আলজাজিরার বিশ্লেষণ
সেনা প্রত্যাহার কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রকল্পের শোচনীয় পরাজয় আর ইরাকিদের বিজয়?
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম
মার্কিন বাহিনী ইরাক ছাড়ার পর বাগদাদের সড়কে উদযাপন করছে ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী। ছবি: রয়টার্স
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) পরাজিত করার লক্ষ্যে গঠিত গ্লোবাল কোয়ালিশনের কার্যক্রম শেষ হওয়ায় ইরাক থেকে নিজ সেনাদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার উপলক্ষে চার দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে ইরাক, যা মার্কিন বাহিনীর প্রস্থানের গভীর তাৎপর্যকে তুলে ধরেছে। তবে, সেনা প্রত্যাহার ইরাকের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর কীসের ইতি ঘটল
ইরাক থেকে দুই বছরব্যাপী মার্কিন সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক ইতি ঘটেছে গত ৩০ সেপ্টেম্বর। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণা করেছিল, আইএস-বিরোধী বৈশ্বিক জোটের কার্যক্রম দুই ধাপে গুটিয়ে নেওয়া হবে।
প্রথম ধাপের আওতায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ ইরাকের অভ্যন্তরে সব ধরনের যুদ্ধ ও অভিযানের সমাপ্তি ঘটবে।
দ্বিতীয় ধাপটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে, যার লক্ষ্য হবে সিরিয়ায় আইএস-বিরোধী অভিযানে সহায়তা করা।
গত জানুয়ারিতে ইরাক ঘোষণা করে যে, জোটের উপদেষ্টারা ফেডারেল এলাকাগুলো থেকে তাদের প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। তবে সিরিয়ায় অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক বা রসদ সহায়তা ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের প্রধান শহর ইরবিলের একটি ঘাঁটির মাধ্যমে অব্যাহত থাকবে।
বুধবার মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের ১২ বছরের অভিযানের সমাপ্তি ঘটল, যার আওতায় ২০১৪ সাল থেকে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন বাহিনী মূলত উত্তর ইরাক (প্রায় ২ হাজার ৫০০ সেনা) এবং সিরিয়ায় মোতায়েন ছিল। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর ২০০৭ সালে দেশটিতে ১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন সেনা ছিল।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ২০১১ সালে ইরাক থেকে এই মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। অবশ্য ২০১৪ সালে আইএসের উত্থানের পর একটি নতুন দলকে ইরাকে ফিরিয়ে আনা হয়, যারা মূলত ইরাকি বাহিনীকে বিমান সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ করছিল।
মার্কিন বাহিনী কী কী নিয়ে যাচ্ছে
মার্কিন বাহিনী ইরাক ছাড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ সামরিক সরঞ্জামও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের সময় ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ইরবিলে মোতায়েন মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
কুর্দি সামরিক কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি রয়টার্সকে বলেন, ইরাক আরও তিনটি সক্ষমতা হারাতে পারে: মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক বা রসদ সহায়তা এবং ড্রোন।
এই উদ্বেগ ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। সেখানে সরকার পরিচালনা করে কুর্দিস্তান রিজিওনাল গভর্নমেন্ট (কেআরজি)।
কুর্দি সশস্ত্র বাহিনীর তদারকি করা কেআরজির পেশমার্গা বিষয়ক মন্ত্রণালয় আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তারা জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর অঞ্চলটি হাজারের বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে।
কেআরজির প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানি বলেন, ‘কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না দিয়েই কুর্দিস্তান অঞ্চলকে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে যাওয়াটা উদ্বেগের বিষয়।’
গত মাসে বারজানির কার্যালয়কে লক্ষ্য করে একটি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। কর্মকর্তাদের দাবি, হামলাটি ইরানের ভূখণ্ড থেকে করা হয়েছিল।
ইরাকের সক্ষমতা কতটুকু
বাগদাদ বলছে, সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ইরাকি বাহিনীর কাছে নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনেক দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছিল।
গত সোমবার ইরাকি বিমান বাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল খালিদ আল-তামিমি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই ইরাকের অভ্যন্তরে কোনো জোট বাহিনী কোনো দায়িত্ব পালন করছে না।
তিনি বলেন, নজরদারির ক্ষেত্রে জোট বাহিনীর বিমানের জায়গা নিয়েছে ইরাকি ড্রোন এবং বিমান বাহিনী প্রতিদিন দেশের আকাশসীমায় পর্যবেক্ষণমূলক ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
তিনি ইরাকের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বহরের স্বাধীন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি তুলে ধরে জানান, তারা বাইরের কোনো সহায়তা ছাড়াই ১০ দিন ধরে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেছে।
তবে আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তার বিষয়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল হিসেবে রয়ে গেছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ইরাকি সামরিক মুখপাত্র সাবাহ আল-নুমান ঘোষণা করেন, দেশটি দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহের চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে।
তিনি এপিকে বলেন, ‘কুর্দিস্তান অঞ্চলসহ ইরাকের আকাশসীমার পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে’ সতর্কতার সঙ্গে প্রণীত সামরিক পরিকল্পনার আওতায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হবে।
জর্ডান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক হাসান বারারি কাতারের গণমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেছেন, ইরাক রাষ্ট্র বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থেকে নিজেদের আকাশসীমা রক্ষা করতে সক্ষম—এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সেনা প্রত্যাহার কি আইএসকে সুযোগ করে দিচ্ছে
এক দশক আগে ইরাকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা আইএসের দখলে ছিল। তবে বর্তমানের আইএস বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিবের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকি বাহিনীর অব্যাহত চাপের মুখে থাকা আইএস বর্তমানে তাদের ‘সবচেয়ে দুর্বল’ অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের মাত্র কয়েকশ যোদ্ধা অবশিষ্ট আছে।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘১২ বছর ধরে চলা অভিযানের সাফল্য’কে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইরাকের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং আইএসকে দমন করে রাখার প্রচেষ্টায় ইরাকি বাহিনীই নেতৃত্ব দেবে।
ইরাক থেকে আইএসের গোপন শাখা বা সেলগুলো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। ইরাকের নিরাপত্তা ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা বুধবার রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়কে কাজে লাগিয়ে হামলার পরিকল্পনা করেছিল গোষ্ঠীটি; যা প্রমাণ করে যে তারা এখনও নিরাপত্তার ফাঁকফোকর বা দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে সক্ষম।
ইরাকের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল খালিদ আল-বায়াতি বলেন, আইএস ‘এমন একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে তারা এখনও শক্তিশালী এবং রক্তক্ষয়ী হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে’।
ইরাকের অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর খবর কী
ইরাকের কিছু অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত মিলিশিয়া বা আধা-সামরিক বাহিনীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্থানকে নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে।
ইরান-ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়াদের জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’র কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি রয়টার্সকে বলেন, এই প্রত্যাহার ছিল ‘ইরাকি ইসলামী প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও ইরাকিদের জন্য একটি ঐতিহাসিক বিজয় এবং আমেরিকান প্রকল্পের জন্য এক শোচনীয় পরাজয়’।
তবে, সেনা প্রত্যাহারের অর্থই এই নয় যে, গোষ্ঠীগুলো তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে।
বাগদাদ শুরুতে ঘোষণা করেছিল, ৩০ সেপ্টেম্বর জোট বাহিনীর প্রত্যাহারের সময়সীমা ইরাকের সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র সমর্পণের জন্যও শেষ সময়সীমা হিসেবে গণ্য হবে। অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠীই সেই সময়সীমা প্রত্যাখ্যান করেছিল; ফলে বাগদাদ এখন তা পিছিয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে।
ওয়াশিংটনের ভূমিকা এখন কী
ঘাঁটিগুলো থেকে সরে আসার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো থেকে পুরোপুরি সরে আসছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ক এক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশের বিষয়ে সম্মত হয়, যেখানে সমন্বয়কারী কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা কর্মসূচি অন্যতম।
এ ছাড়া তারা সামরিক সহায়তা, অস্ত্র বিক্রয় ও অর্থায়নের মাধ্যমে ইরাকি বাহিনীকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করে। তারা ইরাকি বাহিনীর ব্যবহৃত মার্কিন সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সামরিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে।
সোমবার বাগদাদ বিমানবন্দরে অবস্থিত মার্কিন সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ ইরাকের হাতে আসার পর লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদ মান স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, এই হস্তান্তরের অর্থ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার সমাপ্তি নয়; বরং এর লক্ষ্য হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইরাকের স্বাধীনতা বজায় রাখা।
সেই বিবেচনায়, ৩০ সেপ্টেম্বর তারিখটি বাগদাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার নিরাপত্তা সম্পর্কের সমাপ্তি নয়, বরং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
এখন মূল প্রশ্ন এটি নয় যে, ইরাকে কতজন মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে; বরং প্রশ্নটি হলো—কীভাবে ইরাক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয়।

-6abe3a792c5a7.jpg)