দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশনেও বেঁচে গেলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য পরপর দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়া হলেও মারা যাননি যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী ক্রিস্টা পাইক। ৫০ বছর বয়সি এই বন্দিকে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বুধবার স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাকে পেন্টোবারবিটালসহ প্রাণঘাতী রাসায়নিকের দুই ডোজ দেওয়া হলেও তার মৃত্যু হয়নি।
পাইকের আইনজীবীরা জরুরি ভিত্তিতে আদালতে আবেদন করে জানান, তিনি অচেতন হয়ে গেলেও তার হৃদস্পন্দন চলছিল এবং তাকে নাক ডাকতে শোনা যাচ্ছিল। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।
টেনেসির প্রায় দুই শত বছরের ইতিহাসে কোনো নারী বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এটি ছিল প্রথম উদ্যোগ। ঘটনাটির পর রাজ্যের গভর্নর বিল লি একটি স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে চলতি বছর টেনেসিতে নির্ধারিত অন্যান্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরও স্থগিত করা হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা দেখা দেয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দুই দফা ইনজেকশন দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পাইকের শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি কারারক্ষীদের দিকে তাকিয়ে ইনজেকশন দেওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চান। পরে প্রত্যক্ষদর্শীদের কক্ষের পর্দা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সাংবাদিকদের এলাকা ছাড়তে বলা হয়।
টেনেসির নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম দফার প্রাণঘাতী ইনজেকশনে মৃত্যু না হলে দ্বিতীয় দফা ইনজেকশন দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে দ্বিতীয় দফার পরও বন্দি জীবিত থাকলে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই বলে জানা গেছে।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসেও টেনেসিতে টনি ক্যারাথার্স নামের এক বন্দির মৃত্যুদণ্ড শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়েছিল। তার শরীরে ইনজেকশন দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শিরা খুঁজে না পাওয়ায় ওই প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হয়েছিল।
তবে টেনেসির কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তারা প্রচলিত আইন ও নিয়ম মেনেই কাজ করেছে। অন্যদিকে পাইকের আইনজীবীরা রাজ্যের প্রাণঘাতী ইনজেকশন ব্যবস্থায় গুরুতর ত্রুটির অভিযোগ তুলেছেন।
১৯৯৫ সালে ১৮ বছর বয়সে কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন পাইক। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৬ সালে তার মৃত্যুদণ্ড হয়। স্লেমারের সঙ্গে একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে পরিচয়ের পর প্রেমঘটিত বিরোধ ও অপমানের জেরে পাইক ও তার সহযোগী তাদারিল শিপ হত্যাকাণ্ডে জড়িত হন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। শিপের বয়স ১৭ হওয়ায় তার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।
পাইকের আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, শৈশবে তার ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা এবং তার মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যাগুলো মৃত্যুদণ্ডের রায়ে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। সাম্প্রতিক আইনি লড়াইয়েও এসব বিষয় সামনে আনা হয়েছিল। তবে চলতি সপ্তাহে গভর্নর তার প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পাইক তার আত্মিক উপদেষ্টাকে কবি এডগার অ্যালান পোয়ের একটি কবিতার হাতে লেখা অংশ পাঠিয়েছিলেন। নিজের আরেক চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন, মৃত্যুকে ভয় না পেলেও পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।
এদিকে পাইকের সাজা কমানোর আহ্বান জানিয়েছিল জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তাদের বক্তব্যে পাইকের শৈশবের নির্যাতন, মানসিক সমস্যা ও দীর্ঘদিন মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থতার পর নিহত স্লেমারের মা মে মার্টিনেজও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পুরো ঘটনাটি বিশৃঙ্খল ও ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে এবং মেয়েকে হারানোর শোক তার জীবনের প্রতিটি দিনেই রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নারী বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া তুলনামূলকভাবে বিরল। পাইকের ঘটনাটি ব্যর্থ হওয়ার পর দেশটিতে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি ও এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে।

