ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, লাভবান হবে ইরান?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২১ পিএম
২০১১ সালের শেষে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে চলে যায়। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরাকে থাকা শেষ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকে আগামী বুধবারের (৩০ সেপ্টেম্বর) মধ্যে সেনা প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর এই প্রত্যাহারকে ইরান ও তার মিত্ররা বিজয় হিসেবে দেখছে।
ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মার্কিন সেনা চলে গেলে দেশটিতে ইরান ও ইরানপন্থি শক্তিগুলোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তার সুযোগ নিয়ে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর মতো যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠীগুলোও আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে।
ইরানি-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ে কাজ করা ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, মার্কিন সেনা চলে গেলে ইরাকে তেহরানের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি আর থাকবে না।
তার মতে, ইরানপন্থি মিলিশিয়াগুলো এই প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে এবং নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।
‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলছে ইরানপন্থি গোষ্ঠী
ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি ‘কালো অধ্যায়ের’ সমাপ্তি উদযাপন করা হবে। তার দাবি, বিদেশি সেনা দিয়ে ইরাকের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা যায় না; বরং প্রতিরোধ ও জনগণের ইচ্ছার মাধ্যমেই তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তবে সবাই এই প্রত্যাহারকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না।
ফালুজার সুন্নি গোত্রীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই বলেন, ইরাক এখনো পুরোপুরি নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রস্তুত নয়। তার মতে, সবাই পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চায়, কিন্তু মার্কিন জোট হঠাৎ চলে গেলে যে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে, সেটিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
কেন ইরাকে ছিল মার্কিন সেনা?
২০০৩ সালে ইরাকে অভিযান চালিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি ছিল এবং তারা বিদ্রোহ দমন ও নতুন সরকারকে সহায়তা করে।
২০১১ সালের শেষে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে চলে যায়। কিন্তু মাত্র তিন বছরেরও কম সময় পর, ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর তারা আবার ইরাকে ফিরে আসে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট।
ইরাক একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কখনো কখনো ইরাকের ভূখণ্ডই দুই পক্ষের পরোক্ষ সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। এরপর ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে একাধিক হামলা চালায়।
ইরানের কাছে ‘বিজয়’
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে দেওয়াকে তাদের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরছে। তাই ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে তেহরান তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিজয় হিসেবে দেখছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দাম বলেন, মার্কিন সেনারা ইরাক ও পুরো অঞ্চল থেকে চলে গেলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানে সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াগুলো তেহরানের নির্দেশে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে বিভিন্ন হামলায় জড়িত। ইরাকি সরকার বলছে, এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে তারা কাজ করছে।
মার্কিন সেনা চলে গেলে কি আবার মাথাচাড়া দেবে আইএস?
ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ও কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইসলামিক স্টেট নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পেতে পারে।
প্রায় এক দশক আগে আইএস তাদের কথিত ‘খেলাফত’ হারালেও সংগঠনটির ঘুমন্ত সেল বা গোপন নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।
কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক সহায়তা ও ড্রোনের উপস্থিতি কমে গেলে আইএস পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে। তার দাবি, মার্কিন জোটের প্রত্যাহারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে আইএসের ঘুমন্ত সেলগুলোর কিছু তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী আরও জানিয়েছে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল আইএসের একটি সন্দেহভাজন সেল।
ইরাকের নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল খালিদ আল-বায়াতির মতে, আইএস এমন হামলার মাধ্যমে বার্তা দিতে চাইছে যে গোষ্ঠীটি এখনো সক্রিয় এবং বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে।


-6aba9aeab708e.jpg)