ইমরানের শক্ত ঘাঁটি অবরুদ্ধ, উল্টো বিপদে পড়তে পারে পাকিস্তান
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্কুল বন্ধ, ইন্টারনেট পরিষেবায় বিধিনিষেধ, শিপিং কনটেইনার দিয়ে সড়ক অবরোধ, শহরে সেনা মোতায়েন—পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত খাইবার পাখতুনখোয়ায় এখন এমনই পরিস্থিতি।
প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা জারির পাশাপাশি স্থগিত করা হয়েছে ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম।
ইমরান খানের সমর্থক ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বিরোধে এটি নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, সন্ত্রাসবাদের হুমকি থেকে প্রদেশের জনগণকে রক্ষা করতেই সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, বিরোধী দলকে দমনের এ উদ্যোগে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমার পরিবর্তে আরও বাড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার গত রোববার সাংবাদিকদের বলেন, খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপিকে) প্রদেশে পিটিআই সরকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো বিস্তারিত তথ্য বা প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। যদিও শিগগিরই প্রমাণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর দুই দিন পরও এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে পেশোয়ারসহ প্রদেশটির অধিকাংশ এলাকায় স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছে এবং ইন্টারনেট পরিষেবাও সচল হয়েছে। পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত না করলেও বিক্ষোভ ঠেকাতে যে দমন অভিযান চলছে, তা স্পষ্ট। পিটিআইয়ের অধিকাংশ নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন।
ইমরানের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভের পর জরুরি অবস্থা
গত রোববার জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেওয়ার সময়টিকে কাকতালীয় বলে মনে করছেন না অনেক পর্যবেক্ষক। এর আগের এক সপ্তাহ ধরে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে খাইবার পাখতুনখোয়ায় মিছিল, সমাবেশ ও পদযাত্রা করেছেন তাঁর হাজার হাজার সমর্থক। প্রদেশটিতে টানা ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে পিটিআই।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ বলেন, সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা বেশ কপটতাপূর্ণ শোনাচ্ছে।
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরিফা নূরও জরুরি অবস্থা জারির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এ ঘটনার কোনো যোগসূত্র তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। এমনকি লং মার্চই জরুরি অবস্থা জারির কারণ কি না, তা নিয়েও তিনি নিশ্চিত নন।
আরিফা নূরের ভাষ্য, লং মার্চটি হয়তো সরকারের জন্য শেষ ধাক্কা ছিল। আবার এমনও হতে পারে, বিরোধী দলের হাতে প্রাদেশিক সরকার থাকুক—এটি কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নিতে চাইছে না।
এই পদযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী আফ্রিদি। তবে বর্তমানে তাঁর অবস্থান কোথায়, তা নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। পিটিআইয়ের দাবি, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, তিনি সুরক্ষামূলক হেফাজতে রয়েছেন।
পদযাত্রা শুরুর আগেই দমন-পীড়ন শুরু হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বর মাসে ইমরান খানের তিন বোনকে সমর্থকদের সংগঠিত করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তাঁরা আটক রয়েছেন।
কারাগারে ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
কারাবন্দি ইমরান খানের সঙ্গে গত এক বছরে তাঁর পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের সাক্ষাতের সুযোগ সীমিত ছিল। গত আগস্টে তাঁর দুই বোন কারাগারে গিয়ে দেখা করার সুযোগ পান।
এর মধ্যে একজন বোন কারাগারেই ইমরানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যজন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন সুপ্রিম কোর্ট ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর তাঁকে চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হলে।
পরে তাকে আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি বন্দি রয়েছেন।
পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিরোধের জেরেই ইমরান খান ক্ষমতা হারিয়েছিলেন বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে তিনি কারাবন্দি। দুর্নীতির একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলেও এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন তিনি।
ইমরানের দল ইতোমধ্যে নানা চাপের মুখে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এরপরও কর্তৃপক্ষ কেন এত কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পিটিআইয়ের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে অস্থিরতা বেড়েছে।
তাঁর মতে, দলের ওপর কঠোর বার্তা দেওয়ার এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা আরও কঠিন করে তোলার সময় এসেছে—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতার ভারসাম্য সামরিক বাহিনীর দিকে?
ইমরানের কারাগারে সাক্ষাৎ ও রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়েও আগে আপত্তি জানিয়েছিল সরকার। তাদের অভিযোগ ছিল, কারাগারের নিয়ম ভেঙে সাক্ষাতের সুযোগকে রাজনৈতিক আলোচনার জন্য ব্যবহার করছিলেন তিনি।
জরুরি অবস্থা জারি প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী তারার বলেন, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। চাইলে পিটিআই তাদের পদযাত্রা ও মিছিল চালিয়ে যেতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল উল্লেখ করে তারার এটিকে সমঝোতার প্রচেষ্টার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।
তবে বিরোধী পক্ষের সমর্থক ও বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, ইমরান খান এবং তাঁর দলকে আরও কোণঠাসা করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আরিফা নূরের মতে, পাকিস্তানে মতবিরোধ ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সরকার সংঘাত থেকে আলোচনার মাধ্যমে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে আগ্রহী নয় বলেও মনে করেন তিনি।
ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেনের মতে, পাকিস্তানের ক্ষমতার ভারসাম্য এখন পুরোপুরি সামরিক প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে গেছে।
ফারজানা শেখ মনে করেন, সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। তাদের ধারণা, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, সামরিক প্রতিষ্ঠানের মনোভাব অনেকটা এমন—এটাই সুযোগ কাজে লাগানোর সময়। তাদের ধারণা, সব সুযোগ এখন তাদের হাতে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।
একাধিক সংকটে পাকিস্তান
তবে পাকিস্তানের সামনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের বাইরেও বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশটিতে জঙ্গিবাদ বাড়ছে। ‘গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬’-এ সন্ত্রাসবাদের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে পাকিস্তান শীর্ষে ছিল।
আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কও উত্তেজনাপূর্ণ। আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলে বারবার আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। তবে তালেবান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধও নতুন করে সংঘাতে রূপ নিতে পারে। সামান্য উসকানিতেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবকে হামলা থেকে আত্মরক্ষায় সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকিস্তান।
এমন পরিস্থিতিতে খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করে একটি সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে সরকার নতুন সংকট তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।
তাদের আশঙ্কা, এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইসলামাবাদকে এমন একটি প্রদেশের দায়িত্ব নিতে হবে, যেখানে আগে পিটিআইয়ের নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় ছিল। প্রাদেশিক সরকারের অনুপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপরই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চাপ বাড়বে।
কুগেলম্যানের মতে, এ পদক্ষেপ হিতে বিপরীত হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, কঠোর ব্যবস্থা প্রদেশটির মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়িয়ে দিলে পাকিস্তানকে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।
জাহিদ হুসেনও মনে করেন, পাকিস্তান যখন একাধিক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, তখন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া বেপরোয়া পদক্ষেপের শামিল।
সামরিক অভিযানের ঝুঁকিও কম নয়
ফারজানা শেখ মনে করেন, জঙ্গিবাদ দমনে আরও সক্রিয় সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে। এমন অভিযানে সেনাসদস্যদের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে। হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলে সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই এ ধরনের অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
পাকিস্তানের ইতিহাসে সামরিক অভ্যুত্থানের একাধিক নজির রয়েছে। অতীতে প্রাদেশিক কিংবা জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা দেশটিতে তিক্ত পরিণতি ডেকে এনেছে।
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরিফা নূর বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) শীর্ষ নেতারা যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে তাঁদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা বোঝেন না—এমন নয়।
একইভাবে পিটিআইও বুঝতে পারছে, শুধু বিক্ষোভ করে ইমরান খানকে কারাগার থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।
আরিফা নূরের ভাষায়, পাকিস্তান যে সংকটের মধ্যে পড়েছে, তার সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক দিক হলো—সব পক্ষই পরিণতি সম্পর্কে কমবেশি জানে, তবু তারা সেই পথেই এগোচ্ছে। পরিস্থিতি যে বড় বিপর্যয়ের দিকে যেতে পারে, তা বুঝতে পারলেও কেউ যেন তা থামাতে পারছে না।
বিবিসি


