দিল্লিতে ৪৭ লাখ ভোটার ও ‘ফর্ম ৬’ বিতর্ক, নির্বাচন কমিশনের পিছু হটার নেপথ্যের কারণ
Advertisement
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানী দিল্লির ভোটার তালিকা সংশোধন ও বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ব্যাপক রাজনৈতিক তোলপাড় এবং আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। দিল্লির মোট ১ কোটি ৪৫ লাখ ভোটারের মধ্যে থেকে প্রায় ৪৭.৫৬ লাখ (৪৭ লাখের বেশি) ভোটারের নাম প্রাথমিক খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া এবং ভোটার নিবন্ধনের 'ফর্ম ৬'-এ কমিশন কর্তৃক প্রবর্তিত বিতর্কিত শর্তকে ঘিরে শীর্ষ আদালত পর্যন্ত জল গড়িয়েছে। তবে বিরোধী জোটের জোরদার আপত্তি, জনরোষ এবং সুপ্রিম কোর্টের কঠোর নজরদারির মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে দেশের নির্বাচন কমিশন।
৪৭ লাখ নাম বাদ ও বিপাকে সাধারণ ভোটার
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন থেকে দিল্লিতে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এরপর ৩১ আগস্ট প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় অনুপস্থিত, ঠিকানা পরিবর্তন, মৃত কিংবা একাধিক স্থানে নাম থাকার কারণ দেখিয়ে এক ধাক্কায় ৪৭.৫৬ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। এত বিশাল সংখ্যক বৈধ নাগরিকের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার খবরে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় নাম তুলতে কিংবা নতুন ভোটারদের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ‘ফর্ম ৬’ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
‘ফর্ম ৬’ ঘিরে বিতর্ক ও জটিলতা
ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত মূল মাধ্যম হলো ‘ফর্ম ৬’। তবে অনলাইন আবেদনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন এতে একটি নতুন শর্ত বা অতিরিক্ত ঘোষণার বাধ্যবাধকতা যুক্ত করে। নতুন নিয়মে আবেদনকারী বা তার অভিভাবকের তথ্য পূর্ববর্তী ভোটার তালিকার সাথে সম্পর্কিত করার শর্ত আরোপ করা হয়।
বিরোধীদের দাবি ছিল, ১৯৬০ সালের ইলেকটরস রেজিস্ট্রেশন রুলস সংশোধন না করেই এই বাড়তি শর্তগুলো অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রথমবার ভোট দিতে চাওয়া তরুণ ভোটার এবং বাদ পড়া প্রান্তিক মানুষদের জন্য নাম তোলার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও দূরহ হয়ে ওঠে।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি চাপ
ইন্ডিয়া জোট এবং বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন পেশ করা হয়। নির্বাচন কমিশন আদালতে দাবি করেছিল যে, তারা সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদনক্রমেই ‘ফর্ম ৬’-এ এই পরিবর্তন এনেছে।
তবে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনের এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দেন। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে, তারা সংশোধিত ‘ফর্ম ৬’-এর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো চূড়ান্ত অনুমোদন বা সম্মতি প্রদান করেনি। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ এবং আবেদনের গুরুত্ব বিবেচনা করে শুনানির দিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা কমিশনের ওপর বড় ধরনের আইনি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে।
নির্বাচন কমিশনের পিছু হটা ও পুনঃপরীক্ষার নির্দেশ
আইনি চাপ ও জন অসন্তোষের মুখে নির্বাচন কমিশন পোর্টাল থেকে ‘ফর্ম ৬’-এর বিতর্কিত অতিরিক্ত ঘোষণার নিয়মটি প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে ভোটাররা এখন ১৯৬০ সালের আইন অনুযায়ী স্বাভাবিক নিয়মেই পুনরায় নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারছেন।
একই সাথে নির্বাচন কমিশন ও দিল্লির প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দপ্তর থেকে নির্দেশ জারি করা হয়েছে যে, খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া ৪৭.৫৬ লাখ ভোটারের নাম বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুনরায় যাচাই করা হবে। এর জন্য দিল্লির প্রায় ১৫,০০০ বুথ লেভেল অফিসার কাজ শুরু করেছেন। বিএলও-রা আগের ও বর্তমান ভোটার তালিকার তুলনা করে বাদ পড়া ভোটারদের তথ্য খতিয়ে দেখছেন এবং প্রয়োজনীয় ফর্ম পূরণে সাহায্য করছেন। আগামী ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত সংশোধন সম্পন্ন করে দিল্লির চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য ওয়ার, ইন্ডিয়া টুডে, টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং দ্য ওয়াল



