Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় কি ভারতীয় গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত?

Advertisement

Icon

নিলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় কি ভারতীয় গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত?

Advertisement

ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়া এবং হিন্দুত্ববাদ ও ‘ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে।

ভারতের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনগুলোর ফলাফল দেশটির সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক অধ্যায় তৈরি করেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে—১০ কোটিরও বেশি মানুষের এই সীমান্ত রাজ্যে—যেখানে দীর্ঘকাল ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অগ্রযাত্রা থমকে ছিল।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলা দখল করল বিজেপি। এখন পর্যন্ত ঘোষিত ২৯৩টি আসনের মধ্যে তারা পেয়েছে ২০৭টি, আর তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৮০-তে। একটি আসনে পুনরায় ভোট গ্রহণ হবে।

বিজেপির এই বিশাল বিজয় ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে। তবে এই ফলাফল একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর ও মৌলিক প্রশ্নও তুলে দিয়েছে।

নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) ভোটার তালিকার একটি ব্যাপক ও বিতর্কিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম চালায়। কমিশন বলেছিল—নকল, মৃত বা ‘অযোগ্য’ ভোটারদের বাদ দিতেই এই উদ্যোগ। পশ্চিমবঙ্গজুড়ে প্রায় ৯০ লাখ নাম—যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ—শুরুতেই এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসে, যার বড় অংশই শেষ পর্যন্ত বাদ পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম, অভিবাসী শ্রমিক এবং দরিদ্র ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে; বিশেষ করে সেই সব জেলায় যেখানে বিজেপি ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে ছিল। বিজেপির জয়ী হওয়া অনেক আসনেই দেখা গেছে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে অনেক বেশি।

এর ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। মনে হচ্ছে ভারত যেন নির্বাচনী বিকৃতি ছাড়িয়ে এখন ‘গণ-ভোটাধিকার হরণ’-এর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

বাংলা ভারতের অন্য দশটি রাজ্যের মতো নয়। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এই রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ২ হাজার ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি সীমান্ত রয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক মানসে বাংলার স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম এবং তারা ঐতিহ্যগতভাবে বিজেপির উত্থান ঠেকাতে কৌশলগত ভোট দিয়ে আসছিল।

ঠিক এই কারণেই মোদির কাছে বাংলা জয় এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

গত এক দশকে বিজেপি রাজ্যে দ্রুত বিস্তার ঘটালেও ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে ২০২৬ সালের এই নির্বাচনটি ছিল একই সঙ্গে মমতার দুর্বল হতে থাকা সরকারের ওপর গণভোট এবং ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতার এক কঠিন পরীক্ষা।

পুরো বিতর্কের মূলে ছিল ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া। ২০২৫ সালের জুনে বিহারে এটি প্রথম চালু হয় এবং পরে পশ্চিমবঙ্গসহ নয়টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

এই প্রক্রিয়ায় বুথ লেভেল অফিসাররা (বিএলও) বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার যাচাই করেন। নাগরিকদের অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে নথিপত্র দিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রমাণ করতে বলা হয়। ব্যর্থ হলে ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়ার নিয়ম করা হয়।

১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে সর্বজনীন ভোটাধিকার গ্রহণের পর এই প্রথম ভারতে ভোটাধিকার প্রমাণের দায়ভার রাষ্ট্রের বদলে খোদ নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি গণতান্ত্রিক চুক্তির এক বিপজ্জনক লঙ্ঘন।

এই প্রক্রিয়া অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর চরম আঘাত হেনেছে। বিহার ও বাংলা ভারতের অভিবাসী শ্রমের অন্যতম বড় উৎস। লাখ লাখ মানুষ ভিন রাজ্যে কাজ করেন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের পক্ষে বাড়ি ফিরে নথিপত্র দেখানো সম্ভব ছিল না। এছাড়া নামের বানান ভুল, উত্তরাধিকার নথির অভাব বা বিয়ের পর পদবি পরিবর্তনের মতো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়েন অনেকে। বিশেষ করে মুসলিম এবং দরিদ্র নারীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা ছিল প্রকট।

নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, এটি ছিল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। অন্যদিকে বিজেপি একে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আসা কথিত নথিপত্রহীন মুসলিমদের হঠানোর উপায় হিসেবে প্রচার করেছে।

কিন্তু বাংলায় এই পুরো কার্যক্রম একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভিযানের রূপ নেয়। যেসব জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি, সেখানেই ভোটার বাদ পড়ার হার ছিল সর্বোচ্চ। এআই-চালিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে উর্দু, বাংলা ও ইংরেজি বানানের অসংগতি খুঁজে বের করে মুসলিমদের নাম বেশি করে ‘ফ্ল্যাগ’ করা হয়।

তৃণমূল কংগ্রেস বারবার অভিযোগ করেছে যে, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে কাজ না করে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

ভারতের সুপ্রিমকোর্ট কয়েকবার হস্তক্ষেপ করলেও শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। ভোটার তালিকা থেকে নাম উধাও হওয়ার পর লাখ লাখ মানুষ আপিল করেছিলেন। কিন্তু ভোটের আগে প্রায় ৩৪ লাখ আপিল ঝুলে ছিল, যার মধ্যে মাত্র ২ হাজারেরও কম নিষ্পত্তি হয়েছে। আদালত রায় দেন যে, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন না। এই রায়ের মাধ্যমে কার্যত বিশাল পরিসরে ভোটাধিকার হরণকে বৈধতা দেওয়া হলো।

ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও এই প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছি। উত্তর প্রদেশে আমার পরিবারকে ভোটার তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখতে পুনরায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়েছে। বাংলার তুলনায় সেখানে সময় কিছুটা বেশি পাওয়া গেলেও পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল হয়রানিমূলক। বয়স্ক মানুষ, অভিবাসী এবং দরিদ্রদের জন্য এই আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধা অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব ছিল। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্বীকার করেছেন যে, হিন্দু ভোটারদের তুলনায় মুসলিমদের নাম বাদ পড়ার ভয় ছিল অনেক বেশি।

শেষ পর্যন্ত বাংলায় প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ পড়ে। নির্বাচনের দিন আরও কয়েক লাখ মানুষের আপিল অমীমাংসিত থেকে যায়।

বিজেপি মোট ভোট পেয়েছে ২,৯২,২৪,৮০৪টি, যা তৃণমূলের (২,৬০,১৩,৩৭৭) চেয়ে ৩২,১১,৪২৭টি বেশি। আসনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিজেপি যেসব আসনে জিতেছে, সেখানে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাপিয়ে গেছে।

তাই এই দাবি করা সংগত যে, নির্বাচনী ফলাফল রাষ্ট্রযন্ত্র ও নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় ‘ছিনতাই’ হওয়ার সন্দেহ অমূলক নয়। যদিও কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল নিরপেক্ষ থাকা।

বিজেপির এই বিজয় সম্ভব হয়েছে একটি কট্টর হিন্দুত্ববাদী প্রচারণার মাধ্যমেও, যেখানে মমতার সরকারকে ‘মুসলিম তোষণকারী’ হিসেবে অতিরঞ্জিত করে হিন্দুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা হয়েছিল।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পর বিজেপি তাদের নির্বাচনী কৌশলে পরিবর্তন আনে। এর একটি অংশ ছিল আসন সীমানা পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন), যা উত্তর ভারতের হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকাগুলোর অনুকূলে যাবে। আসামেও এই সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে মুসলিমদের নির্বাচনী প্রভাব কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো এই ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া, যার বড় প্রভাব দেখা গেল বাংলায়। আর তৃতীয়টি হলো ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ ব্যবস্থা। প্রশাসনিক সংস্কার বলা হলেও, এর লক্ষ্য হলো মোদির হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা এবং আঞ্চলিক দলগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া।

এই সব উন্নয়ন একত্রে এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে স্থায়ীভাবে বদলে ফেলার চেষ্টা চলছে। ভারতের বিশাল অংশ এখন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের কব্জায়। নির্বাচনী ও গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে ভারতের বর্তমান ধারণা ও ভাবমূর্তি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তার জায়গায় জেঁকে বসছে এক কর্তৃত্ববাদী ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ব্যবস্থা।

 লেখক: দিল্লিভিত্তিক লেখক ও সাংবাদিক। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তার লেখা উল্লেখযোগ্য বই ‘নরেন্দ্র মোদি: দ্য ম্যান, দ্য টাইমস’।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

নির্বাচনি দৌড় থেকে সরে দাঁড়ালেন ইসরাইলের সাবেক সেনাপ্রধান

নির্বাচনি দৌড় থেকে সরে দাঁড়ালেন ইসরাইলের সাবেক সেনাপ্রধান

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: দুই প্রার্থীসহ চারজনকে শোকজ

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: দুই প্রার্থীসহ চারজনকে শোকজ

ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে বাড়তি নিরাপত্তা, থাকবে তিন গুণ ফোর্স

ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে বাড়তি নিরাপত্তা, থাকবে তিন গুণ ফোর্স

বাবরি মসজিদ বানাতে চাওয়া হুমায়ুনের আসনে বিজেপির জয়

বাবরি মসজিদ বানাতে চাওয়া হুমায়ুনের আসনে বিজেপির জয়

পাঁচ হাজার মুসলিমের খাবার পানি বন্ধের অভিযোগ বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে

কলকাতা পাঁচ হাজার মুসলিমের খাবার পানি বন্ধের অভিযোগ বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ, কে কোন প্রতীক পেলেন?

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ, কে কোন প্রতীক পেলেন?

আরও পড়ুন

ইউক্রেনকে বিপুল সহায়তা দিয়েও কিছু পায়নি যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

ইউক্রেনকে বিপুল সহায়তা দিয়েও কিছু পায়নি যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

রাজপরিবারের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে চান হ্যারি

রাজপরিবারের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে চান হ্যারি

রয়টার্সের প্রতিবেদন চরম সংকটে ফ্রান্স, পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াতে পারে?

চরম সংকটে ফ্রান্স, পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াতে পারে?

ফ্রান্সের পথ ধরে এবার বড় ধরনের শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে দুই কারণ

ফ্রান্সের পথ ধরে এবার বড় ধরনের শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে দুই কারণ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম