কারুপণ্য পেল ‘রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’
কর্মক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পরিবেশ রংপুর থেকে বিশ্বজয়
সবুজায়ন সমন্বয়ে অভিভূত বিচারকরা * স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম হিসাবে স্বীকৃতি
Advertisement
রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুরে অবস্থিত কারুপণ্যের এই ‘গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি’ অর্জন করেছে রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ। সম্প্রতি তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রংপুর কারুপণ্য লিমিটেডের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি। এই প্রতিষ্ঠানের ভবনের নকশায় এমন কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, যেখানে কর্মীদের সুস্থতা ও কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতিকে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক স্তরবিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আর এতেই কারুপণ্য জিতে নিয়েছে রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (রিবা) ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ।
রিবার বিচারক দলের প্রধান বিজয় জৈন তার মূল্যায়নে কারখানার বিশাল কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই প্রবেশপথ শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও মালিক-সবাই ব্যবহার করেন। সবার জন্য একই প্রবেশপথ রাখার বিষয়টিকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘সমতার ভিত্তিতে সবার জন্য উন্মুক্ত অভিন্ন প্রবেশদ্বার’ হিসাবে।
ফ্যাক্টরি ভবনটির নকশা ও পরিবেশ নিয়ে বিচারকরা অভিভূত হয়েছেন। দূর থেকে এটি সবুজে ঘেরা পাহাড়ের মতো মনে হয়। এক লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুটেরও বেশি জায়গাজুড়ে স্থাপিত কারখানাটির নকশায় প্রাকৃতিক সবুজের সমন্বয় করার জন্য বিশেষ প্রশংসা করেছে রিবা। সংস্থাটি জানিয়েছে, পরিকল্পিত বাগান, সবুজে ঘেরা বারান্দা এবং গাছপালায় আচ্ছাদিত প্রধান দেয়াল-এসবের মাধ্যমে ‘প্রকৃতিকে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয়েছে’।
সাততলা গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি ভবনের বিশেষত্ব হিসাবে জুরি বোর্ড তাদের মন্তব্যে বলেছে-এটি ‘নীরব বিনয়ের এক অনন্য নিদর্শন’। এই শ্রমবান্ধব স্থাপনায় নারী শ্রমিকদের দিকে বেশি নজর দিয়ে নানামুখী কাজ করা হয়েছে। কয়েক হাজার প্রজাতির গাছপালায় সজ্জিত, দৃষ্টিনন্দন, শান্ত পরিবেশ কারাখানার সম্মুখভাগ, পাশে পুকুর। এর ধার ঘেঁষে চলাচলের হাঁটাপথ। এ এক অরূপ নান্দনিক স্থাপত্য, বাংলাদেশের কারাখানা থেকে বিশ্বের প্রায় ৭৩টি দেশে তৈরি শতরঞ্জি (কার্পেট) সরবরাহ করা হয়। এটি মূলত শতরঞ্জি তৈরির কারখানা হিসাবে স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম শীর্ষ পুরস্কার অর্জন করেছে। একই সঙ্গে এটি তুলে ধরেছে, একটি শিল্পকারখানা শুধু উৎপাদনের স্থান নয়-শ্রমিকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা, পারিবারিক জীবন ও মানসিক স্বস্তির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েও গড়ে তোলা সম্ভব।
কারখানাটি ২০১৭ সালে চালু হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারিসহ বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে রিবার বিচারক দল এ বছরই প্রথম কারখানাটি পরিদর্শন করে। বাংলা ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রকল্পটির নকশা করেছে বাংলাদেশের স্থাপত্য নকশা প্রতিষ্ঠান ‘নকশাবিদ আর্কিটেক্টস’।
কারখানার প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর অধিকাংশই নারী। এই নারী কল্যাণকে কেন্দ্র করে কারখানাটি নির্মাণ করায় স্থপতিদের বিশেষ প্রশংসা করেছে বিচারক দল। শ্রমিকদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। এর মধ্যে রয়েছে ছাদে শিশুদের পরিচর্যাকেন্দ্র, নিজস্ব চিকিৎসাকেন্দ্র এবং অবসর সময়ে সামাজিক যোগাযোগের জন্য ছায়াঘেরা স্থান।
কারখানার প্রবেশপথে স্থাপন করা হয়েছে এক নারীর বিশাল ভাস্কর্য। স্থপতিদের ভাষ্য অনুযায়ী-এটি ‘নারীর ক্ষমতায়নের শক্তি’র প্রতীক। শ্রমিকদের পরিবারের জন্যও রয়েছে মিলনস্থল। রিবার তথ্য অনুযায়ী, কর্মীরা প্রায়ই কর্মঘণ্টার বাইরেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কারখানার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করেন। রিবার মতে, এই প্রকল্প কারখানার নকশা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি ‘বিকল্প মডেল’ উপস্থাপন করেছে।
এক বিবৃতিতে নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার বলেন, তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন-শিল্পও প্রাণবন্ত হতে পারে, মানুষকে লালন করতে পারে এবং অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে। একটি কারখানা এমন যন্ত্র হওয়া উচিত নয়, যা মানুষের শক্তি নিঃশেষ করে দেয়; বরং এটি হওয়া উচিত এমন-একটি জীবন্ত স্থান, যা মানুষের শক্তি পুনরুদ্ধার করে।’
গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি এমডি সফিকুল আলম সেলিমের ধারণা থেকেই এই স্থাপনাটির নকশা করা হয়। এর ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার সাইদুল হক জুইস। পুরস্কারের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত চারটি ভবনের তালিকায় ঢাকার জলবায়ু-সংবেদনশীল নকশায় নির্মিত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল। অন্য দুই চূড়ান্ত প্রতিযোগী ছিল বেলজিয়ামের দুটি ভবন। রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজকে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্থাপত্য পুরস্কার হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
