ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা: মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান কি পিছু হটল?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:০৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কয়েক মাস ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে অন্যতম মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছিল পাকিস্তান। তবে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় ইসলামাবাদের সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ কার্যত থমকে গেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, একসময় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর সম্ভাবনাময় কাঠামো হিসেবে বিবেচিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এখন প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হওয়ায় এবং কোনো পক্ষই আলোচনায় ফিরতে আগ্রহী না হওয়ায় পাকিস্তান এখন ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের’ কৌশল নিয়েছে।
পাকিস্তান শুরু থেকেই মনে করেছিল, কয়েক দশকের অবিশ্বাস একটি সমঝোতা বা কয়েকটি বৈঠকের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। তাদের লক্ষ্য ছিল সীমিত—দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা এবং সামরিক সংঘাতকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা।
কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিনির্ধারকদের ধারণা, দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক উদ্যোগ কয়েক দিনের মধ্যেই ভেস্তে গেছে।
এর আগে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর যখনই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, পাকিস্তান ও কাতার দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে।
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সীমিত পাল্টাপাল্টি হামলা চালালেও পাকিস্তান ও কাতারের সমন্বিত উদ্যোগে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে ফিরতে সম্মত হয়। পরে দোহায় পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফনের পর কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা আবার শুরু হবে।
তবে দাফন সম্পন্ন হওয়ার আগেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ইরান তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান শুরু করলে সংঘাত নতুন মাত্রা পায় এবং পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এরপর থেকে দুই পক্ষের কেউই উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেয়নি। বরং সামরিক অভিযান বেড়েছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষের বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের তুলনামূলক নীরবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগের মতো প্রকাশ্যে মধ্যস্থতার নেতৃত্ব না দিলেও পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইরান ও অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। তবে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা এখন অনেকটাই কমে গেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিবর্তনের কারণ দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়া নয়; বরং দীর্ঘ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ইসলামাবাদের হতাশা। পাকিস্তান মনে করছে, সংলাপের পরিবেশ তৈরিতে তারা উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালালেও ওয়াশিংটন ও তেহরান বর্তমানে আলোচনার চেয়ে সামরিক কৌশলকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইসলামাবাদের মূল্যায়ন, উভয় পক্ষ যদি মনে করে সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কৌশলগত সুবিধা অর্জন সম্ভব, তাহলে বাইরের কোনো মধ্যস্থতাই সফল হবে না।
একটি আঞ্চলিক দেশের এক কূটনীতিকের ভাষ্য, দুই পক্ষই এখন পরীক্ষা করে দেখতে চাইছে, আলোচনা যেখানে ফল দেয়নি, সেখানে সামরিক শক্তি কতটা সফল হতে পারে। যখন তারা বুঝবে যে যুদ্ধ স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না, তখনই অর্থবহ কূটনীতির সুযোগ তৈরি হবে।
তবে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি। কাতারের সাবেক আমিরের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির দোহা সফর নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে।
পাকিস্তান ও কাতার এখনো এমন কয়েকটি দেশের মধ্যে রয়েছে, যারা একই সঙ্গে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
তবে ইসলামাবাদের ধারণা, সামরিক অভিযান বন্ধে দুই পক্ষের প্রকৃত আগ্রহ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো মধ্যস্থতা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সে কারণে পাকিস্তান আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটির বিশ্বাস, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান উপলব্ধি করবে যে সামরিক উত্তেজনা আর কোনো কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে না, তখনই কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা আবার সামনে আসবে। সেই সময় এলে পাকিস্তান পুনরায় মধ্যস্থতার ভূমিকা পালনে প্রস্তুত থাকবে। ততদিন পর্যন্ত ইসলামাবাদ সক্রিয় উদ্যোগের পরিবর্তে ধৈর্যের কৌশলই অনুসরণ করবে।
সূত্র: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন
