জ্বালানি খাতে কাতারসহ উপসাগরীয় বিনিয়োগ চায় ভারত
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি পরিকল্পনাবিদরা ভারতের জ্বালানি পরিশোধন অবকাঠামোর বড় ধরনের সম্প্রসারণে অর্থায়নের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের উদ্যোগ নিয়েছেন। একই সঙ্গে বৃহত্তর জ্বালানি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে ভারত।
গত মাসে ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি জানিয়েছিলেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলো ভারতের শোধনাগার খাতের প্রকল্পে অর্থায়নে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে।
ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা পূরণে দেশটির তেল শোধন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ভারতের শোধন সক্ষমতা দৈনিক ৫৪ লাখ ব্যারেল। তা বাড়িয়ে ৬২ লাখ ব্যারেলের বেশি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক দেশগুলোর সরাসরি তেল শোধনাগার প্রকল্পের প্রস্তাবের পাশাপাশি জ্বালানি খাতের বিভিন্ন পর্যায়ে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে কাতারের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে নয়াদিল্লি।
২০২৬ সালের এপ্রিলে দুই দিনের সরকারি সফরে দোহা যান হরদীপ সিং পুরি। সেখানে তিনি কাতারের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এবং কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ শেরিদা আল-কাবির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কৌশলগত সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সামুদ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়।
কাতারের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কিউএনএ জানায়, বৈঠকে দুই কর্মকর্তা দ্বিপক্ষীয় জ্বালানি সহযোগিতা জোরদারের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সময় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি ঐতিহাসিকভাবে ভারত-কাতার বাণিজ্যিক সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। তবে বর্তমানে জ্বালানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামোয় পারস্পরিক মালিকানা অংশীদারত্বের বিষয়টিও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
কিউএনএ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে পেট্রোনেট এলএনজি কাতারএনার্জির কাছ থেকে বছরে ৭৫ লাখ টন এলএনজি কেনার চুক্তির মেয়াদ আরও ২০ বছর বাড়ায়। চুক্তিটি ২০২৮ সালের জুলাই পর্যন্ত এবং এরপরও কার্যকর থাকবে।
নতুন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে ভারত ও কাতার যৌথ বিনিয়োগ টাস্কফোর্স (জেটিএফআই) গঠন করেছে। অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বাণিজ্যিক সুযোগ অনুসন্ধান করছে এই টাস্কফোর্স।
২০২৪ সালের জুনে নয়াদিল্লিতে যৌথ কর্মী গোষ্ঠীর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কাতারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের আন্ডারসেক্রেটারি মোহাম্মদ বিন হাসান আল-মালিকি এবং ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগের আন্ডারসেক্রেটারি অজয় শেঠ যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন।
ওই বৈঠকে আল-মালিকি জানান, ২০২৩ সালে ভারত ও কাতারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে কাতারের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়েছে ভারত।
কাতার থেকে ভারতে প্রধানত এলএনজি, এলপিজি, রাসায়নিক, পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্য রপ্তানি হয়। অন্যদিকে ভারত থেকে কাতারে রপ্তানি করা হয় শস্য, তামাজাত পণ্য, লোহা ও ইস্পাতজাত পণ্য, সবজি, মসলা, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী ও তৈরি পোশাক।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তিসহ (ডিটিএএ) বিভিন্ন আর্থিক কাঠামোও রয়েছে। কর ফাঁকি রোধ এবং আয়কর হার নির্ধারণের লক্ষ্যে ভারত ও কাতার ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। এটি ২০০০ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, সুদ, রয়্যালটি ও কারিগরি সেবা ফির ওপর উৎসে করের হার ১০ শতাংশ। কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কমপক্ষে ১০ শতাংশ হলে লভ্যাংশের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ।
ভারতের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো খাতেও কাতারের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের বিনিয়োগ রয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (কিউআইএ) প্রায় ৪৫ কোটি ডলারে আদানি ইলেকট্রিসিটি মুম্বাই লিমিটেডের (এএইএমএল) ২৫ দশমিক ১ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করে। এর মাধ্যমে ভারতের শহরভিত্তিক বিদ্যুৎ বিতরণ খাতে কিউআইএর বিনিয়োগ শুরু হয়।
এরপর ২০২৩ সালের আগস্টে কিউআইএ তাদের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়ায়। সংস্থাটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইনকিউ হোল্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি ডলারে আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেডের (এজিইএল) ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করা হয়।
কিউএনএ জানিয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিলে কাতার সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর এবং কিউআইএর চেয়ারম্যান শেখ বান্দার বিন মোহাম্মদ বিন সউদ আল-থানি এজিইএলের নির্বাহী পরিচালক সাগর আদানির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী দুই দশকে বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধির ২৫ শতাংশ ভারতের কারণে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে শোধনাগার খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়।

