হুঁশিয়ারি মিঠুনের
২০২৬-এ জিততেই হবে, না হলে বিজেপির অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫, ০২:০০ পিএম
মিঠুন চক্রবর্তী। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পুরুলিয়ার মাটিতে বিজেপির জনসভা, আর সেই মঞ্চেই দলের ভেতরের আতঙ্ক যেন ফেটে পড়ল মিঠুন চক্রবর্তীর গলায়। দলের কর্মীদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কার্যত স্বীকার করলেন— আগামী ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হলে রাজ্যে বিজেপির অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে।
বৃহস্পতিবার পুরুলিয়া শহরের ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে আয়োজিত বিজেপির পরিবর্তন সভায় উপস্থিত ছিলেন বর্ষীয়ান নেতা রাহুল সিনহা এবং পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। তাদের সামনেই মিঠুনের কণ্ঠে শোনা গেল দলীয় ভবিষ্যৎ নিয়ে একরাশ উদ্বেগ। তার স্পষ্ট বক্তব্য, ২০২৬ সালের ভোটে আমাদের জিততেই হবে। যেভাবেই হোক জিততে হবে। কারণ এই ভোটে হার মানে আমাদের অস্তিত্বের শেষ।
এই বক্তব্যের পর থেকেই বঙ্গ রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, মিঠুন চক্রবর্তীর এই মন্তব্য আসলে বিজেপির রাজ্য সংগঠনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিভাজন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ক্রমহ্রাসমান জনভিত্তির এক অকপট স্বীকারোক্তি। বিগত কয়েক মাসে দলের মধ্যে নেতৃত্বহীনতা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় স্তরে তৃণমূলের সংগঠনিক দাপটে কার্যত হোঁচট খাচ্ছে বিজেপি। সেই প্রেক্ষিতেই ‘মহাগুরু’র বক্তব্য দলীয় কর্মীদের মনে আরও প্রশ্ন জাগিয়েছে— রাজ্যে আদৌ কি বিজেপির জয়ের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা আছে?
জনসভায় মিঠুন বলেন, আমি ফাইভস্টার হোটেলে থাকতে পারতাম, কিন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছি জেলায় জেলায়, কারণ একটা লক্ষ্য— ২০২৬-এ জিততেই হবে।
তিনি বলেন, যেখানে মনোমালিন্য আছে, তা মিটিয়ে ফেলুন। ভোট পর্যন্ত অন্তত এক থাকুন। আমরা জিতলে আপনারাও জিতবেন।
মঞ্চে মাথায় কালো টুপি, চোখে কালো চশমা, গলায় গেরুয়া রঙের উত্তরীয়, যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো নাটকীয় আবহ। কিন্তু তার কথায় ফুটে উঠল এক গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতা— রাজ্যের রাজনীতিতে বিজেপির প্রাসঙ্গিকতা এখন প্রশ্নের মুখে।
সম্প্রতি উত্তরবঙ্গে তিনি বলেছিলেন, দল চাইলে মুখ্যমন্ত্রী হব।
সেই মন্তব্যে যেমন দলের ভেতরে জল্পনা বেড়েছিল, তেমনি এইবারের পুরুলিয়ার সভায় তার হারলে অস্তিত্ব শেষ মন্তব্যে নতুন করে দানা বাঁধছে বিতর্ক। রাজ্যের বিজেপি শিবিরে কেউ কেউ বলছেন, এটি দলের কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করার এক কৌশল, আবার কেউ মনে করছেন, মিঠুন আসলে ভেতরের হতাশা প্রকাশ করে ফেলেছেন প্রকাশ্যে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে বিজেপির ভোটভিত্তি ক্রমশ নেমে এসেছে। একদিকে কেন্দ্রের নেতৃত্বে আস্থা হারাচ্ছে রাজ্যের কর্মীরা, অন্যদিকে তৃণমূলের সামাজিক প্রকল্প ও সংগঠনিক শক্তি ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে। অনেক জেলায় বিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতার অভিযোগ উঠছে। এরই মধ্যে মিঠুনের বক্তব্য যেন দলীয় অবস্থার এক খোলামেলা প্রতিবিম্ব।
এদিন সভায় উপস্থিত বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা অবশ্য ভিন্ন সুরে বলেন, তৃণমূল এখন প্রশাসনিক যন্ত্রকে ব্যবহার করছে। বিএলওদের ভয় দেখিয়ে তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করানো হচ্ছে। আমরা নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানাব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের অভিযোগ রাজ্যের মাটিতে খুব একটা প্রভাব ফেলছে না। কারণ ভোটারদের বড় অংশ এখন স্থানীয় ইস্যু, জীবিকার প্রশ্ন এবং উন্নয়নের হিসাবেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
মিঠুন চক্রবর্তীর বক্তব্যে বিজেপির নেতৃত্ব আপাতত মুখে কিছু না বললেও অন্তর্গত অস্বস্তি স্পষ্ট। রাজ্যের সংগঠনে যে ঐক্যহীনতা ও হতাশা তৈরি হয়েছে, তা আর লুকোনো যাচ্ছে না। বিশেষত যেভাবে তৃণমূল গ্রামীণ স্তরে আবারও শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে, তাতে বিজেপির জন্য লড়াইটা নিঃসন্দেহে কঠিন। দলের একাংশ মনে করছে, শুধুমাত্র কেন্দ্রের নেতৃত্ব বা মিঠুনের তারকাখ্যাতি দিয়ে রাজ্যের নির্বাচনি সমীকরণ বদলানো সম্ভব নয়।
বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখন প্রশ্ন একটাই— বিজেপি কি আদৌ নতুন করে জন আস্থা ফিরে পাবে, নাকি ২০২৬-ই হবে রাজ্যে দলের অস্তিত্বের পরীক্ষার শেষ অধ্যায়? পুরুলিয়ার সভায় মিঠুন চক্রবর্তীর কণ্ঠে যে উদ্বেগ ধরা পড়েছে, সেটিই যেন আজ বঙ্গ বিজেপির সার্বিক মানসিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। রাজ্যের রাজনৈতিক চিত্রনাট্যে মিঠুনের সেই একটিমাত্র সংলাপ— হারলে অস্তিত্ব শেষ। এখন রীতিমতো প্রতিধ্বনি তুলছে বাংলার প্রতিটি রাজনৈতিক অঙ্গনে।

