Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

ক্ষমতাবান নেতা হওয়ার আগে সবকিছু হারিয়েছিলেন শি জিনপিং

Advertisement

Icon

বিবিসি বাংলা

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম

ক্ষমতাবান নেতা হওয়ার আগে সবকিছু হারিয়েছিলেন শি জিনপিং

Advertisement

চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রায় ১৪ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন শি জিনপিং। এই সময়ে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি এবং বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন তিনি।

তবে ৭৩ বছর বয়সী এই নেতার রাজনৈতিক জীবন সবসময় এতটা মসৃণ ছিল না। বরং উত্থান-পতনে ভরা তার জীবনের শুরুর দিকের গল্পটি বেশ কঠিন। একসময় তিনি ছিলেন চীনের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, যাকে বলা হতো ‘রাজপুত্র’। পরে সেই পরিবারের প্রায় সব সুবিধাই হারাতে হয়েছিল তাকে।

রাজনীতির পরিবারে জন্ম

১৯৫৩ সালে বেইজিংয়ে জন্ম শি জিনপিংয়ের। তার বাবা শি ঝংজুন ছিলেন চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের অন্যতম নেতা। গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং উপপ্রধানমন্ত্রীও ছিলেন।

শি ঝংজুনের ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন শি জিনপিং। শৈশবে নামকরা স্কুলে পড়াশোনা এবং বিশেষ কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সুযোগ ছিল তার।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে শি ঝংজুনকে ‘দলবিরোধী’ চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। তাকে গ্রামাঞ্চলের একটি কারখানায় কাজের জন্য পাঠানো হয় এবং পরে দল থেকেও বহিষ্কার করা হয়।

বাবার রাজনৈতিক পতনের প্রভাব পড়ে কিশোর শি জিনপিংয়ের ওপরও। ‘প্রতিবিপ্লবী’র সন্তান হিসেবে তাকে পুনঃশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

তৎকালীন নেতা মাও জেদংয়ের আহ্বানে শহরের লাখো তরুণের মতো ১৫ বছর বয়সে শি-ও গ্রামে চলে যান। চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের লিয়াংজিয়াহে গ্রামের একটি গুহাবাড়িতে প্রায় সাত বছর কাটান তিনি। কৃষিকাজের পাশাপাশি সার বহন ও নালা খননের মতো কঠিন কাজ করতে হয়েছে তাকে।

২০০৪ সালের এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে শি বলেছিলেন, ‘ট্রেনের সবাই কাঁদছিল। আমিই একমাত্র হাসছিলাম।’

গ্রামের কঠিন জীবনও তাকে বদলে দেয়। ক্ষুধা ও উকুনের সমস্যায় ভুগলেও ধীরে ধীরে তিনি ওই জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেন। আচার করা সবজি হয়ে ওঠে তার প্রিয় খাবার।

রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন

২২ বছর বয়সে শি গ্রাম ছাড়েন। ভর্তি হন চীনের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে রাসায়নিক প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেন।

পড়াশোনা শেষ করে ফুজিয়ান ও ঝেজিয়াং প্রদেশে স্থানীয় কর্মকর্তা হিসেবে কাজ শুরু করেন। অর্থনীতি উন্মুক্ত হওয়ার পর উপকূলীয় এই প্রদেশগুলো চীনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চলের মধ্যে পরিণত হয়।

এ সময় শি জিনপিং ধীরে ধীরে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। মাও জেদংয়ের মৃত্যুর পর তার বাবা রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হন। বাবার পুরোনো রাজনৈতিক যোগাযোগও শি জিনপিংয়ের উত্থানে ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে এসব সম্পর্কের অনেকেই তার নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।

ব্যক্তিজীবনেও এ সময় পরিবর্তন আসে। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত সাবেক এক চীনা রাষ্ট্রদূতের মেয়ে কে লিংলিংকে বিয়ে করেন শি। তবে তিন বছর পর তাদের বিচ্ছেদ হয়।

পরে তিনি বিয়ে করেন পেং লিউয়ানকে। চীনের সামরিক বাহিনীর লোকসংগীত শিল্পী পেং তখন দেশটির অত্যন্ত পরিচিত মুখ। প্রতি বছর চান্দ্র নববর্ষের টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তার গান কোটি কোটি মানুষ দেখতেন। ফলে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে অনেক চীনার কাছে শি জিনপিংয়ের চেয়ে পেং লিউয়ানই ছিলেন বেশি পরিচিত।

তাদের একমাত্র সন্তান কন্যা শি মিংজে ১৯৯২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন বলে জানা যায়। তবে তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

সর্বোচ্চ ক্ষমতার পথে

২০০৭ সালে সাংহাইয়ের শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর শি জিনপিং চীনের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটিতে যোগ দেন।

এর পাঁচ বছর পর, ২০১২ সালে তিনি হু জিনতাওয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। পরের বছর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।

এরপর চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন শি।

শি যেভাবে বদলে দিয়েছেন চীন

শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও আত্মবিশ্বাসী ও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানো হয়েছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ানকে ঘিরে উত্তেজনাও বেড়েছে।

দেশের ভেতরেও শি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছেন। শিনজিয়াং, তিব্বত ও হংকংয়ে তার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে সমর্থকেরা শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে দেখেন। তবে সমালোচকেরা এসব পদক্ষেপের কারণে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন।

শি নিজের নামে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শও প্রতিষ্ঠা করেছেন—‘নতুন যুগের জন্য চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র বিষয়ে শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারা’। তার আগে চীনের বর্তমান দুই নেতা হু জিনতাও ও জিয়াং জেমিনের নামে এ ধরনের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

২০১৮ সালে চীনের সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের দুই মেয়াদের সীমাও তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে শি জিনপিংয়ের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পথ তৈরি হয়।

বন্ধু নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী?

বিদেশি নেতাদের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের সম্পর্কও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। শি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুজনের বহুবার সাক্ষাৎ হয়েছে। শি পুতিনকে তার ‘সবচেয়ে কাছের আস্থাভাজন’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক অবশ্য ভিন্ন। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করলেও ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে শি-র প্রশংসা করেছেন এবং তাকে বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও শি শুরুতে ব্যক্তিগত কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছিলেন। দুই নেতা একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নেন। তবে ২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্তে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কের বড় অবনতি ঘটে।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য পরিচিত শি জিনপিং। ফলে কিশোর বয়সে সবকিছু হারিয়ে গ্রামাঞ্চলের কঠিন জীবন থেকে উঠে আসা সেই ‘রাজপুত্র’ আজ চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাবান নেতাদের একজন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

চীনের প্রেসিডেন্ট শির পারিবারিক জীবন নিয়ে যা জানা গেল

চীনের প্রেসিডেন্ট শির পারিবারিক জীবন নিয়ে যা জানা গেল

চীনকে যেভাবে তৈরি করেছেন শি

চীনকে যেভাবে তৈরি করেছেন শি

এআইয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ঠেকাতে চীনের কঠোর পদক্ষেপ!

এআইয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ঠেকাতে চীনের কঠোর পদক্ষেপ!

যেভাবে ভারতের বাজার চীনের ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ল

যেভাবে ভারতের বাজার চীনের ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ল

এশিয়ার বড় বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে

এশিয়ার বড় বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে

প্রেসিডেন্টপুত্রের ওপর নজরদারি, চীনের ‘এজেন্ট’ ধরল যুক্তরাষ্ট্র

প্রেসিডেন্টপুত্রের ওপর নজরদারি, চীনের ‘এজেন্ট’ ধরল যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন

‘মাটিতে আছড়ে ফেলে খামচে দিয়েছে’, দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে প্রিয়াঙ্কার অভিযোগ

‘মাটিতে আছড়ে ফেলে খামচে দিয়েছে’, দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে প্রিয়াঙ্কার অভিযোগ

পাকিস্তানের প্রশংসা করলেন জাতিসংঘ মহাসচিব

পাকিস্তানের প্রশংসা করলেন জাতিসংঘ মহাসচিব

দুদিনে তৃতীয়বার আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা

দুদিনে তৃতীয়বার আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা

ক্ষমতাবান নেতা হওয়ার আগে সবকিছু হারিয়েছিলেন শি জিনপিং

ক্ষমতাবান নেতা হওয়ার আগে সবকিছু হারিয়েছিলেন শি জিনপিং

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম