সৌদি পরিবারের ‘ডিজিটাল মজলিস’ এখন বসছে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সৌদি আরবে পারিবারিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসার আগেই সেখানে শুরু হয়ে যাচ্ছে নানা আলোচনা- সকালের শুভেচ্ছা, পুরোনো ছবি, বিয়ে বা বাগদানের খবর থেকে শুরু করে শুক্রবারের খাবারের আয়োজন পর্যন্ত।
২৭ বছর বয়সী লামা আল-কাহতানির পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিভিন্ন শহরে থাকা আত্মীয়দের পাশাপাশি কাছাকাছি বসবাসকারী সদস্যরাও যুক্ত। তার কাছে গ্রুপটি একই সঙ্গে পারিবারিক নোটিশ বোর্ড, স্মৃতির আর্কাইভ এবং অবিরাম চলতে থাকা কথোপকথনের জায়গা।
লামা বলেন, কখনো ঘুম থেকে উঠে দেখেন গ্রুপে ৬০টি বার্তা জমেছে। এর মধ্যে যেমন গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক খবর থাকে, তেমনি কোথায় রাতের খাবার খাওয়া হবে- সেটি নিয়েও আলোচনা চলে। পরিবারের কোনো ঘটনা ঘটলে সবার আগে খবরটিও অনেক সময় এই গ্রুপেই আসে।
সৌদি সমাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ‘মজলিস’ ছিল পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের মুখোমুখি বসে কথা বলা, খবর আদান-প্রদান ও সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ স্থান। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ সেই মজলিসের বিকল্প হয়ে ওঠেনি; বরং মুখোমুখি সাক্ষাতের মধ্যবর্তী সময়টুকুতে যোগাযোগ ধরে রাখার ডিজিটাল জায়গা হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
সৌদি আরবে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার প্রায় সর্বজনীন। দেশটির কমিউনিকেশনস, স্পেস অ্যান্ড টেকনোলজি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে ইন্টারনেট প্রবেশের হার ছিল ৯৯ শতাংশ। ইন্টারনেট ব্যবহারের ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশই হয়েছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে।
২০২৩ সালের কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সৌদির ৯০ দশমিক ৯ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেছেন। ফলে পারিবারিক যোগাযোগেও প্ল্যাটফর্মটির ব্যাপক ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পারিবারিক গ্রুপগুলোতে সন্তান জন্ম, বিয়ে, বাগদান ও মৃত্যুর খবর জানানো হয়। শোক ও অভিনন্দন জানানো, অনুষ্ঠানের ঠিকানা পাঠানো কিংবা পুরোনো অ্যালবামের ছবি নতুন করে তুলে তরুণ প্রজন্মের কাছে পাঠানো- সবই চলে সেখানে। কখনো একজনকে উদ্দেশ করে করা প্রশ্নও কয়েক প্রজন্মের আলোচনায় পরিণত হয়।
৩৪ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আল-হারবি কাজের জন্য নিজের শহর ছেড়ে যাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে এই গ্রুপকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তার মতে, কাউকে ফোন করলে সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো কারণ থাকে। কিন্তু গ্রুপে পরিবারের দৈনন্দিন ছোটখাটো ঘটনাগুলোও জানা যায়। এতে দূরে থেকেও মনে হয় পরিবারের সঙ্গে আছি।
সৌদি আরবের পারিবারিক যোগাযোগ নিয়ে গবেষণাতেও ডিজিটাল যোগাযোগের এমন ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় রিয়াদে ৩০০ জনের ওপর করা এক গবেষণায় ৮৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া, অভিনন্দন ও শোকবার্তা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কথা উঠে আসে ওই গবেষণায়।
তবে এর কিছু সমস্যাও রয়েছে। গুজব ছড়িয়ে পড়া এবং বয়স্ক যেসব আত্মীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন না, তাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হওয়াকে গবেষণায় সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পরিবারের প্রজন্মভেদেও গ্রুপ ব্যবহারের ধরন আলাদা। তরুণরা ছোট বার্তা, ছবি, রিঅ্যাকশন ও মিম পাঠান। বাবা-মায়েরা তুলনামূলক দীর্ঘ বার্তা বা পারিবারিক ঘোষণা দেন। স্মার্টফোন ব্যবহারকারী দাদা-দাদিরাও অনেক সময় সক্রিয় হয়ে ওঠেন- সকালের দোয়া, ভয়েস নোট কিংবা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ছবি পাঠানোর মাধ্যমে।
৫৬ বছর বয়সী সারা আল-দোসারির সন্তানরা বড় হওয়ার পর পারিবারিক গ্রুপ তার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সবার ব্যস্ততার কারণে একে একে ফোন করার বদলে তিনি গ্রুপে একবার প্রশ্ন করেই সবার কাছ থেকে উত্তর পান।
তবে তার কাছে হোয়াটসঅ্যাপ কখনোই মুখোমুখি পারিবারিক আড্ডার বিকল্প নয়। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে থেকেও যদি শুধু ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাহলে সেই মিলনের অর্থ কী- এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
