ভারতে ৬ শতাব্দী পুরোনো মসজিদ ভাঙা ঠেকাতে ২ সপ্তাহ ধরে পাহারায় হাজারো মুসলিম
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে ঐতিহাসিক শাহি মসজিদ ভাঙার বিরোধিতা করে শত শত মুসলিম মসজিদের ভেতরে জড়ো হয়েছেন। এই মসজিদ ৬০০ বছরের পুরোনো বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। সেই মসজিদে গত রোববার মাঝরাতে বুলডোজার চালানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে জানা গেছে। ভারী পুলিশ মোতায়েন ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা সেই অভিযান থামিয়ে দিয়েছেন বলে খবরে বলা হয়েছে।
২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভ উপলক্ষে সড়ক চওড়া করার একটি প্রকল্প চলছে। কুম্ভ হিন্দুদের একটি তীর্থযাত্রা। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে মসজিদের একটি অংশ ভেঙে ফেলার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
মসজিদের ভেতরে অবস্থান নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা তৌকীর খান মাকতুব মিডিয়াকে জানান, দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তারা এভাবে আছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ সর্বসম্মতিতে ঠিক করেছে যে তারা বিপুল সংখ্যায় পালা করে মসজিদের ভেতরে বসে থাকবে, যাতে মসজিদ ভাঙা না পড়ে। সব সময় অনেক মানুষ মসজিদের ভেতরে থাকে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও সময়মতো হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত রাতে পুলিশ বাহিনী বাড়ানো হয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বুলডোজারও আনা হয়েছিল। কিন্তু মসজিদের ভেতরে ও বাইরে অনেক মানুষ জড়ো হলে অভিযান থেমে যায়।’
মসজিদ নিয়ে বিরোধ চলছে। তাই এর বিষয়গুলো দেখাশোনার জন্য এগারো সদস্যের ‘মসজিদ নুমাইন্দা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্মতিতে এই কমিটি হয়েছে। এই কমিটিই পালা করে ভেতরে বসে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইন্দোরের বিশিষ্ট আলেম মুফতি জুনাইদ মাকতুবকে বলেন, বিরোধ চলার মধ্যেই প্রশাসন ভাঙার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ আছে। তাই মুসলিমরা মসজিদে জড়ো হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই মসজিদ ভেঙে ফেলা হলে আরও ২৮টি মসজিদ লাইনে আছে। তারাও নিশানায় চলে যাবে। এটা স্বৈরাচারী কাজ। কোনো কিছুর পথে বাধা হচ্ছে, শুধু এই কারণে তারা একের পর এক মসজিদ ভাঙতে পারে না। এটা ভিত্তিহীন এবং অর্থহীন যে এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য ধর্মের অস্তিত্বই পুরোপুরি মুছে ফেলা হবে।’
মুফতি জুনাইদের অভিযোগ, কুম্ভ উপলক্ষে শহরকে নতুন রূপ দিতে গিয়ে উজ্জয়িনের বেশ কয়েকটি পুরোনো মসজিদ ঝুঁকিতে আছে। তিনি বলেন, ‘সেখানে অনেক মুসলিম বসবাস করেন। অনেক পুরোনো মসজিদও আছে। আমরা কীভাবে সেগুলো ভাঙতে দিতে পারি?’
আগে উজ্জয়িনের তাখিয়া মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। সে কথা তুলে মুফতি জুনাইদ বলেন, প্রশাসন মুসলিমদের বারবার আশ্বাস দিয়েছিল যে মসজিদ ভাঙা হবে না। অভিযোগ, এরপর হঠাৎ করেই সেটি ভেঙে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘তারা (সরকার) বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং তাখিয়া মসজিদ ভেঙে দিয়েছে। শাহি মসজিদের প্রশ্ন এলে মুসলিমরা তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি মানতে রাজি হননি। তারা নিজেরা জড়ো হয়ে মসজিদ রক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
প্রস্তাবিত ভাঙার বিরুদ্ধে মসজিদ কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিল। মুফতি জুনাইদের অভিযোগ, এরপর প্রশাসন দাবি করে যে ভাঙার অনুমতি দিয়ে আদালতের আদেশ তাদের কাছে আছে। তিনি বলেন, ‘মসজিদ ভাঙা যাবে, এমন কোনো আদালতের আদেশ তাদের কাছে ছিল না। হাইকোর্ট শুধু ভাঙার আদেশে স্থগিতাদেশ দেওয়ার আমাদের আবেদন নাকচ করেছে। আদালত কোথাও বলেনি যে তারা মসজিদ ভেঙে ফেলতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার আমাদের অনেকবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমরা এভাবে একটির পর একটি মসজিদ ভাঙতে দিতে পারি না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের সঙ্গে লড়াই করতে পারি না। কিন্তু এখন আমাদের (মুসলিমদের) হাতে যত শক্তি আছে, তা দিয়ে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠান রক্ষা করব, এমনকি প্রাণ দিতে হলেও।’
মুফতি জুনাইদ আরও বলেন, ‘এখন আমরা ঠিক করেছি, তারা যদি বুলডোজার চালাতে চায়, তাহলে আগে আমাদের ওপর দিয়ে চালাক, তারপর মসজিদের ওপর চালাক। কারণ আমাদের ধর্মীয় স্থাপনা যদি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা কী করব?’
তিনি বলেন, ‘আমরা এ কথা প্রশাসনকেও জানিয়ে দিয়েছি। আমরা বলেছি, আমরা তাদের সঙ্গে লড়তে পারি না। তারা আমাদের গুলি করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে, আমাদের ওপর দিয়ে বুলডোজার চালাতে পারে। সেটা শেষ হলে আমাদের লাশের ওপর দিয়ে বুলডোজার পার করে তারা আমাদের মসজিদের ওপরও চালাতে পারে।’
শাহি মসজিদ প্রায় মহাকালেশ্বর মন্দিরের উল্টো দিকে, ক্ষিপ্রা নদীর কাছে। সড়ক ১৫ মিটার চওড়া করতে মসজিদের একটি অংশ ভাঙার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সম্প্রতি উজ্জয়িন পৌর কর্পোরেশনের ভাঙার নোটিশের বিরুদ্ধে করা দুটি আবেদন খারিজ করেছে। বিচারপতি সন্দীপ এন ভাট বলেন, প্রস্তাবিত পদক্ষেপ প্রযোজ্য আইনি বিধান মেনেই নেওয়া হয়েছে। মসজিদ যারা দেখাশোনা করেন, তাদের শুনানির সুযোগও দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানের ১৪, ২৫, ২৬ ও ৩০০এ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের দাবিও আদালত নাকচ করেছে।
২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভে অনেক জনসমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে। আদালত সেই কথা উল্লেখ করেছে। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও জনসুবিধার প্রয়োজনের কথাও বলেছে। মহাকালেশ্বর মন্দির ও ক্ষিপ্রা নদীর কাছে মসজিদের অবস্থানের বিষয়টিও আদালত উল্লেখ করেছে।
আবেদন করেছিল কয়েকটি গোষ্ঠী। তারা মসজিদ দেখাশোনার দাবি করে। মসজিদটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত। তাদের যুক্তি ছিল, ভাঙা হলে নামাজঘরের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ১২০ ফুট উঁচু একটি মিনার এবং মাজার চৌক শাহিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানানো হয়েছে। পৌর কর্পোরেশনের পদক্ষেপ আইনসম্মত কি না, তা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছে।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ বলছে, শাহি মসজিদ শত বছরেরও বেশি পুরোনো। কমিটি কিছু নথির কথা উল্লেখ করেছে। তার একটি হলো ১৯২৫ সালের একটি চিঠি। সিন্ধিয়া আমলের গোয়ালিয়র সরকারের অধীনে টাউন ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট সেই চিঠি লিখেছিল। চিঠিতে জমি অধিগ্রহণের কথা বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে মসজিদের বাকি অংশ অক্ষত রাখার নির্দেশও ছিল। আরেকটি নথি ১৯৮৫ সালের মধ্যপ্রদেশ সরকারের গেজেট বিজ্ঞপ্তি। তাতে মসজিদ ও এর মাপের উল্লেখ আছে।
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটসের আইনজীবী জায়েদ পাঠান মাকতুবকে বলেন, ‘নুমাইন্দা কমিটি তাদের আইনজীবীকে নিয়ে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপাতত সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক করা অনুযায়ী মানুষ মসজিদের ভেতরে বসে আছেন। মসজিদ রক্ষা করতে এবং প্রস্তাবিত ভাঙার প্রতিবাদ জানাতে। তারা এটাকেই ভাঙা ঠেকানোর শেষ উপায় মনে করছেন।’
খবরে বলা হয়েছে, গত রাত থেকে পুলিশ মসজিদের চারপাশ বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রেখেছে।
প্রতিবেদন লেখার সময় অন্তত এক হাজার মানুষ জোহরের নামাজ পড়ে মসজিদের ভেতরে বসে ছিলেন। পালা বদলের সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের মানুষ বদলাচ্ছেন। তবে সব সময় অনেক মানুষ ভেতরে থাকছেন।
সূত্র- মাকতুব মিডিয়া ও আল জাজিরা
