Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

১৫ বছর পরও গাদ্দাফির স্মৃতি কেন তাড়া করে ফিরছে লিবিয়াকে

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম

১৫ বছর পরও গাদ্দাফির স্মৃতি কেন তাড়া করে ফিরছে লিবিয়াকে

মুয়াম্মার গাদ্দাফি।

Advertisement

লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশটির রাজনীতি থেকে মুছে যায়নি তার প্রভাব। বরং রাজনৈতিক বিভাজন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য, দুর্নীতি এবং বিচারহীনতার মধ্যে গাদ্দাফির শাসনামল নিয়ে স্মৃতিকাতরতা বাড়ছে দেশটির একটি বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে।

অনেকে তার শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন না করলেও সেই সময়ের স্থিতিশীল জীবন ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অভাব অনুভব করছেন। অন্যদিকে, গাদ্দাফি ও তার ছেলে সাইফ আল-ইসলামের মৃত্যুর বিচার না হওয়ায় দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

গত ২০ অক্টোবর গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৫তম বার্ষিকী পালন করেন তার সমর্থকরা। ২০১১ সালে সির্তে শহরে নিহত হওয়ার পর তাকে তড়িঘড়ি করে অজ্ঞাত স্থানে দাফন করা হয়। সেই কবরের অবস্থান এখনো প্রকাশ করা হয়নি। গাদ্দাফির সমর্থকদের কাছে তার গোপন কবর যেন লিবিয়ার অমীমাংসিত রাজনৈতিক সংকটের প্রতীক। অনেকের বিশ্বাস, গাদ্দাফি কবরে যাওয়ার সময় দেশটির পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থাকেও সঙ্গে নিয়ে গেছেন।

গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলামের মৃত্যুও সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিহত হন তিনি। তার জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের শোকের মধ্যে গাদ্দাফির স্মৃতিও ফিরে আসে। কারণ, সাইফের মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিদায় নয়, বরং লিবিয়ার রাজনীতিতে বিকল্প কোনো পথের সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

সাইফের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশটির পাবলিক প্রসিকিউটর কার্যালয় সন্দেহভাজনদের শনাক্ত এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির কথা জানিয়েছিল। কিন্তু আট মাস পেরিয়ে গেলেও কাউকে আদালতে হাজির করা হয়নি। গাদ্দাফি ও তার ছেলের মৃত্যুর ঘটনা তাই একই প্রশ্ন সামনে এনেছে, লিবিয়া কি শেষ পর্যন্ত গাদ্দাফি পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে, নাকি অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড ও অতীতের বিরোধ ভবিষ্যতেও দেশটিকে প্রভাবিত করবে?

বিপ্লবের পরও বন্ধ হয়নি রাজনৈতিক সহিংসতা

২০১১ সালের অভ্যুত্থান গাদ্দাফির দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটালেও দেশটিতে রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান হয়নি। গাদ্দাফির বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এমন এক নজির তৈরি হয়, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার নির্ধারক হয়ে ওঠে অস্ত্র, নির্বাচন নয়। ১৫ বছর পর তার ছেলের হত্যাকাণ্ডও সেই বাস্তবতার ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছে।

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বদলে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মিলিশিয়ার প্রভাব বেড়েছে। রাজনৈতিক প্রতিশোধ, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেশটির শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে লিবিয়ার অবস্থান ছিল ১৭৭তম।

বিশ্লেষকদের মতে, সাইফ আল-ইসলামের হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে ২০১১ সালের পর গড়ে ওঠা ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। এ কারণেই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পথে বাধা রয়ে গেছে।

গাদ্দাফি আমলের স্থিতিশীলতার স্মৃতি

লিবিয়ার অনেক মানুষের কাছে গাদ্দাফির শাসনামলের প্রতি নস্টালজিয়া তার কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতি সমর্থন নয়। বরং তারা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা স্মরণ করেন, যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থিক সুবিধা ছিল। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো রাষ্ট্রীয় সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ থেকে বার্ষিক আয় পাওয়ার সুযোগ পেত। টেলিযোগাযোগ ও তেল খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সঙ্গে যুক্ত এই ব্যবস্থাকে অনেকেই সামাজিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে দেখেন।

