তৃতীয় কিস্তি
জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প
Advertisement
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গণভবনকে আমরা যেভাবে পেয়েছিলাম : এই মিউজিয়ামের বিষয়ে একটা বড় দার্শনিক সিদ্ধান্ত আসে চিফ অ্যাডভাইজার প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে আমার একান্ত বৈঠকের পর। আমাদের কাজের ধরন ছিল একসঙ্গে বসে ব্রেইনস্টর্মিং। সেখানে তিনি বললেন, এই যে মানুষের ক্ষোভের চিহ্ন লেগে আছে গণভবনে, এটা না মুছে কীভাবে মিউজিয়ামটা করা যায় সেটা ভাবো, ফারুকী।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, এগজাক্টলি এ কথাটা গণভবন পরিদর্শনের সময় আমি মেরিনা আপা এবং তানজিমকে বলেছি। ওই মিটিংয়েই এটা আমাদের একটা দার্শনিক ফাউন্ডেশন হয়ে গেল। এর ভিত্তিতেই অনেক ক্রিয়েটিভ ডিসিশন হয় এরপরে।
সেই অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ৫ আগস্টে ক্ষোভের চিহ্ন মুছে ফেলা যাবে না। পাশাপাশি গণভবনকে আমরা যেভাবে পেয়েছিলাম, সেটাকেও জাদুঘরের এক্সিবিট করতে হবে। তাই ভবনের সেই অবস্থাকে আমরা থ্রি-ডি স্ক্যান করে রাখলাম। মেইন মিউজিয়ামে ঢোকার মুখে দুপাশে সেই স্ক্যান রাখা হয়েছে। যে কেউ জয়স্টিক দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে পারবেন, ৫ আগস্ট জনতা গণভবনকে কী অবস্থায় রেখে গিয়েছিল।
হাসিনা ইউনিভার্স : এটা পার হয়ে জাদুঘরের প্রথম ঘর। ঘরটার নাম-‘হাসিনা ইউনিভার্স’। আমরা দেখাতে চেয়েছি, একজন ফ্যাসিস্টের ইউনিভার্সটা আসলে কী ছিল। ঘরের মধ্যে একটা বিশাল গোল গ্লোবের মতো স্ট্রাকচার। সেই গ্লোবজুড়ে হাসিনা এবং তার সভাসদদের বিভিন্ন ভিজ্যুয়াল কোলাজ। আর গ্লোবের সামনে হাসিনার মুখের একটা স্কাল্পচার।
তানজিম ওয়াহাব আমাকে আশিক নামে একজন স্কাল্পচারের কাজ দেখাল। তার স্কাল্পচারগুলোর একটা ইন্টারেস্টিং বৈশিষ্ট্য ছিল-মুখ তৈরি করেন, কিন্তু মুখের মাঝখানটা ফাঁকা রাখেন। আমার কাছে আইডিয়াটা খুব ইন্টারেস্টিং লাগল। আমি বললাম, হাসিনারও এরকম একটা মুখ করেন। কিন্তু মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় একটা চেয়ার বসিয়ে দেন। কারণ, দ্যাটস হোয়াট শি কেয়ার্ড ফর। তার কাছে দেশ, দেশের মানুষ, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব-কিছুই ম্যাটার করেনি। ম্যাটার করেছে শুধু চেয়ার। ফলে হাসিনার মুখের মাঝখানে বসে গেল একটা চেয়ার। আমার মনে হয়, একটা স্কাল্পচারের মধ্যে ওই একটা চেয়ারই অনেক কথা বলে দেয়।
এর পেছনের বিশাল গ্লোবটার ভিজ্যুয়াল কোলাজ তৈরি করছিল দেবাশিস চক্রবর্তী এবং জাহিন ফারুক আমিন। কিন্তু হাসিনার নিজের অংশে কী কথা লিখব তা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অনেক দিন মিটিং করতে করতে হঠাৎ আমার মাথায় এলো-হাসিনার গোটা জীবনকে যদি সিদ্ধ করে গরম পানি ফেলে দেওয়া হয়, শেষে কী থাকে?
‘আমি, আমি, আমি।’
‘তোমাদের কে খাওয়ায়?’
‘আমার বাবা। আমার বাবা। আমার বাবা।’
ব্যস।
ফলে গ্লোবের একটা অংশজুড়ে লেখা হলো-‘আমি, আমি, আমি, আমি, আমি।’ আরেক জায়গায়-‘তোমাদের কে খাওয়ায়? কে খাওয়ায়? কে খাওয়ায়?’ আরেক জায়গায়-‘আমার বাবা, আমার বাবা, আমার বাবা।’ আমার কাছে মনে হয়েছে, তার সারা জীবনের বক্তৃতা আর সংলাপ সিদ্ধ করে ফেললে শেষ পর্যন্ত এ তিনটাই পড়ে থাকবে।
-6aa63c1c637d2.jpg)
একই রুমে তার পরিবার, সভাসদ, গুম-খুনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা, তার ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট-এ পুরো ইউনিভার্সটাকেও আমরা ধরার চেষ্টা করেছি। তারেক সিদ্দিকী, জিয়াউল আহসান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ এ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্ররা সেখানে এসেছে। স্কাল্পচারগুলোর মুখের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় প্রত্যেকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদা সিম্বল রাখা হয়েছে। কোথাও ব্যাংক, কোথাও মানুষের খুলি, কোথাও টাকা। অর্থাৎ মুখটা দেখলেই শুধু মানুষটাকে না, সে কী রিপ্রেজেন্ট করে তাও যেন বোঝা যায়।
এ রুমের বাঁ দিকে হাসিনার একটা চেয়ার নিয়ে আরেকটি ইনস্টলেশন আছে। শিল্পী সাহেলা আক্তার উমামার শিল্পকর্ম। এর বেসিক আইডিয়াটাও তার। তানজিমরা সুপারভাইজ করেছে। নিজের ক্ষমতাকে প্রায় ঐশ্বরিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, নিজেকে মাবুদ ভাবার যে প্রবণতা-সেটাই এ ইনস্টলেশনের মূল কথা।
রিমেইনস অব ফ্যাসিজম : এরপর ডান দিকে ঢুকলেই বিশাল একটা রুম। এ রুমের ক্ষেত্রে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, গণভবনের ভাঙচুরের পর যে রাবলস পাওয়া গেছে, সেগুলো রুমের মেঝেতে ফেলে রাখা হবে। তার ওপর থাকবে কাচ। মানুষ সেই কাচের ওপর দিয়ে হাঁটবে, আর তার পায়ের নিচে থাকবে একটা ভেঙে পড়া ফ্যাসিস্ট শাসনের ধ্বংসাবশেষ। মানুষের ক্ষোভের ভাষা যেন এই রুমে এলেই ভিজিটররা টের পান। যাতে আর কেউ এরকম ফ্যাসিস্ট হওয়ার দুঃসাহস না করে।
রুমের দুই পাশের দেওয়ালের একটিতে ৫ আগস্টে গণভবন দখলে নেওয়া মানুষের ভিডিও এবং বিপরীত দেওয়ালে ওইদিনের রাজপথে মানুষের আন্দোলন দেখানো হবে। কোনো পরিষ্কার, সুন্দর পর্দায় না। প্রজেকশন হবে সরাসরি সেই ভাঙাচোরা দেওয়ালের ওপর। যাতে দেওয়ালের রেজ, ক্ষত, ভাঙচুর-সবকিছুর ওপর দিয়েই ছবিগুলো চলতে থাকে এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিই এ জাদুঘরের প্রদর্শনীতে গণভবনে প্রাপ্ত ফার্নিচারগুলোই ব্যবহার করব। এ আইডিয়াটিকে তানজিম আরও আর্টিস্টিক ও পলিটিক্যাল করে তোলেন। তিনি এ ফার্নিচারগুলোতেই ব্যবহার করেন সব ফটোগ্রাফ ও বিভিন্ন স্মারক।
এ কাচের ওপর হাঁটার আইডিয়াটা নিয়ে প্রথমদিকে সংশয় ছিল। আর্কিটেক্টরা, মেরিনা আপারাও ভাবছিলেন, এত বড় জায়গায় কাচের ওপর মানুষ হাঁটবে-এটা কীভাবে করা যাবে, নিরাপত্তা কী হবে। কিন্তু আমি মোটামুটি গোঁ ধরেছিলাম-না, এখানে মানুষকে কাচের ওপর দিয়েই হাঁটতে হবে।
কারণ আমি চাইছিলাম, আপনি যখন এ ঘরের মধ্যে হাঁটবেন, পায়ের নিচে ধ্বংসাবশেষ দেখবেন, দুই পাশের ক্ষতবিক্ষত দেওয়ালে ষোলো বছরের ফিল্মগুলো চলবে-তখন একটা গুজবাম্প হবে। ষোলো বছরকে আপনি শুধু তথ্য হিসাবে জানবেন না, ওই সময়টার একটা ফিলিংয়ের ভেতর দিয়ে হাঁটবেন।
এ রুমটার নাম কী হবে, তারও একটা গল্প আছে। জাদুঘরের কাজ যখন চলছিল, তখন আমাদের বিভিন্ন উপদেষ্টা এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রায়ই দেখতে আসতেন। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভাইও প্রায়ই আসতেন। জাদুঘরের বাইরে তখন পোড়া গাড়িগুলো স্ট্যাক করে আমরা একটা স্কাল্পচারের মতো বানাচ্ছিলাম। একদিন খলিলুর ভাই সেটা দেখে বললেন, ‘রেমন্যান্টস অব ফ্যাসিজম।’ কথাটা আমার মাথার মধ্যে থেকে গেল। এরপর তাকে নিয়ে জাদুঘরের ভেতরে ঢুকলাম। তখনো ষোলো বছরের এ রুমটার কোনো নাম আমরা দেইনি। রুমে ঢুকেই হঠাৎ আমার মাথায় এলো।
