তেলাপোকার পর এবার ভারতের রাজনীতিতে মাছি, নতুন এই পার্টি নিয়ে যা জানা গেল
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফের জন্ম দিয়েছে এক নতুন ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের।
এর আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি (সিজেআই) সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যের পর ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা তেলাপোকা দল বেশ শোরগোল ফেলেছিল। এবার প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক আরেকটি মন্তব্য—‘মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো’—থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অনলাইনে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘মাছি জনতা পার্টি’ (এমজেপি)।
নতুন এই অনলাইন সংগঠনটি একটি মাছিকে তাদের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছে। নাগরিকদের অধিকার, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন করার অধিকারকে সামনে রেখেই তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলছে।
ইনস্টাগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, আরিয়ান নামের এক শিক্ষার্থী এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা। এটিকে ‘তরুণদের দ্বারা, তরুণদের জন্য তরুণদের একটি অ-রাজনৈতিক মোর্চা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা মুখপাত্র খুঁজছে।
দলটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
মাছি জনতা পার্টি আসলে কী?
এমজেপি হলো একটি অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন। হিন্দি শব্দ ‘মাছি’ থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট (@makhijantaparty.ig)-এর মাধ্যমে দলটিকে তরুণদের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যাদের মূল লক্ষ্য গণতন্ত্র রক্ষা করা।
ইনস্টাগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টটি ২০২১ সালের জুনে খোলা হয়েছিল। তবে বর্তমান হ্যান্ডেলটি পাওয়ার আগে তারা আটবার এর নাম বা ইউজারনেম পরিবর্তন করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি দলটির একটি ওয়েবসাইটও রয়েছে (makkhijantaparty.com)। এই ওয়েবসাইটে অর্থনীতি, উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
ওয়েবসাইটে এমজেপির অগ্রাধিকারের সঙ্গে সিজেপি-র প্রতিবাদ-কেন্দ্রিক রাজনীতির একটি ফারাক তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে অভিযোগভিত্তিক রাজনীতির সমালোচনা করে বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ, ব্যবহারিক দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘ককরোচ জনতা পার্টির অভিযোগের রাজনীতি যদি বোন হয়, তবে মাছি জনতা পার্টি হলো তার ভাই। ককরোচ জি শুধু অভিযোগের জোগান দেন, আর মাছি ম্যাডাম দেন গুঞ্জন। তবে দেশের প্রকৃত নির্মাণকাজ করেন এ দেশের কর্মীরাই।’
কীভাবে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য এমজেপিকে অনুপ্রাণিত করল?
গত ০৯ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চের পর্যবেক্ষণের পরই মূলত এই নামকরণের বিষয়টি সামনে আসে।
১০ অক্টোবর সিজেপি-র ডাকা একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির আগে দিল্লির মেট্রো পরিসেবাসহ গণপরিবহনে যে কড়াকড়ি বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, তা নিয়ে শুনানির সময় আদালত এই মন্তব্য করে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ১৮-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে যে নিরাপত্তার অজুহাতে সবকিছু এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার আদৌ কোনো যৌক্তিকতা আছে কিনা।
আদালত পর্যবেক্ষণ করে যে, পুরো সিস্টেমটি স্থবির না করেও নিরাপত্তার বিষয়গুলো সামলানো সম্ভব। বেঞ্চ বলে, ‘আপনি সবকিছু বন্ধ করে দিতে পারেন না,’ এবং ‘মাছি মারতে হাতুড়ি’ ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করে।
এমজেপি এই উপমাটিকেই নিজেদের প্রচারের হাতিয়ার করে নেয়। একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা লেখে, ‘যখন খোদ প্রধান বিচারপতিই বললেন—মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার করা যায় না! তখন মাছিও বলবে আমরাও কারো চেয়ে কম যাই না।’
এর আগে ভারতের প্রধান বিচারপতির এক মন্তব্যে দেশটির একদল তরুণকে ‘তেলাপোকা’ হিসেবে অভিহিত করার পর থেকেই সিজেপি অনলাইনে মনোযোগ আকর্ষণ করে। পরবর্তীতে দলটি জবাবদিহিতা ও প্রতিবাদের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে।
জুলাই মাসে সরকারি পরীক্ষা কেলেঙ্কারির অভিযোগে যন্তর মন্তরে সিজেপি-র বিক্ষোভের পর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছিলেন।
সিজিপি-র সঙ্গে কেন যোগাযোগ করতে চাইছে এমজেপি?
সিজেপি এবং নিখিল ভারত ছাত্র সংঘের (এআইএসএ) জাতীয় সভাপতি নেহা বোরা—যিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন—তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে এমজেপি।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে এমজেপি নেহা বোরার ‘সাহস ও দৃঢ়তার’ প্রশংসা করেছে। তাদের মতে, যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের প্রশ্ন করা এবং জবাবদিহিতা চাওয়া গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ।
তবে সাম্প্রতিক ওই বিক্ষোভগুলো প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া হয়েছিল বলেও তারা স্বীকার করে। সেই সঙ্গে তারা নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছে যে, তারা যেন আইনি সীমার মধ্যে থেকেই দায়িত্বশীলভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শনের অধিকার চর্চা করেন।
উভয় গোষ্ঠীর সম্মতি সাপেক্ষে একটি অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ বা যৌথ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য সিজেপি-র সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে এমজেপি।
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে আরিয়ানের সই করা একটি পৃথক বিবৃতিতে সিজেপি-র প্রতি তাদের সমর্থন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যন্তর মন্তরে প্রবেশ করে সিজেপি নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস ভারতীয় পতাকা উত্তোলনের পর তাদের আটকের ঘটনার সমালোচনা করা হয় ওই বিবৃতিতে।
সেখানে বলা হয়, সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে প্রতিবাদ সীমাবদ্ধ রাখলে তার প্রভাব কমে যায়। প্রশ্ন তোলা হয়, ‘মানুষ যদি ঠিক সেই জায়গাতেই তাদের কথা বলতে না পারে যেখানে তা শোনা দরকার, তবে প্রতিবাদস্থলের অর্থ কী?’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘গণতন্ত্রের প্রয়োজন সংলাপের, দূরত্বের নয়।’
ব্যঙ্গ ছাড়াও এমজেপির মূল লক্ষ্য কী?
সিজেপি যেখানে মূলত রাজপথের আন্দোলন এবং জবাবদিহিতা আদায়ের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে এমজেপির ওয়েবসাইটের মূল ফোকাস অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও উদ্যোক্তা তৈরির ওপর।
তাদের ঘোষিত লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে মানুষকে ব্যবসা শুরু করতে উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশ করা এবং স্থানীয় ব্যবসাগুলোকে প্রসারিত করতে সাহায্য করা। প্রতিবাদভিত্তিক রাজনীতিতে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা এবং জীবনযাত্রার মানের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ওয়েবসাইটটি।
সিজেপি-র চেনা ব্যঙ্গাত্মক স্টাইল ধার করার পাশাপাশি এমজেপি নিজেদের জন্য একটি ভিন্ন অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে।
অনলাইনেও পেজটি ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘যখন শিক্ষকদের জায়গা নেবে এআই, তখন দেশের যুবসমাজই হয়ে উঠবে জাতীয় নিরাপত্তার কারণ!’ আরেকজন লিখেছেন, ‘পূর্ণ সংহতি’, আর তৃতীয় এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, ‘মাছি জনতা পার্টি আইডিটির নামটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। আমি আপনাদের সমর্থন করি।’
সূত্র: ফার্স্টপোস্ট

