শেষ পর্ব
জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প
Advertisement
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
(জুলাই জাদুঘর কোন ভাবনা থেকে কীভাবে আজকের চেহারায় এসে দাঁড়াল, উদ্বোধনের আগে কোন কোন জিনিস বাদ পড়ল, সামনে এ জাদুঘর নিয়ে কী বা করা যায়-এসব নিয়ে প্রথমবারের মতো যুগান্তরের জন্য লিখেছেন সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, যিনি এ জাদুঘরের আর্টিস্টিক ডিরেক্টরের ভূমিকাও পালন করেছেন)
শেষ কিস্তি
হাসিনার অফিস এখন শহীদদের : প্রথম থেকেই একটা ব্যাপারে আমরা একমত ছিলাম হাসিনার অফিস রুমের মালিক এখন শহীদরা। রুমজুড়ে জুলাইয়ের শহীদদের ছবি থাকতে হবে। সে অনুযায়ী আবদুল হালিম চঞ্চল এবং জিহান করিম কাজ করে।
এর আগেও উল্লেখ করেছি জুলাই জাদুঘর এবং আইসিটির সঙ্গে প্রথম থেকেই একটা নিবিড় কাজের সম্পর্ক ছিল। একদিন তাজুল ভাই আমাকে ফোন করে বললেন, ভাই, আমাদের কাছে অজস্র ফোন রেকর্ডিং আছে, কল রেকর্ডিং আছে-জুলাই চলাকালে হাসিনা কী কী অর্ডার করেছে, কার সঙ্গে কী কথা বলেছে। এগুলো আমরা আপনাদের দিতে পারি। পরে এ অডিওগুলোর অনেক আল জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান পায় এবং ফরেনসিক্যালি ভেরিফাই করে। ফলে এ অডিওগুলো আমাদের কাছে একটা বিরাট সম্পদ হয়ে গেল। কিন্তু এগুলো নিয়ে কী করব?
আমরা প্রতিদিন মিটিংয়ে বসছি। বারবার চিন্তা করছি-এ অডিওগুলো মিউজিয়ামে কীভাবে দেখাব বা শোনাব? কোনো সলিউশন খুঁজে পাচ্ছি না। হঠাৎ একদিন একটা সমাধান নাজিল হলো। আমি মিটিংয়ের মধ্যে উঠে বলে উঠলাম, তানজিম ভাই, একটা কাজ করেন। এসব অডিও, হাসিনার কনভার্সেশন, একটা লাল ফোনে দিয়ে দেন। লাল ফোনটা হাসিনার টেবিলের ওপর থাকবে। আর ফোনের পাশে একটা ক্যাটালগ থাকবে। মানুষ সেই ক্যাটালগ দেখে নির্দিষ্ট নম্বর ডায়াল করবে। ডায়াল করে শুনতে পারবে-হাসিনা পুলিশের আইজিকে কী বলেছে, কবে গুলির অর্ডার দিয়েছে, কার সঙ্গে কী কথা হয়েছে, সবকিছু।
তানজিম ততদিনে আমার হুটহাট নতুন জিনিস নাজিল হওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যেমন একদিন হঠাৎ বললাম, তানজিম ভাই, আপনি আগামী তিন দিনের মধ্যে চায়না চলে যান। আমি চায়না মিউজিয়ামের সঙ্গে কথা বলছি। গ্লোব টিভি এবং ইমার্সিভ রুম করার জন্য ওখানে কিছু জিনিস দেখে আসেন। আমি ইনস্টাগ্রাম থেকে কিছু রেফারেন্স পাঠিয়ে বললাম, এগুলো দেখে আসেন। এগুলো আমাদের এখানে ইনস্টল করতে হবে। এখানে একটা কথা বলে নিই-তানজিম ওয়াহাব যেহেতু ওই জগতের লোক ফলে সেসব জায়গায় বেস্ট মানুষদের হেল্প নেওয়ার চেষ্টা করেছে। যেমন-প্রজেকশন এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক ইনস্টলেশনের ক্ষেত্রে শিল্পী জিহান করিম অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে।
তো লাল ফোনের আইডিয়াটা শুনে তানজিম আবার চিন্তায় পড়ল-এটা কীভাবে করবে? বলল, ভাই, আমাকে একটু সময় দেন। দুয়েক দিন পরে এসে বলল, ভাই, আমি সলিউশন পেয়েছি। বুয়েটের একটা টিম আছে। ওরা আমাদের এটা করে দিতে পারবে। এখন জাদুঘরে গেলে আপনারা সেই লাল ফোনটা দেখতে পারবেন। ক্যাটালগ দেখে নম্বর ডায়াল করে একটার পর একটা অডিও শুনতে পারবেন। আমার মনে হয়, হাসিনার অফিস রুমটা এখন মিউজিয়ামের অন্যতম ফ্যাকচুয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট এবং একইসঙ্গে অন্যতম আকর্ষণীয় রুম হয়ে উঠেছে।
এ রুমে নেত্র নিউজের করা জুলাইয়ের অসাধারণ ডকুমেন্টেশনও রাখা আছে।
একরামের মেয়ের দেওয়াল : হাসিনার অফিস রুমে এখন আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে। কক্সবাজারের একরামের কথা মনে আছে? যার ক্রসফায়ার সারা বাংলাদেশকে নাড়া দিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পরে তার মেয়ে ভীষণভাবে ট্রমাটাইজড হয়ে যায়। সে সারাক্ষণ দেওয়ালে বাবার সঙ্গে কথা লিখত, অনেক কিছু লিখে রাখত, ছবি আঁকত। সেখানে এমন অনেক কথা আছে, যেগুলো দেখলে বুক ফেটে যায়। একটা ছোট বাচ্চা কতটা ট্রমায় পড়লে দেয়ালে লিখতে পারে-‘আই হেইট মাই কান্ট্রি’।
এ দেওয়ালের ছবি তুলেছিল জোহান। ফটোগ্রাফার জীবন আহমেদও তুলেছিল। প্রথমে এ দেওয়ালের ছবিটা হাসিনার অফিস রুমে একটা র্যানডম জায়গায় লাগানো ছিল। আমি দেখে বললাম, এটা তুলে হাসিনার অফিস রুমে যে চেয়ারটা আছে, সেই চেয়ারের ঠিক পেছনের পুরো দেওয়ালজুড়ে ইন্সটল করে দাও। আর দুই পাশে থাকবে শহীদদের ছবি। সরকার নামের মনস্টার একটা ছোট বাচ্চাকে কোন পর্যায়ের ট্রমাতে ফেলতে পারে সেটা ওই দেওয়ালের লেখা পড়লে বোঝা যায়। সামনে হাসিনার সিংহাসন এবং পেছনে ছোট বাচ্চাটার ওইসব হৃদয়বিদারক দেওয়ালের লেখা। তখন জিনিসটার একটা অন্য মানে তৈরি হবে।
বহু মানুষ সেখানে গিয়ে কান্না আটকাতে পারে না।
শেষ অধ্যায় : এবার আসি দোতলায়। নিচতলার গল্প যেখানে শেষ, দোতলায় আমরা পুরোটা জুলাইয়ের গল্প বলতে চেয়েছি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই দেখবেন আবু সাঈদকে। উঠে প্রথম রুমটা ইমার্সিভ রুম। এখানে আপাতত আটটা ছবি আছে, সামনে আরও বাড়বে। আমাদের লক্ষ্য ছিল জুলাইয়ের যত অ্যাঙ্গেল আছে-মফস্বল, নারী, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, মাদ্রাসা, ডাক্তার, প্রবাসী, রাজবন্দি, রাজনৈতিক দল-প্রতিটা নিয়ে তিন-চার মিনিটের ইমার্সিভ ফিল্ম তৈরি করা। এ ছবিগুলো নির্মাণের জন্য জাহিন ফারুক আমিন এবং সালজার রহমানকে ধন্যবাদ জানাই।
এছাড়া করিডরজুড়ে আছে জুলাইয়ের ৩৬ দিনের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ছবি। অসাধারণ এসব ছবির জন্য জীবন আহমেদসহ সব ফটোগ্রাফারদের স্যালুট। জুলাই আমরা তাদের চোখেই দেখেছি। স্যালুট বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ ও মোজো জার্নালিস্টদেরও। এছাড়া দোতলায় আমরা হাসিনার বেডরুম, পাঁচ আগস্ট নিয়ে অগোপগোর টয় রুম, ৩৬ দিনের টাইমলাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ করে যেতে পারলেও, অনেক কাজ আমরা পুরো শেষ করে যেতে পারিনি।
পরিকল্পনা ছিল রাজনৈতিক দল, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, প্রবাসী, নারী ও আহতদের নিয়ে আলাদা সেকশন করা। কিছু হয়েছে, কিছু এখনো হচ্ছে। কোথাও কোথাও একটু পলিটিক্যালি ওভারকিল করা হয়েছে। কোথাও তাড়াহুড়া আছে। ওইসব জায়গায় প্রেজেন্টেশন দুর্বল। ফলে দোতলা এখনো আমার কাছে ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি মানুষ যায় হাসিনার বেডরুমে। আমরা চেয়েছি অফিস রুমের মতো তার বেডরুমটাও শহীদদের দখলে যাক। এখানে শহীদ ও আহতদের স্মারক রাখা হয়েছে। হাসিনার বিছানার চাদরের ওপর ৮৩৫ জন বীর শহীদের নাম খোদাই করা, পাশে একজন শহীদের রক্তাক্ত কাপড়। এ রুমে বহু মানুষকে আমি কাঁদতে দেখেছি। এরপর লাইব্রেরিতে আছে আবু সাঈদের টেবিল, যেখানে সে লিখে রেখেছিল-‘ডু অর ডাই।’ বিল্ডিং থেকে বের হয়ে ওয়াটার বডির দিকে গেলে দেখা যাবে জিয়াউল আহসানের গেস্টাপো কায়দায় মানুষ খুনের ডিসপ্লে। কীভাবে সে হাজারখানেক মানুষ খুন করেছে তার রিয়াল ফুটেজ, ছবি, স্কাল্পচার এবং বর্ণনা আছে।
সেখান থেকে ডান দিকে গেলে ‘বিল্ডিং ফ্রম দ্য স্ক্র্যাচ’-৫ আগস্টের পর সরকার নাই, পুলিশ নাই, সেই সময় ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ কীভাবে বাংলাদেশটা সামলেছে, তার গল্প ও স্মারক। সামনে হাঁটলে আছে আয়নাঘরের রেপ্লিকা। মূল আয়নাঘরের আদলে আর্ট ডিরেক্টর শিহাব নবী এটি তৈরি করেছেন। এখানে গুমের ভিকটিমদের গল্পও আছে। আর সবশেষে মুনসুন থিয়েটার। পিলখানা, গুম, আবরার ফাহাদ, জুলাই ম্যাসাকারসহ আমাদের তৈরি বিভিন্ন ডকুমেন্টারি এখানে নিয়মিত দেখানো হয়। এ রুমেই একসময় হাসিনা প্রেস কনফারেন্সের নামে মিথ্যাচার করত, সাংবাদিকরা তাকে তেল দিত। আজ সেই একই রুমে মানুষ বসে তার কুকীর্তির ইতিহাস দেখে-এই আইরনিটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এ অসাধারণ কাজগুলো বানানোর জন্য ধন্যবাদ জানাই অনম বিশ্বাস, কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়, রাকা নোশিন, শাহরিয়ার সজীব, দীপক গোস্বামী, নাজিম পলাশ, নাজমুল নবীন, মাহাথির স্পন্দন, ইয়াসির হক, সাদিয়া ইসলাম রোজা, সুকর্ণসহ আরও অনেককে। এগুলোর ম্যানেজমেন্ট এবং কমপাইলেশন দেখেছে শান্তা রহমান।
প্রথম থেকেই আমাদের পরিকল্পনা ছিল, জুলাই জাদুঘরকে আমরা একটা স্ট্যাটিক জাদুঘর হিসাবে ভাবব না। এটা যেন প্রতিনিয়তই নতুন জিনিস যোগ করে। জুলাই নিয়ে গবেষণা চলবে, নতুন নতুন কনটেন্ট তৈরি হবে। এবং সেগুলো শুধু জুলাই বা ষোল বছর নিয়ে নয়-আমাদের দেড়শ বছরের ইতিহাস নিয়েও। এটা যেন বাংলাদেশের কালচারাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ডিসকোর্সের একটা হাব হয়ে ওঠে। এটার রিসার্চ এবং কনটেন্ট ফান্ডিং নিয়ে আমাদের যে পরিকল্পনা ছিল সেটা বাস্তবায়ন করতে পারলে এটা শুধু জুলাই না, বাংলাদেশের কালচার ও পলিটিক্যাল ডিসকোর্সের সেন্টার হয়ে উঠবে।
শেষ করব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে। তার নির্দেশনাতেই নানামুখী ষড়যন্ত্রের পরও এ জাদুঘর মানুষের জন্য খোলা গেছে। এখানে উল্লেখ্য, ২০২৪-এর সেপ্টেম্বর তিনি গণভবনকে জুলাই জাদুঘরে রূপান্তর করার কথা বলেছিলেন। কাকতালীয় মিল হলো সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূসের নির্দেশনায় অন্তর্বর্তী সরকার একই সময়ে একই কাজের প্রস্তুতি চালাচ্ছিল। তাদের দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আরও ধন্যবাদ দিতে চাই সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান ও আসিফ নজরুলকেও। বিশেষ ধন্যবাদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে জাতীয় সংসদে এই জাদুঘরের গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দেওয়ার জন্য, এই জাদুঘরকে আমাদের ইতিহাসের সেইফগার্ড ভাবার জন্য। ধন্যবাদ রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সব রাজনৈতিক দলকে এই জাদুঘরটি পাশের জন্য। এবার আপনাদের আরেকটু ভূমিকা আমরা চাই-যাতে এ জাদুঘর নিয়ে যে প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল সেটা যেন বাস্তবায়িত হয়।
দ্রুত মিউজিয়াম এক্সপ্লেইনারসহ সব পদে নিয়োগ দিন। এ মিউজিয়ামের পরিকল্পনাই হয়েছে মিউজিয়াম এক্সপ্লেইনার মাথায় রেখে। অর্থাৎ প্রতিটি এক্সিবিট সাজানো হয়েছে এর সঙ্গে মিলিয়ে মিউজিয়াম এক্সপ্লেইনার কি স্টোরিটা বলবে সেটা মাথায় রেখে। এটা এতটাই ফান্ডামেন্টাল এই মিউজিয়ামের জন্য যে আমি যতদিন ছিলাম ভিআইপি গেস্ট বা বিদেশি অতিথিদের সামনে আমি মিউজিয়াম এক্সপ্লেইনারের কাজ করতাম। প্রধান উপদেষ্টা যখন তিন প্রধান দলের নেতাদের নিয়ে যান, তখনো আমি ছিলাম এক্সপ্লেইনার। কথা ছিল মিউজিয়াম এক্সপ্লেইনার নিয়োগের পর আমি নিজে ওদের ট্রেইনার হব। ট্র্যাজেডি এই যে এখনো কোনো এক্সপ্লেইনার তো দূরের কথা, নিয়োগই হয় নাই যদিও হাতে পাঁচ মাস সময় পাওয়া গিয়েছিল। এখন মিউজিয়াম চলছে জুলাই একদল নিবেদিত প্রাণ ভলান্টিয়ার দিয়ে। আর আছে আমাদের সব বিপদের মুখে ছাতা হয়ে থাকা মন্জুরুল ইসলাম নান্টু, ফারহান মাসুদ এবং অন্যরা। যারা এখনো প্রায় স্বেচ্ছাশ্রমই দিচ্ছেন।
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী : বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, চলচ্চিত্র নির্মাতা
