেন, এনবিআর অনেক ক্ষেত্রে কর অবকাশ সুবিধা দিয়ে থাকে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। যেমন অনেক বিনোদন ক্লাবে কর অবকাশ দেওয়া হয়। এছাড়াও খাতভিত্তিক কিংবা জ্বালানি খাতে কর অবকাশ রয়েছে। এটি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। তিনি বলেন, শুধু ব্যক্তি শ্রেণির জন্য নয়, সব ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে অনলাইন কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। আর ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য দিতে হবে বিশেষ প্রণোদনা। কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার রোধে আন্তর্জাতিক যে গাইডলাইন রয়েছে, সে বিষয়ে চুক্তি করা জরুরি। এনবিআরের ভেতরে একজন স্বাধীন পরিচালক রাখা প্রয়োজন। এনবিআরকে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে যে দুটি ভাগ করা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে সেগুলো বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার ‘দুর্বল পদক্ষেপ’ নিয়েছে। নবনিযুক্ত গভর্নরের সঙ্গে যে বিষয়গুলো (খেলাপি ঋণ ও বিশেষ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ) যুক্ত হয়েছে, সরকার চাইলে এ ধরনের সমালোচনা এড়াতে আরও ভালো নিয়োগ দিতে পারত। সে ধরনের লোকবল সরকারের হাতে ছিল। তার মতে, নতুন গভর্নরের নিয়োগ প্রক্রিয়াটিও অস্বচ্ছ ছিল। আর্থিক খাতের সংস্কারে সাবেক গভর্নরের ভূমিকার প্রশংসা করে সিপিডির এই গবেষণা পরিচালক বলেন, আর্থিক খাতে যে সংস্কারগুলো হয়েছে, তা অনেকটাই গভর্নরের ব্যক্তি উদ্যোগে হয়েছে। তিনি এ খাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ছিলেন। সংস্কার সব সময়ই বাধার সৃষ্টি করে এবং এর পেছনে স্বার্থগোষ্ঠী কাজ করে। কিন্তু তিনি নিজস্ব যুক্তি-তর্ক দিয়ে সংস্কার এগিয়ে নিয়েছিলেন। আমি এখনো মনে করি, আর্থিক খাতের সংস্কার ও ফিরে আসার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে নতুন সরকারের উচিত ছিল উনার মতো ব্যক্তিকে সঙ্গে রাখা (কনটিনিউ করা)। বাংলাদেশে গভর্নর নিয়োগের কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। শুধু ন্যূনতম বয়সসীমা ৩৫ বছর দেওয়া আছে। আগামী দিনে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি আইনবদ্ধ ও মানদণ্ড ভিত্তিক করা উচিত। এক্ষেত্রে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের (আরবিআই) উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আরবিআই-তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি কমিটি থাকে, যারা অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা, প্রতিষ্ঠান চালানোর সক্ষমতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা (মাস্টার্স বা পিএইচডি) বিবেচনা করে প্রার্থী বাছাই ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। এরপর সরকারের কাছে সুপারিশ করে। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, রাজনৈতিক সরকার তাদের ইশতেহারে কিছু নীতি ও প্রতিশ্রুতির কথা জানায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয় না। মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনের কারণগুলোর অন্যতম প্রশাসনিক পর্যায়ে অনাগ্রহ এবং আইনগত জটিলতা। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খন্দকার মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার শুধু নির্বাহী বিভাগ নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু সরকারের কাজের তদারকির জন্য জাতীয় সংসদের দায়িত্ব রয়েছে। জাতীয় সংসদ ভূমিকা পালন করলে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সহজতর হবে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে আসছে বিশেষ অধ্যাদেশ সরকারি সম্পত্তিতে ব্যবসার সুযোগ

সরকারি সম্পত্তিতে ব্যবসার সুযোগ

কারুপণ্য পেল ‘রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’ কর্মক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পরিবেশ রংপুর থেকে বিশ্বজয়

কর্মক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পরিবেশ রংপুর থেকে বিশ্বজয়

ব্যাংককে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর বিষয়ে প্রস্তাবনা সহজ শর্তে ঋণের ওপর গুরুত্ব আইএমএফের

সহজ শর্তে ঋণের ওপর গুরুত্ব আইএমএফের

জুলাই যোদ্ধা বানিয়ে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা

জুলাই যোদ্ধা বানিয়ে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম