ল্যুভরে চুরি, এবার নিরাপত্তার দায়িত্ব চান সাবেক চোর
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
সাবেক চোর ডাচ নাগরিক অক্টাভ ডারহাম। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত জাদুঘর ল্যুভরে শতাব্দীর সেরা চুরি হিসেবে আলোচিত ডাকাতির এক বছর পরও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এবার প্রশ্ন তুলেছেন এমন একজন, যিনি নিজেই একসময় ছিলেন দুর্ধর্ষ শিল্পকর্ম চোর। ডাচ নাগরিক অক্টাভ ডারহাম দাবি করেছেন, ল্যুভরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় এখনো অনেক দুর্বলতা রয়েছে।
ফরাসি জাদুঘর ল্যুভরে গত বছরের আলোচিত চুরির ঘটনার পরও নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে বলে মনে করেন অক্টাভ ডারহাম। তার প্রশ্ন, ‘নিরাপত্তার দায়িত্ব দিতে তারা আমার কাছে আসে না কেন?’
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৩ বছর বয়সি ডারহাম কোনো নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নন, এমনকি প্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষীও নন। তিনি একসময় ছিলেন শিল্পকর্ম চোর। বর্তমানে অপরাধজগৎ থেকে অবসর নেওয়ার দাবি করা ডারহাম নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পরিচয় দেন ‘ডাচ লুপিন’ হিসেবে। নেটফ্লিক্সে ফরাসি অভিনেতা ওমর সি অভিনীত জনপ্রিয় ভদ্রবেশী চোরের চরিত্র থেকে এই নাম নেওয়া।
নিজের অপরাধজগতের অতীত নিয়ে কোনো রাখঢাক নেই তার। সিএনএনকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ডারহাম বলেন, ‘আমি ব্যাংক, সেফ ডিপোজিট ভল্ট, সাঁজোয়া গাড়ি থেকে চুরি করেছি। যা কল্পনা করতে পারেন, সবই চুরি করেছি।’
২০০২ সালে এক সহযোগীকে নিয়ে আমস্টারডামের ভ্যান গঘ জাদুঘরে ঢুকে দুটি চিত্রকর্ম চুরি করেন তিনি। পরে গ্রেফতার হয়ে কারাদণ্ড ভোগ করেন ডারহাম। তবে তার আগেই চুরি করা ছবিগুলো এক কুখ্যাত অপরাধীর কাছে বিক্রি করেছিলেন। পরে ওই অপরাধীর কাছ থেকে চিত্রকর্মগুলো উদ্ধার করা হয়।
চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম উদ্ধারে
অপরাধজগৎ থেকে সরে এলেও চুরি যাওয়া শিল্পকর্মের প্রতি আগ্রহ হারাননি ডারহাম। তবে এখন তার উদ্দেশ্য চুরি করা নয়, বরং চুরি যাওয়া মূল্যবান শিল্পকর্ম উদ্ধার করা। এ কাজে অপরাধজগতের পুরোনো যোগাযোগগুলো ব্যবহার করেন তিনি।
এ জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেন না ডারহাম। তার ভাষায়, কাজটি তিনি মূলত আনন্দের জন্য করেন। মানুষকে খুশি করতে পারলে তার ভালো লাগে।
তবে তাকে পুলিশের তথ্যদাতা বললে আপত্তি করেন তিনি। ডারহামের ভাষায়, ‘আমি তথ্যদাতা নই, আমি যোগাযোগের মাধ্যম। দুটির মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। আমি পুলিশের সঙ্গে কথা বলি না।’
ডারহাম কাজ করেন ডাচ শিল্পকর্ম অনুসন্ধানী আর্থার ব্র্যান্ডের সঙ্গে। শিল্পজগতে তাকে ‘ইন্ডিয়ানা জোনস’ নামে ডাকা হয়।
২০২০ সালে নেদারল্যান্ডসের একটি জাদুঘর থেকে ভ্যান গঘের ‘স্প্রিং গার্ডেন’ চিত্রকর্মটি চুরি হয়েছিল। ২০২৩ সালে নীল রঙের একটি আইকিয়া ব্যাগে ভরে সেটি ব্র্যান্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। চিত্রকর্মটি উদ্ধারে ডারহামের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান ব্র্যান্ড।
ব্র্যান্ড আরও উদ্ধার করেছেন পোল্যান্ড থেকে ১৯৭০-এর দশকে চুরি হওয়া পিটার ব্রুগেলের একটি বিখ্যাত শিল্পকর্ম এবং নাৎসি নেতা হারমান গোরিংয়ের হাতে লুট হওয়া এক ইহুদি পরিবারের চিত্রকর্ম। শিল্পকর্ম কেনার আগে সংগ্রাহকদের পরামর্শ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। উদ্ধারকাজটি করেন বিনা পারিশ্রমিকে।
ইউরোপজুড়ে জাদুঘরে চুরি
গত বছরের অক্টোবরে ল্যুভরে দিনের আলোয় চোরেরা ঢুকে নেপোলিয়ন আমলের মূল্যবান সম্পদ নিয়ে পালিয়ে যায়। ওই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফ্রান্সের আরেকটি জাদুঘরে চুরি হয়। সেখান থেকে এক লাখ ডলারের বেশি মূল্যের স্বর্ণ ও রুপার মুদ্রা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
এরপর থেকে ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘর, আর্ট গ্যালারি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনা নিয়মিত খবরের শিরোনাম হচ্ছে।
গত মাসে ফ্রান্সের রেনোয়া জাদুঘর থেকে দুটি রেনোয়া চিত্রকর্ম চুরি হয়। কয়েক সপ্তাহ পর সেগুলো উদ্ধার করা হয়। এর আগে মার্চে ইতালির পারমার কাছে ম্যাগনানি রোকা ফাউন্ডেশন থেকে রেনোয়া, সেজান ও মাতিসের তিনটি চিত্রকর্ম চুরি হয়েছিল। সেগুলোও পরে উদ্ধার করা হয়।
গত আগস্টে সিসিলির একটি জাদুঘর থেকে আন্তোনেলো দা মেসিনার আঁকা রেনেসাঁ যুগের চারটি চিত্রকর্ম চুরি হয়। একই মাসে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার মিউজিয়াম অব অ্যাপ্লায়েড আর্টস থেকে ৪০ লাখ ডলারের একটি হীরার নেকলেস নিয়ে যায় চোরেরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইউরোপোলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাদুঘরে চুরির ঘটনায় অপরাধীরা ক্রমেই বেশি বেপরোয়া, সহিংস ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।
ব্র্যান্ড বলেন, শিল্পকর্ম চুরির ঘটনা নতুন নয়। তবে ল্যুভরের ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। সাবেক চোরদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, বর্তমান অপরাধীরা ল্যুভরের ঘটনা দেখে একই ধরনের চুরিতে উৎসাহিত হচ্ছে।
তার মতে, অপরাধীরা ভাবছে, ল্যুভরের মতো জাদুঘর থেকে যদি শিল্পকর্ম চুরি করা সম্ভব হয়, তাহলে স্থানীয় জাদুঘরগুলো থেকে চুরি করা আরও সহজ।
ব্যাংকে নগদ অর্থ কমে যাওয়া এবং গয়নার দোকানে নিরাপত্তা জোরদার হওয়ার কারণে চোরেরা এখন জাদুঘরকে সহজ লক্ষ্য হিসেবে দেখছে বলেও মনে করেন ব্র্যান্ড।
কেন ইউরোপের জাদুঘরগুলো ঝুঁকিতে
বিশ্বজুড়ে শিল্পকর্ম চুরির ঘটনা ঘটলেও ইউরোপের জাদুঘরগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করেন ব্র্যান্ড। কারণ, বিশ্বের বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান শিল্পকর্মের বড় অংশ ইউরোপে রয়েছে। পাশাপাশি অনেক জাদুঘরই শত শত বছরের পুরোনো ভবনে অবস্থিত।
ব্র্যান্ড বলেন, ইউরোপের জাদুঘরগুলোতে সাধারণত সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী থাকে না। অনেক প্রতিষ্ঠানই ঐতিহাসিক ভবনে পরিচালিত হয়, যেগুলোর নিরাপত্তা আধুনিক দুর্গের মতো নয়।
বেলজিয়ামভিত্তিক জাদুঘর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম বালুত বলেন, ল্যুভর, ভিয়েনার জাদুঘর ও রেনোয়া জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠানে চোরেরা ঢুকে তিন মিনিটেরও কম সময়ে মূল্যবান বস্তু নিয়ে পালিয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় ভাঙচুর করে দ্রুত চুরি করার প্রবণতা বাড়ছে।
বালুতের মতে, অপরাধীরা এখন হাতুড়ি, কুঠার, শাবল এমনকি বিস্ফোরকও ব্যবহার করছে। ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সহজে বহন করা যায় এবং দ্রুত কাজ করা সম্ভব হওয়ায় চুরির ঝুঁকি বেড়েছে।
জাদুঘরের মূল উদ্দেশ্য দর্শনার্থীদের জন্য শিল্পকর্ম উন্মুক্ত রাখা। এ কারণে ব্যাংক বা গয়নার দোকানের মতো প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে একটি কাচের বাক্স বা নিরাপত্তারক্ষীই দর্শনার্থী ও মূল্যবান শিল্পকর্মের মধ্যে একমাত্র বাধা।
বালুত বলেন, অপরাধীরা চুরির আগে জাদুঘর ঘুরে দেখে, কোন জিনিস সহজে নেওয়া যাবে এবং পালানোর পথ কতটা সুবিধাজনক। তাই শুধু ক্যামেরা বসিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত কর্মী, যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, শক্তিশালী প্রদর্শনী বাক্স, কার্যকর অ্যালার্ম এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা।
শিল্পকর্ম বিক্রি করাই বড় চ্যালেঞ্জ
ব্র্যান্ডের মতে, গত এক দশকে শিল্পকর্ম চুরির ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। অপরাধীরা এখন স্বর্ণ, রুপা ও হীরার দিকে বেশি ঝুঁকছে। কারণ, এসব গলিয়ে বা নতুনভাবে কেটে ফেললে আসল মালিকানা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে মূল্যবান চিত্রকর্ম চুরির পেছনেও অপরাধীদের ভুল ধারণা কাজ করে। ভ্যান গঘের একটি ছবি কোটি কোটি ডলারের হতে পারে, কিন্তু চুরি করলেই তা বিক্রি করা সহজ নয়।
ব্র্যান্ড বলেন, চুরির পরদিনই অপরাধীরা জানতে পারে, ছবিটি বিশ্বের বিভিন্ন অপরাধসংক্রান্ত তথ্যভান্ডারে চিহ্নিত হয়ে গেছে। ফলে তা প্রকাশ্যে বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তবে অপরাধজগতের কেউ কেউ চুরি করা শিল্পকর্মকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ব্র্যান্ডের দাবি, কালোবাজারে চুরি করা একটি চিত্রকর্মের মূল্য বৈধ বাজারমূল্যের মাত্র ১০ শতাংশ হতে পারে। কোনো অপরাধী গ্রেফতার হলে শাস্তি কমানোর দর-কষাকষিতে সেটি ব্যবহার করতে পারে।
আর্ট ক্রাইমবিষয়ক গবেষণা সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর রিসার্চ ইনটু ক্রাইমস এগেইনস্ট আর্টের প্রধান লিন্ডা অ্যালবার্টসন বলেন, মূল্যবান ও সহজে বহনযোগ্য শিল্পকর্ম, নিরাপত্তার দুর্বলতা এবং সীমিত নিরাপত্তাসম্পদ একসঙ্গে অপরাধীদের সুযোগ তৈরি করে।
তার মতে, কিছু জাদুঘর নিরাপত্তা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। শুধু ক্যামেরা দিয়ে চুরি রেকর্ড করা সম্ভব, কিন্তু তা সব সময় চুরি ঠেকাতে পারে না। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত কর্মী, নিয়মিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন, কার্যকর অ্যালার্ম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার মহড়া।
অ্যালবার্টসন বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য অর্থদাতা ও পৃষ্ঠপোষকেরা সচরাচর এগিয়ে আসেন না। অথচ একটি সংগ্রহশালা অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু হবে কি না, তা অনেক সময় নিরাপত্তায় বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে।
তার ভাষায়, ‘আমরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অমূল্য বলতে পারি না, অথচ সেটির সুরক্ষাকে ঐচ্ছিক ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করতে পারি না।’
এদিকে, ডারহাম এখনো মনে করেন, ল্যুভরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়েছে। সম্প্রতি জাদুঘরটি পরিদর্শন করে তিনি কয়েকটি জানালায় ফাটল দেখতে পেয়েছেন বলে দাবি করেন।
গত বছরের চুরির প্রবেশপথে লোহার বেড়া ও ক্যামেরা বসানো হলেও পাশের জানালাগুলোর অবস্থা আগের মতোই রয়েছে বলে তার অভিযোগ।
ল্যুভর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সিএনএনের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। ডারহামের দাবি, জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাকে নিরাপত্তা পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ দিলে তিনি এখনো সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন, তা দেখিয়ে দিতে প্রস্তুত।


-6ad4495fc215d.jpg)