আমি বললাম, খলিলুর ভাই, আপনার কাছ থেকে একটু আগে একটা জিনিস চুরি করলাম। আপনি বাইরে গাড়িগুলো দেখে ‘রেমন্যান্টস অব ফ্যাসিজম’ বললেন না? অ্যাকচুয়ালি সেখান থেকে আমি একটা আইডিয়া পেলাম। এই যে ষোলো বছরের রুমটা, যেখানে কাচের নিচে একটা ভেঙে পড়া ফ্যাসিস্ট শাসনের রাবলস থাকবে, চারপাশে থাকবে ষোলো বছরের ইতিহাস-এ রুমটার নাম আমরা দিই ‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’।
এভাবেই রুমটার নাম হয়ে গেল-‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’। এখন গ্যালারিতে ঢুকলে দেখবেন, ওপর থেকে ফ্লোরে একটা প্রজেকশন পড়ে। সেখানে লেখা-‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’।
এরপর আমি বললাম, এ রুমের চারপাশে ষোলো বছরের হাইলাইটসও থাকতে হবে, অনেকটা গ্যালারি এক্সিবিশনের মতো।
গুম, খুন, নির্বাচনবিহীন নির্বাচনের নামে সার্কাস, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, বিচারিক হত্যাকাণ্ড, বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করা, লুটপাটতন্ত্র, ক্লেপ্টোক্রেসি, সংবাদপত্রের ওপর দমন-এগুলোর প্রত্যেকটার ওপর আলাদা আলাদা ডিসপ্লে থাকবে। আর রুমের মাঝখানে থাকবে গণভবনে পাওয়া বেশকিছু দলিল, যেগুলোতে দেখা যায় হাসিনা কীভাবে মানুষকে টার্গেট করতেন।
তানজিম এগুলো সাজানোর কাজ করল। প্রথমে একটা অন্য রকম স্ট্রাকচার করেছিল, তা-ও সুন্দর ছিল। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, এত কিছুর মধ্যে তা একটু হারিয়ে যাচ্ছে। তখন বললাম, একটা কালো ফ্রেমের স্ট্রাকচার করা হোক। পরে তানজিম সেটাকে সেভাবেই করল। ফাইনালি রুমটা খুবই ইফেক্টিভ একটা রুম হয়ে দাঁড়াল।
বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর : ফ্যাসিজমের ডিএনএ : ‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’ থেকে বের হয়ে বামে একটা করিডর আছে। এ করিডরটা আমার করার ইচ্ছা ছিল ‘বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর’। অর্থাৎ বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরে কী কী হয়েছে, তার হাইলাইটসগুলো দিয়ে এ করিডরটা তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল।
এ লক্ষ্যে আমরা রিসার্চও কমপ্লিট করেছিলাম। একটা আলাদা রিসার্চ টিম এ কাজটা করেছিল। তারা আমাদের মিউজিয়ামের সঙ্গে সরাসরি কাজ করত না। তানজিমও ছিল। আমরা মিটিংয়ে বসে ঠিক করেছিলাম কীভাবে কাজটা হবে। এ করিডরের জন্য আমার নিজেকেও প্রচুর বই পড়তে হয়েছে। সেখান থেকে আমি বাছাই করা বইগুলো তাদের দিয়েছি। কোন কোন জিনিস আমরা চাই, তাও বলে দিয়েছি। তারা সেখান থেকে সেগুলো বাছাই করেছে।
এ করিডরটা করার পেছনে আমার একটা পরিষ্কার চিন্তা ছিল। আপনি ‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’-এ হাসিনার ষোলো বছরের ফ্যাসিজম দেখলেন। সেখান থেকে বের হয়ে করিডরে আপনি দেখবেন আমাদের দেশে ফ্যাসিজমের প্রথম চেহারাটা-বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর। আমার কাছে ষোলো বছরের এ ফ্যাসিজমের ডিএনএ ছিল আসলে বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের ফ্যাসিজমের মধ্যে। সেই ডিএনএটা দেখানোর জন্যই আমি এ করিডরটা করতে চেয়েছিলাম।
রিসার্চ রেডি ছিল। আনফরচুনেটলি, শেষ পর্যন্ত আমি যখন দায়িত্ব থেকে সরে গেলাম, তারপর আর এটা করা যায়নি। কারণ উদ্বোধনের আগে বেশ কয়েক মাস আসলে চিফ কিউরেটর, রিসার্চার, প্রোডাকশন টিম মিউজিয়ামে কোনো কাজ করতে পারেনি। (চলবে)
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী : বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, চলচ্চিত্র নির্মাতা