অন্যদিকে, ২০১১ সালের পর সেই নিশ্চয়তার জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে সশস্ত্র গোষ্ঠীর লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গাদ্দাফির বিরুদ্ধে পশ্চিমা ব্যাংকে বিপুল অর্থ গোপনে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময় উঠেছে। তবে নিবন্ধটির দাবি অনুযায়ী, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানেও তার ব্যক্তিগতভাবে বিলিয়ন ডলার গোপন পশ্চিমা ব্যাংক হিসাবে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সাইফ আল-ইসলামের জানাজায় বানিওয়ালিদে হাজারো মানুষের উপস্থিতি এবং পুরোনো সবুজ পতাকা নিয়ে সমাবেশ শুধু শোকের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বর্তমান পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও ছিল। দেশটির একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর কাছে তার মৃত্যু মিলিশিয়াদের আধিপত্যের বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক পথের সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়ার প্রতীক।

বিদেশি প্রভাব ও সার্বভৌমত্বের সংকট

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পাশাপাশি লিবিয়ার সার্বভৌমত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ১৯৬৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর গাদ্দাফি কয়েক মাসের মধ্যে দেশটির ভূখণ্ড থেকে সব বিদেশি সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে দেওয়াকে নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে দেশটির রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির প্রভাব স্পষ্ট।

২০১৯ সালে তুরস্কের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক চুক্তি হয়। তখন খলিফা হাফতারের বাহিনী ত্রিপোলির কাছাকাছি অবস্থান করছিল। তুরস্কের সামরিক সহায়তা ওই সরকারকে টিকে থাকতে সাহায্য করে এবং দেশটিতে তুরস্কের সরাসরি সামরিক উপস্থিতির পথ তৈরি হয়। শুরুতে লিবিয়ার পার্লামেন্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ চুক্তিটিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে সমালোচনা করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর একই পার্লামেন্ট চুক্তিটির অনুমোদন দেয়। এই অবস্থান পরিবর্তন রাজনৈতিক এলিটদের নীতিগত অবস্থানের চেয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রবণতাকেই সামনে এনেছে।

বিচারহীনতা কাটানোই বড় পরীক্ষা

গাদ্দাফি ও তার ছেলের মৃত্যুর বিচার না হওয়া লিবিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকে তুলে ধরে। শুধু গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করাই যথেষ্ট নয়; অভিযুক্তদের গ্রেফতার, বিচার এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে জবাবদিহির আওতায় আনার মতো স্বাধীনতা ও সক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ তদন্ত, সব পক্ষের জন্য সমান বিচার এবং জাতীয় পুনর্মিলন ছাড়া লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা কঠিন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো যদি নিজেদের স্বার্থে সহিংসতা ও বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দিতে থাকে, তবে গাদ্দাফির উত্তরাধিকার দেশটির রাজনীতিতে বিভাজনের রেখা হয়েই থাকবে। আর সেই বিভাজন কাটিয়ে উঠতে না পারলে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সার্বভৌম লিবিয়া গড়ে তোলার পথও অনিশ্চিত থেকে যাবে।

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

লিবিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বিস্ফোরণ, নিহত ৮

লিবিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বিস্ফোরণ, নিহত ৮

লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টার থেকে দেশে ফিরলেন ১৬৮ বাংলাদেশি

লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টার থেকে দেশে ফিরলেন ১৬৮ বাংলাদেশি

লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৬৮ বাংলাদেশি

লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৬৮ বাংলাদেশি

লিবিয়া থেকে ফিরলেন আরও ১৭৪ বাংলাদেশি

লিবিয়া থেকে ফিরলেন আরও ১৭৪ বাংলাদেশি

দেশে ফিরলেন লিবিয়ায় বন্দি থাকা ১৭৪ বাংলাদেশি

দেশে ফিরলেন লিবিয়ায় বন্দি থাকা ১৭৪ বাংলাদেশি

গাড়ি বিস্ফোরণে লিবিয়ার গোয়েন্দাপ্রধান নিহত

গাড়ি বিস্ফোরণে লিবিয়ার গোয়েন্দাপ্রধান নিহত

আরও পড়ুন

জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ল

জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ল

গাজাবাসীদের অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু, জানালেন নিজেই

গাজাবাসীদের অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু, জানালেন নিজেই

মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদন ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরাইল

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরাইল

১৫ বছর পরও গাদ্দাফির স্মৃতি কেন তাড়া করে ফিরছে লিবিয়াকে

১৫ বছর পরও গাদ্দাফির স্মৃতি কেন তাড়া করে ফিরছে লিবিয়াকে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম