আনাদোলুর এক্সপ্লেইনার
তেলের উচ্চমূল্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে কি বাঁচাতে পারবে না?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১০ পিএম
শোধনাগারে উৎপাদন করা হচ্ছে তেল। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জ্বালানি উৎপাদন দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহণে বিঘ্নের কারণে চলতি বছর উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি বড় ধরনের সংকোচনের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লেও উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় সেই সুবিধা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আইএমএফের অক্টোবরের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহণে বিঘ্নের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে হাইড্রোকার্বননির্ভর অর্থনীতিগুলো। এর মধ্যে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের অর্থনীতি দুই অঙ্কের হারে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতি আঞ্চলিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও উৎপাদক দেশগুলো যদি স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন করতে না পারে কিংবা ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাড়তি দামের সুবিধা সীমিত হয়ে পড়ে।
জ্বালানি খাতের বাইরেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। বাণিজ্য হ্রাস, ব্যয় বৃদ্ধি ও অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অর্থনীতিতে বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টা কঠিন হয়ে উঠছে।
ছোট উপসাগরীয় দেশগুলো বড় ঝুঁকিতে
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে কুয়েতের অর্থনীতি ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। কাতারের অর্থনীতি ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বাহরাইনের ১১ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতিও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দেশ দুটির অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রপ্তানি পরিবহনে বিঘ্নের প্রভাব তুলনামূলকভাবে ভিন্ন হওয়ায় সংকোচনের হার কম হতে পারে।
চলতি বছর সৌদি আরবের অর্থনীতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। অথচ গত জুলাইয়ে দেশটির অর্থনীতিতে ১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে পূর্বাভাসে পাঁচ শতাংশের অবনতি হয়েছে।
তবে ২০২৭ সালে সৌদি আরবের অর্থনীতিতে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। এর আগে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ পরিস্থিতির উন্নতি হলে চলতি বছরের হারানো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ আগামী বছর ফিরে আসতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পর ২০২৭ সালে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ছয় সদস্যের উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) বাইরে ইরাকের অর্থনীতিও বড় সংকোচনের মুখে পড়তে পারে। দেশটির অর্থনীতি ১৬ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এতে আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর ওপর চলমান সংকটের ব্যাপক প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান পুরো বছরের চূড়ান্ত ফল নয়, বরং বার্ষিক প্রকৃত অর্থনৈতিক উৎপাদনের পূর্বাভাস। সংঘাতের গতিপ্রকৃতি এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগে, তার ওপর চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে।
পরিস্থিতির অবনতি কেন
আইএমএফের নতুন পূর্বাভাসে গত বসন্তের তুলনায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি দেখা গেছে।
গত এপ্রিলে সংস্থাটি ২০২৬ সালে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতিতে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। তখন কাতারের অর্থনীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, কুয়েতের শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং বাহরাইনের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
আগের ওই পূর্বাভাসে ধরে নেওয়া হয়েছিল, সংঘাতের স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে কম হবে। বছরের মাঝামাঝি নাগাদ বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে।
কিন্তু বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় আগের পূর্বাভাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুমানটি আর বাস্তবসম্মত থাকেনি। ফলে উৎপাদন হ্রাস ও সরবরাহব্যবস্থায় বাধার কারণে দেশগুলোকে দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকতে হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থানের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের এপ্রিলে প্রকাশিত আঞ্চলিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছিল, ওমানের অর্থনীতিতে পূর্বাভাসজনিত অবনতি তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে। কারণ, দেশটির সমুদ্রে প্রবেশের পথ হরমুজ প্রণালির বাইরে।
এই পার্থক্যটি প্রমাণ করে, আর্থিক রিজার্ভের পরিমাণ বা বিশ্ববাজারে তেলের দামের পাশাপাশি বিকল্প রপ্তানিপথের প্রাপ্যতাও কীভাবে অর্থনৈতিক ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়লেও উৎপাদন ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না
গত ১ অক্টোবর উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের সতর্ক করে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, হাইড্রোকার্বন উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া এবং জ্বালানি খাতের বাইরের প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ায় এ অঞ্চলের অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে আসা, লোহিত সাগরে বিঘ্ন এবং জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি রপ্তানি ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বাণিজ্য হ্রাস, ব্যবসায়িক আস্থার দুর্বলতা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি খাতের বাইরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জ্বালানি উৎপাদকদের ক্ষেত্রে দামের পাশাপাশি উৎপাদন ও বিক্রির পরিমাণ বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বাড়লে বিক্রি করা তেল থেকে আয় বাড়তে পারে। কিন্তু উৎপাদন বা পরিবহন সম্ভব না হলে সেই তেলের ঘাটতি শুধু বাড়তি দাম দিয়ে পূরণ করা যায় না।
বাস্তব জিডিপি মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব সমন্বয় করে অর্থনৈতিক উৎপাদন পরিমাপ করে। ফলে রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়লেই অর্থনীতির সংকোচন ঠেকানো সম্ভব নয়, বিশেষ করে যখন প্রকৃত উৎপাদন কমে যায়।
এ কারণেই জ্বালানি সরবরাহে সংকট একদিকে অন্য দেশগুলোর আমদানি ব্যয় বাড়াতে পারে, অন্যদিকে এসব পণ্য সরবরাহকারী দেশগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও কমিয়ে দিতে পারে।
প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সব ক্ষতি পোষাবে না
আইএমএফের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, উৎপাদন, রপ্তানি ও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে শুরু করলে আগামী বছর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ফিরতে পারে।
২০২৭ সালে কাতারের অর্থনীতিতে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ, কুয়েতের ১৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং বাহরাইনের ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের অর্থনীতি চলতি বছর শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পর আগামী বছর ৬ দশমিক ৩ শতাংশ সম্প্রসারিত হতে পারে।
তবে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির হার মানেই আগের অর্থনৈতিক অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে যাওয়া নয়। চলতি বছরের সংকোচনের ফলে অর্থনীতির ভিত্তি নিচে নেমে আসায় পরের বছর প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি দেখাতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, ২০২৫ সালে কুয়েতের অর্থনৈতিক উৎপাদনকে ১০০ সূচক ধরে হিসাব করলে ২০২৬ সালে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সংকোচনের পর তা নেমে আসবে ৮৩ দশমিক ৩-এ। এরপর ২০২৭ সালে ১৭ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও উৎপাদন দাঁড়াবে প্রায় ৯৭ দশমিক ৫-এ। অর্থাৎ দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অর্থনীতির উৎপাদন ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম থাকবে।
একই হিসাব অনুযায়ী, কাতারের অর্থনীতি ২০২৬ সালের সংকোচন এবং ২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পর প্রায় ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে।
তবে এ হিসাবেও সংকটের পুরো অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রতিফলিত হয় না। সংকট না ঘটলে যে অতিরিক্ত উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারত, তা এসব হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
আর্থিক সুরক্ষা ও বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ
ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, সরকারগুলোর নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং জ্বালানি ও সরবরাহ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমিত রাখতে সহায়তা করেছে। বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোকে সহায়তা দেওয়ার মতো উদ্যোগও এর মধ্যে রয়েছে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আর্থিক সুরক্ষা থাকলেও বাণিজ্যিক ধাক্কা মোকাবিলায় শক্তিশালী ভৌত অবকাঠামোর বিকল্প নেই।
আইএমএফ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের রেলওয়ে প্রকল্প এবং সৌদি আরবের ল্যান্ডব্রিজ প্রকল্পের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। এসব প্রকল্প বিকল্প পরিবহন সংযোগ বাড়িয়ে পণ্য পরিবহনে বিঘ্নের প্রভাব কমাতে পারে।
সংস্থাটির নীতিগত পরামর্শে বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে সাময়িক ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। তবে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়াই যখন সংকটের প্রধান কারণ, তখন ব্যাপক পরিসরে প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আর্থিক সুরক্ষা পুনর্গঠন, অর্থনীতিতে বহুমুখীকরণ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদারে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।


